দলছুট বিপ্লবী সঞ্জীব চৌধুরী

Comments

মানুষ নিজের গন্ডি নিজে তৈরি করে। সে গন্ডিকে নিজেই ছাড়িয়ে যায়। গীতিকার, গায়ক,কবি,  গল্পকার, নাট্যকার, রাজনৈতিক কর্মী, সাংস্কৃতিক সংগ্রামী, বিপ্লবী! হ্যাঁ এত পরিচয়ের পরেও জীবন জগতে সত্যিকারের একজন বিপ্লবীই ছিলেন সঞ্জীব চৌধুরী। তিনি মাত্র ৪৩ বছরে যত ভাবে পেরেছেন শুধু কাজ করে গেছেন। কাজ করেছেন শুধু মানুষের জন্যে।

Sanjib Chowdhury_01

সঞ্জীব চৌধুরীর নাম মনে হলেই মনে আসে আরেকটি নাম- বাপ্পা মজুমদার। দু’জনের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের ব্যান্ড সংস্কৃতি পেয়েছে একটি দল, যার নাম ‘দলছুট’। বাপ্পা মজুমদার ও সঞ্জীব চৌধুরী একসাথে কাজ করবার প্রয়াসে ১৯৯৫ সালে ‘দলছুট’ ব্যান্ডটি গঠন করে। দলছুটের প্রথম অ্যালবাম ‘আহ’ ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয়। এরপর ‘হৃদয়পুর’, ‘স্বপ্নবাজি’, ‘আকাশচুরি’, ‘জ্যোছনা বিহার’, ‘টুকরো কথা’, ‘আয় আমন্ত্রণ’ নামে আরো কয়েকটি অ্যালবাম বেরিয়েছে এই ব্যান্ড থেকে। ‘স্বপ্নবাজি’ ছিলো সঞ্জীব চৌধুরীর একক অ্যালবাম। ২০০৭ সালে প্রকাশিত ‘টুকরো কথা’ অ্যালবামটি সঞ্জীবের মৃত্যুর পর তার প্রতি শ্রদ্ধার্থে প্রকাশ পায়। এতে তার লেখা কবিতাগুলোর সংকলন ছিল। এছাড়া ‘আয় আমন্ত্রণ’ হচ্ছে ব্যান্ডটি ষষ্ঠ অ্যালবাম। ২০১০ সালের ২৫শে ডিসেম্বর সঞ্জীব চৌধুরীর ৪৭তম জন্মদিনে ‘সঞ্জীব উৎসব’ পালনের মধ্য দিয়ে এই অ্যালবামটি প্রকাশ পায়। এই অ্যালবামের ‘নতজানু’ নামে সর্বশেষ গানটি সঞ্জীব চৌধুরীর নিজের লেখা।

সঞ্জীব চৌধুরী কবিতা লিখতেন আবার আবৃত্তিতেও ছিলেন স্বচ্ছন্দ। শুধু কবিতাই নয়, বেশ কিছু ছোটগল্পও লিখেছিলেন তিনি। তার লেখা গল্পগ্রন্থ ‘রাশ প্রিন্ট’ আশির দশকে বাংলা একাডেমী কর্তৃক সেরা গল্পগ্রন্থ হিসেবে নির্বাচিত হয়। আহমদ ছফাও সঞ্জীব চৌধুরীর লেখনীর ভূয়সী প্রশংসা করেন। এমনিতে নাটকের স্ক্রিপ্টও লিখতেন সঞ্জীব চৌধুরী। এক্ষেত্রে যেন তিনি একজন সব্যসাচীই ছিলেন। ‘সুখের লাগিয়া’ নাটকের মাধ্যমে অভিনয়ের অভিজ্ঞতাও হয়েছিল তার।

Sanjib Chowdhury with Family

স্ত্রী আলেমা নাসরীন শিল্পী ও কন্যা কিংবদন্তীর সাথে

১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে জন্ম তার, নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি সপ্তম। পিতা গোপাল চৌধুরী এবং মাতা প্রভাষিণী চৌধুরী। তবে তাদের মূল বাড়ি সিলেট জেলার বিশ্বনাথ থানার দশঘর গ্রামে। সেখানকার জমিদার শরৎ রায় চৌধুরী ছিলেন তার পিতামহ। ছাত্রজীবনে বেশ মেধাবী ছিলেন তিনি। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে ভর্তি হন তবে পরে সেই বিভাগ ছেড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় পড়াশোনা করেন।

সঞ্জীব চৌধুরী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করে আশির দশকের শুরুর দিকে তিনি পেশাগতভাবে সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত হন। প্রথমেই দৈনিক উত্তরণে কাজ করা শুরু করে পরবর্তীতে ‘আজকের কাগজ’, ‘ভোরের কাগজ’, ‘যায় যায় দিন’ প্রভৃতি দৈনিক পত্রিকায় কাজ করেন সঞ্জীব চৌধুরী। ভোরের কাগজে কাজ করার সময় সঞ্জীব চৌধুরী ফিচার লেখা শুরু করেন। ১৯৮৩ সালে একুশে বইমেলায় তিনি ‘মৈনাক’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন।Sanjib Chowdhury_03

ফরহাদ মজহারের কবিতা থেকে করা গানে সঞ্জীব চৌধুরীর কন্ঠের মোহময়তা আমাদের উপহার দিয়েছে এক ব্যর্থ গভীর প্রেমের গান, “এই নষ্ট শহরে… নাম না জানা যেকোনো মাস্তান”! টোকন ঠাকুর, সাজ্জাদ শরিফ, জাফর আহমেদ রাশেদ ও কামরুজ্জামান কামুর কবিতাতেও সুরারোপ করে গান গেয়েছেন সঞ্জীব চৌধুরী। কবিতাপ্রেমী এই গায়ক স্বচ্ছন্দে প্রিয় কবিতাগুলোকে রূপ দিতেন গানে। তার গানের বেশিরভাগই ছিলো নিজের কবিতা থেকে করা। ২০১০ সালের একুশে বইমেলায় মোট ৪৫টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘সঞ্জীব চৌধুরীর গানের কবিতা’।

সুগভীর পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি তৈরী করতেন একেকটি গান। ২০০৫ সালের ২৪ আগস্ট দিনাজপুরে ইয়াসমিনকে একদল পুলিশের ধর্ষণ ও হত্যার ভয়াবহ স্মৃতিতে সঞ্জীব গেয়েছিলেন ‘আহ… ইয়াসমিন’। এই গানের মাধ্যমে সঠিক বিচারের পক্ষে জনমনে জেগে ওঠে সচেতনতা। ‘আন্তর্জাতিক ভিক্ষা সংগীত’ এবং ‘চল বুবাইজান’- এগুলো তার করা প্যারোডি। এর মধ্য দিয়েও তিনি সমাজে মানুষের জন্য প্রেরণ করেছেন কিছু শক্তিশালী বার্তা।

সঞ্জীব চৌধুরীর রাজনৈতিক বোধ ছিল গভীর। স্কুলে থাকাকালে তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে জড়িত হন এবং এক সময়ে এর সাংস্কৃতিক সম্পাদকও নির্বাচিত হন। নেতৃত্ব দেন ছাত্র ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক দলকে।

Sanjib Chowdhury_02১৯৮৫তে  তিনি সাংস্কৃতিক সংগঠন “স্বরশ্রুতি”তে যুক্ত হন এবং তার হাতেই গড়ে ওঠে স্বরশ্রুতির গণসংগীতের স্কোয়াড। নেতৃত্ব দেন স্বরশ্রুতির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাকে। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি কেবল কলম চালাননি গামছা/চাদরে হারমোনিয়াম বেঁধে ঘাড়ে ঝুলিয়ে ছুটে গেছেন স্বরশ্রুতির সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন শহরে।

সাম্যবাদে বিশ্বাসী সঞ্জীব দৃঢ় আশাবাদী ছিলেন যে একদিন সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হবেই এই সমাজে। তাই তার সমস্ত আবেগ ঢেলে সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও ঔপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। সঞ্জীব চৌধুরী এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি এক নিমেষেই নিজেকে শ্রেণীচ্যুত করে ফেলতে পারতেন। তিনি সব শ্রেণীর মানুষের সাথে কথা বলতে পারতেন, মিশতে পারতেন তাদের মতো করে।

বাংলাদেশের লোকসংগীত, সুফীবাদ ও সুফী গানের প্রতি তার ছিলো এক অন্যরকম টান। সিলেটের মরমী গায়ক হাসন রাজার গান ছিলো সঞ্জীবের খুব প্রিয়। বাউল শাহ আবদুল করিমের ‘গাড়ি চলে না’ গানটি তার কন্ঠেই বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। ছোটবেলা থেকেই সংগীত অনুরাগী সঞ্জীব প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের উভয় সংগীতের সাথেই ছিলেন পরিচিত। তার প্রিয় গায়ক ছিলেন বব ডিলান, পিংক ফ্লয়েড, অ্যাল স্টুয়ার্ট।

সঞ্জীব চৌধুরীর যাদুকরী কন্ঠে ‘আমি তোমাকেই বলে দেবো’, ‘সাদা ময়লা রঙ্গিলা পালে’, ‘হাতের উপর হাতের পরশ’, ‘চোখটা এত পোড়ায় কেন’, ‘বায়োস্কোপ’, ‘তোমার ভাঁজ খোলো আনন্দ দেখাও’, ‘গাড়ি চলে না’, ‘নৌকা ভ্রমণ’, ‘হৃদয়ের দাবি’, ‘কোন মেস্তিরি বানাইয়াছে নাও’, ‘আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল চাঁদ’ সহ আরো বহু গান তাকে দিয়েছে বিপুল জনপ্রিয়তা।

সঞ্জীবের গানে ছিল এক স্বপ্নসন্ধানের হাহাকার। সে স্বপ্নের পাখি ধরবার এক আকাংখায় তিনি লিখেছেন:

“আমি ঘুরিয়া ফিরিয়া সন্ধান করিয়া,
স্বপ্নের অই পাখি ধরতে চাই,
আমার স্বপ্নেরই কথা বলতে চাই
আমার অন্তরের কথা বলতে চাই”

২০০৭ সালের ১৮ নভেম্বর দিবাগত অর্থাৎ ১৯ নভেম্বর রাত ১২.১০ মিনিটে অ্যাপোলো হাসপাতালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে মারা যান সঞ্জীব চৌধুরী।

আজীবন মানবকল্যাণে ব্রতী সঞ্জীব চৌধুরী সংস্কারবোধের ঘেরাটোপে আটকে থাকেননি কখনই, তাই মৃত্যুর পরও বিজ্ঞান তথা চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি রেখে গেলেন শেষ অবদান- তার দেহটি। আজও ঢাকা মেডিকেল কলেজে তার দেহাংশ চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ুয়া ছাত্রদের জ্ঞানচর্চায় ব্যবহার হচ্ছে।

হাস্যোজ্জ্বল এই মানুষটির চিন্তাভাবনা ছিল গভীর, ছিল সবার সাথে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। খুব সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারা এ মানুষটি ছিলেন সত্যিকার কর্মী। বাংলাদেশের তরুণসমাজের কণ্ঠে আজও বেঁচে আছেন তিনি, বেঁচে থাকবেন অনাদিকাল দলছুট বিপ্লবী সঞ্জীব চৌধুরী।

বাঙালীয়ানা/এসএল

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.