নববর্ষে একগুচ্ছ কবিতা

Comments

অনিবার্য গান 

শামীম আজাদ

আহা এখানেই
উন্মাদ কবিদের আশ্রম ছিলো
সারাক্ষণ কাব্য, কবিতা ও গান ছিলো
মচমচে দিনে ছিলো
ষোড়শীদের সাইকেল দৌড় আপ্রাণ।

নিরাক পরা বৈশাখে এক 
শালবন বীথি ছিলো
উৎসব উল্লাস ভাব ছিলো
ভাবাবেগে পা বাড়ালেই 
পকেটের কাছেই ছিলো 
সৌম্য সাঁওতাল পল্লী সুনসান ।

বিকেল পড়ন্ত হলে
ক্লান্ত মোষেদের ঘরে ফেরা ছিলো
আমাদের আপ্যায়নের জন্য 
আম্রবৃক্ষতলে স্টোভে করা চা ছিলো
প্রথম বৈশাখ দিনে ছিলো 
রবি ঠাকুরের গান।।

Noboborsho

গ্রাম বাতাসতাড়িত 

ইরাজ আহমেদ 

গ্রাম বাতাসতাড়িত।
ধরো চৈত মাসে বাড়ি ফিরছি আমি। কে ডেকেছে আমাকে?
খালে পানি নেই। কাঠের পুলটা আজও ভাঙা-ই পড়ে আছে
যদি দেখতে পেতাম!
যদি দেখতে পেতাম চাপকল আজও আছে,
ধূলোয় উড়ছে দুপুরের রোদ! 
গ্রাম বাতাসতাড়িত।
আমি লঞ্চ থেকে নামা অপরিচিত মানুষ। পকেটে শহর
বাঁচানোর লড়াই, ফ্লাইওভার, আত্মহত্যা।
মাঠের পর মাঠ
তারপর অনেক হাওয়া;
ধরো কোনো চৈত মাসে বাড়ি ফিরছি আমি।
পেছনে অনুসন্ধানী ধূলো, সারেং বাড়ির মেয়েরা খুঁজে দেখে
আমার গলায় গৃহবিমুখ ফাঁসির দাগ আছে কিনা।
দাদুকে কোথাও দেখতে পেলাম?
পুকুর ঘাট থেকে উঠে আসছেন সাদা শাড়ি
হাতে চুড়ি নেই বৈধব্য বলে।
কবে চাল ধুয়ে ফিরে গেছে বেগম এই পুকুরে
এত বেলা হলো ফিরতে আমার!
শালিক ডাকছে প্রাইমারি স্কুলে।

গিরগিটি রঙ বদল করলো
আলো খড়ের গাঁদায় এখনও হলুদ
কেউ চিঠি ফেলতে আসে আজও বক্সে! রানারের পায়ে ঝুমঝুম…?
আমি বাড়ি ফিরছি কতদিন পরে!
তাঁতিপাড়া সারাদিন ঠুকঠাক শব্দ করে
গোপালপুর বহুদূরের পথ।
তুমি কি গোসল করে চুল ঝাড়ছো?
সুপারি গাছের সারির কাছে ঘুঘু ডাকে। আমি বাড়ি ফিরছি;
গ্রাম বাতাসতাড়িত। 
ভাত চড়াতে এলো কেউ
ছোট মাছের গায়ে চিড়বিড় করে ঝোল আর মরিচের ঘ্রাণ;
আমি উত্তরের ঘরে উনিশ’শ আটাত্তর সালে বসে
রেডিওতে দুপুরের খবর শুনছি।

গ্রাম বাতাসতাড়িত। 
আগন্তুক হাওয়া,
আমি বাড়ি ফিরছি।

Noboborsho

বৈশাখের কথা

ভাস্কর চৌধুরী

আসবে বলে গেছে 
ঝড় ও বাদল নিয়ে একসাথে আসবে।
প্রতিটি বছর এই কাজ দাবদাহে যখন
আমার চামড়াগুলো কালো হয়ে আসে
তখন এক আবর্তে ফেলে জানান দিয়ে যায়
তার আগমন। ।
সকলের আসার মাঝে কিছু আবর্ত আছে। 
শীতের আবর্তেও আমরা যেমন চট কম্বল
গরমে উৎপাটন, তখন ঋতুর মধ্যবর্তী
হালকা কোনো ঋতু ঢুকে পড়ে। কিছুদিন
ফুল ফুটে।ফুল থেকে সুগন্ধ আলাদা হয়
আলাদা হতেই যেনো আসা। সকলেই
আলাদা হতেই একবার অথবা অনেকবার
একত্র হয়। একত্র ও এক হওয়ার মাঝে
পার্থক্য রয়ে যায়, যেমন মন ও পাহাড়ের খাঁজ।
সেই খাঁজে প্রথম আবর্ত নিয়ে ঝড় ঢুকে
বৃষ্টি নিয়ে, ধুলো উড়িয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে
বৈশাখ এসে বসে। 

আমরা মূলত এ দেশে কয়েকটি আবর্তের
মাঝে বসবাস করি। বৈশাখ তার বরণ মাস
তীব্র দাহ, এবং আমের মুকুলের মৌ মৌ
গন্ধে সে এসেই জানান দেয়,
এই উপহারগুলো নাও। আমের পক্কের আগে
তোমরা তো আচার বানাও। একটু জায়গা দাও। বসি।
তোমরা নাচ, নৃত্য এখন নয়
বৃষ্টি নিজেই পাখি নয় নাচে। এক রাতে
ঘনঘোর বাদলের রাতে নৃত্য হবে

বৈশাখের আলাদা নৃত্য আছে যা নাচের সাথে মেলে না কখনো।

Noboborsho

আমাদের প্রথম বর্ষবরণ

মারুফ রায়হান

রমনার বটমূলে দুজনার প্রথম বর্ষবরণ
আমাদের প্রথম যৌথ পহেলা বৈশাখ
পথে-পথে আজ একাত্তরের সুবাস, বর্ণমালার পাপড়ি

প্রথম প্রেমে পড়া কিশোরের মতো
আমি উৎকণ্ঠিত আমি শিহরিত
তুমি আসছো নগরীর পশ্চিম প্রান্ত হতে
সর্বউত্তরের উত্তরা নামের গ্রাম থেকে আমি
সূর্যোদয়ের আগে আমরা ঠিক পৌঁছে যাব
এই আমাদের অলিখিত অঙ্গীকার

দেখা হওয়া মাত্রই আমাকে সুযোগ না দিয়ে
তুমি আগে সম্ভাষণ জানাবে – শুভ নববর্ষ

আমি বলতেই পারতাম ‘স্বাগত নব হর্ষ’
অথচ প্রত্যুত্তর দেবার কথা ভুলে
তোমার কপালে সদ্যফোটা সূর্যের সঙ্গে
পুবের প্রকাণ্ড ওই গোল টিপ মিলিয়ে দেখছি তখন
বিমূর্ত বেলিতে নক্শা-তোলা বুঝি তোমার আঁচল
তোমার রঙধনু চুড়ি নিভৃতে গাইছে গুনগুন
তুমি চোখ নাচিয়ে বলবে: এইমাত্র এলেন বুঝি
আমি তো সেহরি খেয়েই বেরিয়ে পড়েছি
মিস করলেন লাইসার গান;
আমি বলবো, আচ্ছা বলতে পারেন
ইফফাত আজ গাইবেন কিনা?

আমরা সামনাসামনি আপনি বলি
আর মনে মনে তুমি,
পরস্পর হাত ধরি না বটে, তবু কি নেই অদৃশ্য ছুঁয়ে থাকা!
শাহবাগ আমাদের আহবান করে, আমরা এগোই
ঋষিজের মঞ্চ কি আছে আজ? নেই হায় ফকির আলমগীর
তোমাকে বলি: ওই উদ্যানে আমরা যারা কবিতা পড়তাম
সেই কবিদের ভেতর আজ নেই অনেকেই, তাঁরা নেই…
তুমি দৃঢ়তায় বলো, এখনও আমরা আছি
যতোক্ষণ আছি যেন একসঙ্গে প্রাণ ভরে সৃজনে আনন্দে বাঁচি

সুস্মিত সান্ত্বনা পেয়ে আমি তাকাই তোমার দিকে
তোমার মুখের হাসিতে তখন জ্বলজ্বল করছে
বাংলা নববর্ষ আর শোভাময় পহেলা বৈশাখ।

Noboborsho

বৈশাখের তুমুল গান

ফেরদৌস নাহার

ফিরে ফিরে দেখা এক স্বপ্ন
সারাক্ষণ অস্থির ঘূর্ণি-বাঁকে
চুপচাপ থাকবে না বসে
প্রাকৃতিক ডাইরি খুলে
পড়ে সে তুমুল অন্বেষণ
যায় যায় গাঢ়তর ঝোঁক
আমাদের স্মরণীয় মুখ

বয়স বাড়ে না একেবারে
ঘুরেফিরে ঝামেলায় জুড়ে
চঞ্চল মন ডাকে পিছু
দিনরাত নেই অবসর
উদ্দাম বাতাসের তূণ
শরগুলো ছুড়ে দেবে বলে
অবুঝ ইশারা করে বসে
ডাকছে সে মূলত প্রহর

অপেক্ষায় দিন যাবে চলে
ভুলভাল ঝড়ো ককটেলে
তোমাকে দেখাব বলে আজ
জানালাটা খুলতেই একি
বৈশাখ ঝাঁপিয়ে এলো!

Noboborsho

নববর্ষ

মূর্তালা রামাত

ধোঁয়া ওঠা কয়েকটা ভাতকে
বরফ পানিতে ডুবিয়ে মারার গল্পটা
আমি হাসতে হাসতেই নববর্ষকে বলি-
মরার পর হতভাগা ভাতগুলো
অবিশ্বাসে কেমন সাদা কাগজের চোখে তাকিয়ে থাকে
তাদের থেতলানো বুকে চকচকে ইলিশের মাতোয়ারা মেখে
আমরা কেমন করে মাতাল উল্লাসের আড়ালে মুছে ফেলি 
সমস্ত গণহত্যার দাগ, আর রংবেরংয়ের সাজগোজে 
একে অন্যের হত্যার উপর ঝুলিয়ে দিই
বৈশাখ থেকে ঝড় কুড়ানোর বালিকা বিলবোর্ড-
যার নিচে ক্রমশ হাড় হয়ে যাওয়া মুখগুলো
শূন্য শানকিতে উঁকি মেরে খোঁজে
একমুঠো ভাতের জীবন!

Noboborsho

সেদিনও প্রথম বৈশাখ

লুৎফুল হোসেন

চৈত্রের শেষ সন্ধ্যায় গোলার আঘাতে
নিস্পন্দ তিনটি দেহ 
পড়ে আছে ট্রেঞ্চের গায়ে
যেন হেলান দিয়ে ঘুমিয়েছে 
অপেক্ষাক্লান্ত তিনটি মানুষ
তাদের ছিল তীব্র ক্ষুধার জ্বালা 
এক সানকি পান্তায় নুন-লঙ্কা
সাথে যদি জুটে যেতো
একটু ঝোল এক টুকরো মাছ
যদিও এখানটায় লোকে আজকাল 
ছাড়ান দিয়েছে খাওয়া
নদীর কিংবা বিলের মাছ
রোজ রোজ রক্তাক্ত হতে হতে
অভ্যস্ত জলে মৃতদেহের সঙ্গে
সাঁতরে ফেরা মাছ জীবিতরা
খায় কি করে

রাতের আঁধার কেটে ভোর 
জাগতে শুরু করলেও
মানুষগুলো জাগবে না আর
কাঁঠালপাতা-আমপাতা চুঁইয়ে 
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিজল 
তখনও ক্লান্তিহীন আত্মাহুতি দিয়ে যাচ্ছে
নিস্পন্দ শরীরগুলোয়
যেনো ধুয়ে দিচ্ছে ক্লান্তি
বুলিয়ে দিচ্ছে মাতা বা ভগিনীর
স্পর্শতৃষায় বেভুল আঙুল
থিতু হওয়া দীর্ঘ নৈশব্দ ফুঁড়ে 
পাখিরাই শুধু সরবে জানিয়ে যাচ্ছে
আজ
বৈশাখের প্রথম সকাল
হাওয়ায় ভাসছে কোলাহলহীন
বর্ষবরণের প্রহর- আশ্চর্য উন্মাতাল
পাতাদের কোরাস মর্মর
বুঝিবা ফিসফিসিয়ে গাইছে মটির গান
বাঙালির নতুন বছর
মৃতের শুমারি করে জীবিতের
মুষ্ঠিতে নিভৃতে গুঁজে দিচ্ছে
দুর্জয় প্রতিরোধের অঙ্গীকার

ফিরে যাওয়া যোদ্ধারা রাইফেলের বাটে
দৃঢ়তর খামচে ধরছে জেদ 
হায়েনা ও শকুনের
বুকে গুঁজে দিতে প্রতিশোধ
তপ্ত সীসার 
আলো ফুটতে শুরু করা
বছরের প্রথম দিনে 
ভয়ানক আহত যে দুজন 
বন্দি হয়েছে গতকাল
হানাদার ক্যাম্পে নখ উপড়ানো চিৎকারে
আড়াল করছে তারা 
ক্যাম্প ও সহযোদ্ধার হদিস খোঁজা
নির্মম অত্যাচার
জানেনা তখনও আদৌ- আজ নববর্ষে 
পৃথিবী ছেড়ে যাবার পর
তাদেরও হবে না সৎকার 
অথচ মা ভাগিনি বাবা
অপেক্ষার ফাতনায় কখনও থামাবে না আশা
সন্তান কিংবা ভ্রাতার জন্যে
প্রতীক্ষায় কোনদিনই টানবে না 
যতি বা যবনিকা 

Noboborsho

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট