৩১ অক্টোবর ২০১৫ ছিলো আমার বাসা ছাড়ার শেষ দিন। পুলিশি মশকরায় তিন মাসে আমার ৫ম বাসা! নতুন কোনো বাসা ঠিক করিনি, কোথায় যাবো তাও জানি না। সিএমসির ছোট ভাইদের ফোন করে বললাম, আমি আসতেছি, ডক্টরস হোস্টেলে একটা রুম রাখিস। জিনিসপত্র ফেলতে ফেলতে আর কিছু নেই। একটা বিছানা, চাদর বালিশ, জামা কাপড় আর কমপিউটার। সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছোটভাই জুয়েল সকালে ডাক দিলো, ভাই দেখে যান। পর্দার ফাক দিয়ে দেখি লাগোয়া পাশের বিল্ডিংয়ের ছাদে এক তরুণ মোবাইল হাতে কথা বলার ভান করছে। বেসিকালি তার কাজ নজরদারি।
জুয়েলকে বললাম সব জিনিসপত্র নিয়ে আমার শশুরবাড়িতে রেখে আসতে। অল্প কিছু কাপড়চোপর আর ল্যাপটপ একটা ব্যাগে ভরে আমি নিচের এক এএসআইকে বললাম লিফট দিতে। ঢাকা চিটাগাং রোডে আমার অলটাইম চয়েস সোহাগ। প্রায় তিরিশ বছর ধরে। কাউন্টারে গিয়ে দেখি টিকেট নাই। বাংলাদেশে এখন আর গিয়ে টিকেট জোটে না। সেখানে দেখি অনেক ভিড়। শুনলাম কিসব ভর্তি পরীক্ষা চলতেছে। ছেলেগুলারে আমার সুবিধার মনে হইলো না। তারপরও একটা রিকশা নিয়ে রওনা দিলাম ফকিরাপুল। সেখানে যদি জোটে। একই লোকের সঙ্গে দুইতিনবার দেখা হওয়া কাকতালীয় না। ফকিরাপুলে নিশ্চিত হইলাম আমারে ফলো করা হইতেছে।
অনেক রিকুয়েস্টের পর অন্য এক বাসে সন্ধ্যার একটা সিট জুটলো। কিন্তু মন কুডাক দিতেছে। টিকেট নিয়া এলাকার ছোট ভাই আল আমিনরে ফোন দিলাম। ওর বাসা কাছেই। এসে নিয়ে গেলো। চিটাগাংয়ে ফোন করলাম যে আসতেছি না। টিকেটের পয়সাটা দিলাম কাউরে নিশ্চিত রাখতে। আমিনের বাসায় খাওয়া দাওয়া করে শুইছি, একটু পর সে ডাক দিলো ভাই উঠেন, আপনে তো লাকিলি বাইচা গেছেন! টিভিতে দেখি কয়েক জায়গায় হামলা হইছে। দীপন মারা গেছে, টুটুল ভাই রণদীপম দা আহত। টুটুল ভাইরে বাচাইতে গিয়ে গুরুতর আহত হইছে আরেকজন।
সে রাতটা আমিনের বাসায় থেকে পরদিন গেলাম শশুরবাড়ি। বউ পড়াশোনা করতে সুইডেনে, তাই রাজকন্যা ওইখানেই শরণার্থী। আমাকে দেখে বাড়িওয়ালী সরাসরি জিজ্ঞেস করলো আপনি কি এইখানে থাকবেন? আমি কোনো পুলিশি ঝামেলা চাই না। বললাম- না, আমি মেয়েকে দেখে চলে যাবো। এর মধ্য প্রান্ত ফোন দিলো পিয়াল ভাই আপনি কই? কেমন আছেন। বললাম, সে বললো থাকেন, ব্যবস্থা করতেছি। সন্ধ্যায় সুমন এসে সিএনজিতে করে নিয়ে গেলো ওর বাসায়। শাহরিয়ার কবির ভাইর এপার্টমেন্ট। পুলিশ আছে, সেখানে আমার মতো আরেক রিফিউজি আজম মামা। রাতে রাজকন্যার ফোন- হ্যাপি বার্থডে বাবা, তুমি ঠিক আছো তো?
তখন বুঝলাম আসলে নিজদেশেই আমি রিফ্যুজি হয়ে গেছি। আমার যাওয়ার জায়গা নাই। সবচেয়ে বড় কথা আমি একা কোনো ব্যাপার না। রাজকন্যার ভবিষ্যতটাও আমার কারণে অনিশ্চিত হয়ে গেছে। সেই ১৮ বছর বয়সেই দেশ ছাড়তে পারতাম। স্কলারশিপ জুটেছিলো, পড়তে যেতে পারতাম। যাইনি। এরপরও অনেকভাবে অনেক সুযোগ ছিলো। নিইনি। ৫০ বছর বয়সী কারও জন্য বিদেশে ঘুরতে যাওয়া দারুণ ব্যাপার, থাকতে যাওয়া ভয়াবহ! আমার উপায় ছিলো না। রাজকন্যার জন্য এই আসাটা জরুরী ছিলো। এখনও মরিনি এইজন্য হয়তো আমার খুশী হওয়া উচিত। কিন্তু এভাবে এই বেচে থাকাটা আমি একদমই উপভোগ করি না। করছি না…
অমি রহমান পিয়াল
ব্লগার এবং অনলাইন এক্টিভিষ্ট
