৬ দফা প্রণয়নে যখন ভীত পাকিস্তানী শাসক আইয়ুব খান ঠিক তখনই পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা সামরিক বাহিনীর কতিপয় বাঙালী সদস্য ও কিছু বাঙালী আমলা ও বেসামরিক বাঙালীর সশস্ত্র সংগ্রামের পরিকল্পনার কথা জানতে পারে। তারা খুঁজতে থাকে এর সাথে শেখ মুজিবুর রহমানের সংশ্লেষ। পেয়েও যায়। লাহোর, করাচী, রাওয়ালপিন্ডি, ঢাকা, চট্টগ্রামে হানা দিয়ে গ্রেফতার করে অসংখ্য বাঙালী সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিকে। জেল গেট থেকে শেখ মুজিবকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যান্টনমেন্টে। শুরু হয় আটককৃতদের চরমতম শারিরিক ও মানসিক নির্যাতন। সাক্ষ্য নেবার সবরকম চেষ্টা করা হয় যাতে প্রমাণ করা যায় যে শেখ মুজিব পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল সশস্ত্র সংগ্রামের। তাহলেই বাঙালীকে নেতৃত্বহীন করা যাবে শেখ মুজিবকে ফাঁসী দিয়ে। ৩৫ জনকে আসামী করে শুরু হয় “রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য” মামলা। এই তথাকথিত ষড়যন্ত্রের সাথে “ভারত” এর যুক্ততা বিশ্বাসযোগ্য করতে অনানুষ্ঠানিকভাবে মিডিয়ার কাছে এই মামলাকে পরিচিত করা হয় “আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা” নামে। আইয়ুবের সেই ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিতে অভিযুক্ত সকলেই অস্বীকার করেন তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ। সাজানো সাক্ষীরাও বেঁকে বসেন আদালতে।
আগরতলা মামলার ১৭ নম্বর অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হক ১৯৩৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারী নোয়াখালী জেলার সুধারামপুর থানার সোনাপুর গ্রামের পিতা কাজী মুজিবুল হকের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে নোয়াখালী জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৫৬ সালে জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ ক’রে ঐ বছরই পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে যোগদান করেন। পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শক্তির কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার স্বপ্নে বিভোর জহুরুল হক পরিকল্পনা অনুযায়ী করাচীতে বাঙালী নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের গোপনে হাল্কা অস্ত্র ও গ্রেনেড প্রক্ষেপণ প্রশিক্ষণ দিতেন।
বাঙালী কর্পোরাল (পরবর্তীতে মামলার ৩ নম্বর সাক্ষী) ফরিদপুরের জাজিয়া থানার রূপবাবুর চর গ্রামের মৌলভী ফজিল মোল্লার ছেলে আমীর হোসেন মিঁয়ার বিশ্বাসঘাতকতায় ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে সার্জেন্ট জহুরুল হককে গ্রেফতার করা হয়। করাচির যে বাসায় প্রশিক্ষণ দেয়া হত সেই বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় ফ্লাইট সার্জেন্ট আব্দুল জলিলকে, জব্দ করা হয় প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত গ্রেনেড যা পরে মামলার আলামত হিসেবে যুক্ত করা হয়।
মামলা চলার এক পর্যায়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দী সার্জেন্ট জহুরুল হক যখন ১৫ ফেব্রুয়ারী সকালে কারাকক্ষ থেকে বের হয়ে যখন বাথরুমে যাচ্ছিলেন তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাবিলদার মঞ্জুর শাহ কারাকক্ষের সামনে সার্জেন্ট জহুরকে গুলি করলে তিনি এবং ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক গুরুতর আহত হন। দ্রুত তাদের ঢাকা সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেয়া হলেও ডাক্তাররা সার্জেন্ট জহুরকে মৃত ঘোষণা করেন।
সার্জেন্ট জহুরকে হত্যা করে আগুনে ঘি ঢালে আইয়ুব খান নিজেই। স্বৈরাচার আইয়ুব খানের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আসাদ, মতিয়ুর, সার্জেন্ট জহুর, ড. শামসুজ্জোহাসহ প্রায় দেড়’শ থেকে দু’শ শহীদের রক্তে উজ্জীবিত আন্দোলন রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে।
২২ ফেব্রুয়ারী, ১৯৬৯, মাথা নামিয়ে আইয়ুব খান মামলা তুলে নিতে বাধ্য হয়, বাধ্য হয় অভিযুক্তদের মুক্তি দিতে।
বাঙালীয়ানা/এসএল