প্রতিবাদ বিদ্রোহ ও চেতনার কবি নজরুল

Comments

সন্দীপ দে 

বাংলার কাব্য ও সাহিত্য ভুবনে কবি কাজী নজরুল ইসলামের (২৫ মে, ১৮৯৯ – ২৯ আগস্ট, ১৯৭৬) আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল রাজনৈতিক চেতনা নিয়ে। বলা যেতে পারে, তাঁর মধ্যে এই চেতনার অঙ্কুরোদগম হয়েছিল ছেলেবেলার সীমাহীন দারিদ্র্য,কষ্ট-যন্ত্রণা এবং তা থেকে মুক্তির জন্য জীবন সংগ্রাম থেকে। নজরুলের জন্মের সময় তাঁদের পরিবার টানাটানির মধ্যদিয়ে চলছিল। নজরুলের যখন মাত্র আট বছর বয়স তখন তাঁর বাবা কাজি ফকির আহ্‌মদের মৃত্যু হয়। এর ফলে তাঁদের পরিবারে অভাবের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। এই অবস্থায় মা জাহেদা খাতুন অত্যন্ত কষ্টের মধ্যদিয়ে সংসার প্রতিপালন করেছেন। কিন্তু পিতৃহীন পরিবারের আর্থিক কষ্টের চাপ ছেলেবেলায় নজরুলের ওপর এসে পড়ে। এই দারিদ্র্য মোচনের জন্য পাড়ার মসজিদে এমামতি, মাজারে খাদেমগিরি এবং ১৯১০ সালে গ্রামের মক্তব থেকে পাশ করার পর সেই মক্তবেই পড়ানোর কাজ নিয়েছিলেন কিছু অর্থ উপার্জনের জন্য। কিন্তু এভাবে বেশি দিন চালানো সম্ভব না হওয়ায় রানিগঞ্জে এসে তিনি এক রেলওয়ে গার্ডের বাড়িতে বাবুর্চির কাজ নেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র তেরো বছর। এছাড়া তিনি আসানসোলে  মাসিক এক টাকা মাইনেতে রুটির দোকানে কাজ করেছেন। সেখানে এক পুলিশ কর্তার নজরে পড়েন এবং নজরুলকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে আসেন। তিনি নজরুলের গান করা ও রাত জেগে বই পড়া ইত্যাদি প্রতিভা লক্ষ করেন। তাই নজরুলের প্রতি তাঁর এক রকম মায়া পড়ে যায়। সেজন্য সেই পুলিশকর্তা যখন আসানসোল থেকে বদলি হন, তখন নজরুলকে সঙ্গে করে ময়মনসিংহ জেলায় তাঁর গ্রামের বাড়ি নিয়ে এসে দরিরামপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভরতি (১৯১৪) করে দেন। এখানে অবশ্য বেশি দিন নজরুলের মন টেকেনি।  বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করা সত্ত্বেও বছরখানেক পর তিনি আবার চলে আসেন বর্ধমানের রানিগঞ্জে। এখানে ভরতি হন শিয়ারশোল রাজ স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে। এটিই ছিল নজরুলের জীবনের শেষ স্কুল। এই স্কুলে পড়ার সময়েই তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় ভিন্ন স্কুলের ছাত্র শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের। পরবর্তীকালে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক।      

এই নজরুলই আবার একেবারে কৈশোরে যখন বর্ধমান জেলার মাথরুন গ্রামে নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউট-এর ছাত্র (১৯১১), তখন পারিবারিক যোগসূত্রে যোগ দিয়েছেন গ্রামীণ লোকশিল্প লেটো গানের দলে। এই দলের কনিষ্ঠ শিল্পী হিসেবে ঘুরে বেড়িয়েছেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, শৈশব-কৈশোরের এইসব বিচিত্র কাজের ফাঁকে তিনি সুযোগ মতো পড়াশোনাও চালিয়ে গেছেন। সে যাইহোক, জীবনে বেড়ে ওঠার  সন্ধিক্ষণে একটা দীর্ঘ পর্বজুড়ে এই সমস্ত অভিজ্ঞতা নজরুলকে লড়াই করে বেঁচে থাকার প্রেরণা জুগিয়েছে। এই ছোট্ট বয়সেই উপার্জনের তাগিদে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে এবং লেটো গানের দলের সঙ্গে গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে তিনি গ্রাম-সমাজের মধ্যে চলা শোষণ-বঞ্চনা,জাত-পাত,উঁচু-নিচু ও ধর্মীয় ভেদাভেদ প্রথা,প্রতারণা ইত্যাদি প্রত্যক্ষ করেছেন। এবং তাঁর মনের গভীরে এসবের প্রতিবিধানের ভাবনা সঞ্চিত হয়েছে। আর এই ভাবনা থেকেই তাঁর মধ্যে প্রতিবাদের স্পৃহাও সঞ্চারিত হয়েছে।

সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রভাব

কিশোর বেলায় নজরুলের জীবনে বিদ্রোহ-বিপ্লবের যতটুকু চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল তার পেছনে সাঁওতাল বিদ্রোহেরও প্রভাব ছিল বলে নজরুল জীবনীকার কারও কারও অভিমত । নজরুলের জন্মস্থান বর্ধমানের চুরুলিয়ার খুব কাছেই সাঁওতাল পরগনা। ১৮৫৫ সালে এই সাঁওতাল পরগনাতেই ঘটে যায় ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহ। সিধু ও কানু এই দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে আদিবাসী সাঁওতালরা সেদিন ব্রিটিশ সেনার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। তীর-ধনুক বর্শার মতো দেশীয় অস্ত্র নিয়েই সেদিন ইংরেজদের কামান-বন্দুকের বিরুদ্ধে  তাঁরা বীরত্বপূর্ণ লড়াই লড়েছিলেন এবং ইংরেজদের হটিয়ে দিতে বাধ্য করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশাল সেনাবাহিনীর সাহায্যে, প্রচণ্ড দমন পীড়ন চালিয়ে সাঁওতালদের এই বিদ্রোহ দমন করেছিল ব্রিটিশ শাসকেরা। ১৮৫৭ সালে সিপাহিদের বিদ্রোহ, যা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে অভিহিত, ঠিক তার দু’বছর আগে ঘটে যাওয়া এই আদিবাসী সাঁওতালদের বিদ্রোহ ব্রিটিশ শাসনের ভিত নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল।  এই বিদ্রোহের পর একই অঞ্চলে ঘটে আদিবাসী জনগোষ্ঠী কোলদের বিদ্রোহ এবং মুন্ডা বিদ্রোহ। এসব বিদ্রোহের গল্পগাথা চুরুলিয়া ও সংলগ্ন অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে ফিরত। কাজেই স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া যায় এইসব বিদ্রোহের কাহিনি কিশোর নজরুলের কানেও অবধারিতভাবেই পৌঁছেছে এবং তাঁর বিদ্রোহী সত্তা ও মনন তৈরিতে কিছু পরিমাণে হলেও এগুলি প্রভাব ফেলেছে। 

কবির জীবনে দুই বিপ্লবীর প্রভাব

নজরুল ইসলামের জীবনে বিদ্রোহী চেতনা, বিপ্লবী সত্তা, প্রতিবাদী স্পৃহা ও রাজনৈতিক ভাবনার উন্মেষের পিছনে যে সমস্ত কারণ ছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল দু’জন বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামীর অবদান। তাঁরা হলেন নিবারণচন্দ্র ঘটক এবং মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ। নিবারণচন্দ্র ঘটক ছিলেন শিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলের শিক্ষক। তিনি ছিলেন একজন স্বদেশি বিপ্লবী ও আদর্শবাদী মানুষ। বিপ্লবী যুগান্তর দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নিবারণচন্দ্র ঘটক। তিনি নজরুলকে ছাত্রাবস্থায় বিপ্লবপন্থায় আগ্রহী করে তোলার পাশাপাশি  সশস্ত্র বিপ্লববাদে বিশ্বাসী করে তোলেন। তাঁর সংস্পর্শে এসেই নজরুল স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্‌বুদ্ধ হন এবং সংগ্রামী চেতনা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সশস্ত্র উপায়ে দেশকে মুক্ত করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। এ ঘটনার সাক্ষ্য মেলে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের লেখায়। তিনি তাঁর রচিত ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা’ য় লিখেছেন: “শিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলের আরও একটি কথা এখানে বলে রাখি। শ্রী নিবারণচন্দ্র ঘটক ওই স্কুলে নজরুলের একজন শিক্ষক ছিলেন। তাঁর বাড়ীও ছিল শিয়ারশোলেই। তিনি সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের পশ্চিম বঙ্গীয় দলের, অর্থাৎ যুগান্তর দলের সহিত সংযুক্ত ছিলেন। পল্টন হতে ফেরার পরে নজরুল নিজেই আমার নিকটে স্বীকার করেছিল যে সে শ্রী ঘটকের দ্বারা তাঁর মতবাদের দিকে আকর্ষিত হয়েছিল।”

 রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশের আগে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের পরিচয় ছিল  ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ র অন্যতম সংগঠক ও সহকারী সম্পাদক। কিছুদিন পর এই সমিতি প্রকাশিত ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ র সর্বক্ষণের কর্মী।  মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ( পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা অধ্যাপক) এবং মুহম্মদ মোজাম্মেল হক ছিলেন এই পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক। মুজফ্‌ফর আহ্‌মদকে এই পত্রিকার প্রায় সমস্ত কাজই করতে হতো। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, ” আমি সমিতির সহকারী সম্পাদক ছিলাম বটে, কিন্তু তার সব রকম কাজই আমায় করতে হতো। পত্রিকার মোড়কগুলি আমি লিখতাম,পত্রিকার প্যাকেটগুলি ডাকে দিতাম আমিই এবং সমিতি ও পত্রিকা -সংক্রান্ত সমস্ত চিঠিপত্রও আমাকেই লিখতে হতো। এমন কি পত্রিকার কিঞ্চিৎ সম্পাদনাও মাঝে মাঝে আমায় করতে হতো। “(পূর্বোক্ত)।  এই ‘ বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’  সম্পর্কে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ নিজেই লিখেছেন:

” ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ নামটি সাম্প্রদায়িক হলেও আসলে তা সাম্প্রদায়িক সংগঠন ছিল না। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানও তা ছিল না।… বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির মারফতে বাঙালীদের সামনে বিশেষ করে বাঙালী হিন্দুদের সামনে মুসলিম সভ্যতার নানান দিক বাঙলা ভাষায় তুলে ধরা হবে, এটাই ছিল সমিতির একটা বিশেষ উদ্দেশ্য। 

” ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় হিন্দু লেখকদের লেখাও ছাপা হ’ত। সাহিত্য সমিতির সভায় হিন্দু কবি ও লেখকরাও যোগ দিতেন। ” (সূত্র: ‘আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’)।

বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো এই ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ র মাধ্যমেই নজরুলের সঙ্গে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের সংযোগ গড়ে ওঠে এবং তা পরবর্তীকালে আন্তরিক সখ্যে রূপান্তরিত হয়। 

মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ পরবর্তীকালে দেশে, অবিভক্ত বাংলায় কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে তোলায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি হয়ে ওঠেন কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। পার্টির অভ্যন্তরে তাঁর পরিচিতি ছিল ‘কাকাবাবু’ হিসেবে। বিশের দশকের শুরুতে অভিভক্ত বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার যে প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন মুজফ্ফর আহ্‌মদ, আব্দুল হালিম প্রমুখ, সেই প্রয়াসের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন সেই সময় সাম্যবাদী মতাদর্শে উদ্‌বুদ্ধ হয়ে ওঠেন কাজী নজরুল ইসলাম। প্রসঙ্গত, সেনা বাহিনী থেকে ফিরে এসে নজরুল ইসলাম উঠেছিলেন ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির দপ্তরে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের কাছে। তখন থেকেই একে অপরের প্রতি ভালোবাসা এবং অন্তরঙ্গতার সূচনা। যা অটুট ছিল আজীবন।

সেনাবাহিনীতে বিপ্লবী চেতনার উদ্ভাস

১৯১৫ থকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত নজরুল শিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯১৭-তে তিনি ক্লাস টেনের ছাত্র। স্কুলের প্রি-টেস্ট পরীক্ষা হয়ে গেছে। পরিচিত সকলেরই আশা, মেধাবী ছাত্র নজরুল ম্যাট্রিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে বৃত্তি পাবেন। কিন্তু কাউকে কিছু না জানিয়ে হঠাৎ তিনি ‘বেঙ্গলি ডবল কোম্পানি’ তে যোগ দেন। প্রশিক্ষণের জন্য প্রথমে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় পেশোয়ার জেলার মহকুমা শহর নৌশহরাতে,পরে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় করাচির সেনানিবাসে। এই বেঙ্গলি ডবল কোম্পানির আয়তন ক্রমশই বাড়তে থাকায় তা একটি রেজিমেন্টে(ব্যাটেলিয়ন)পরিণত হয়। এর নাম হয় ‘৪৯ নম্বর বেঙ্গলি রেজিমেন্ট’ বা ‘৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টন’। পল্টনে নজরুলকে অন্যান্য সবার মতো কিছুদিন নিয়মিত কুচকাওয়াজ করতে হয় এবং সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হয়। এখানে তিনি কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পদে উন্নীত হয়েছিলেন। এ পদে নিযুক্ত হওয়ার পর তাঁর দায়িত্ব ছিল ডিপোয় বসে পল্টনের রসদ এবং সৈনিকদের বুট, পোশাক ইত্যাদি সরবরাহ করা। এর সাথে মাঝে মাঝে নৌশহরায় ট্রেনিংয়ে যাওয়া এবং করাচি শহরে কেনাকাটা  করতে যাওয়া ছাড়া কোয়ার্টারে সীমাবদ্ধ জীবন ছিল তাঁর। বহির্মুখী স্বভাবের নজরুল ছিলেন এখানে সকলের প্রিয়। এখানে গানে, কবিতায়, গল্প, রসিকতায়, উচ্চকিত হাসিতে সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন তিনি। 

নজরুলের সেনাজীবনের একটি বড়ো অর্জন ফারসি ভাষা শিক্ষা। এখানে একজন পাঞ্জাবি মৌলবি সাহেবের কাছে তিনি ফারসি ভাষা চর্চা করেন। নজরুলের ফারসি ভাষা শেখা, ফারসি ভাষার মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ কাব্য পাঠ পরবর্তী জীবনে কাব্য,  সাহিত্য ও গানে ফারসি শব্দ ও সুরের সফল প্রয়োগ সামগ্রিকভাবে বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতিতে একটা নতুন ধারার সূচনা করেছিল। তিনি এখানে আরবি ভাষাও শেখার সুযোগ পান। যাইহোক, সে এক ভিন্ন প্রসঙ্গ।

সেনানিবাসে থাকার নজরুল যে আরেকটি বিষয়ে  চর্চার সুযোগ পান সেটি হলো সংগীত। লেটো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সুবাদে এবং শিয়ারশোল রাজ স্কুলে পড়ার সময়ে উচ্চাঙ্গ সংগীত সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ হয়েছিল নজরুলের। তাঁর সংগীত সাধনার প্রাথমিক পর্বের পূর্ণতা আসে তাঁর সৈনিক-জীবনে। করাচির সেনানিবাসে নজরুলের অন্যতম সাথি জমাদার শম্ভুচন্দ্র রায় কবি-বন্ধু প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়কে জানিয়েছেন, বেশ ভালো ভালো গাইয়ে বাজিয়েরাও পল্টনে যোগদান করেছিল। এঁরা প্রায় প্রত্যেকেই সন্ধ্যায় নজরুলের ঘরের সামনে বসে গান বাজনা করতেন। আবার নজরুল-জীবনীকার অরুণ কুমার বসু লিখেছেন, ” [ পল্টনে ] শাস্ত্রীয় সংগীত শেখার সুযোগও এসে গেল অযাচিতভাবে। সহকর্মীদের কেউ কেউ ছিলেন গুণী সঙ্গীতজ্ঞ, কেউ  কণ্ঠে কেউ যন্ত্রে। “  সহকর্মীরা পরবর্তীকালে জানিয়েছেন, নজরুল ব্যারাকে হারমোনিয়াম বাজিয়ে দরাজ গলায় গান বাজনা করতেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, ছাত্র জীবনেই নজরুল হারমোনিয়াম ও বাঁশি বাজাতে জানতেন বলে জানা যায়। পল্টনে হারমোনিয়াম, ব্যাঞ্জো, ক্লারিয়োনেট, কর্নেট, অর্গান ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র ছিল। এসব বাদ্যযন্ত্র তিনি বাজাতে শিখেছিলেন। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, স্বরলিপি দেখে তিনি একটার পর একটা রবীন্দ্র সংগীত তুলে রবীন্দ্র সংগীতের ভাণ্ডারকে দু’ বছরের মধ্যেই ঋদ্ধ করে তুলেছিলেন। 

পল্টনে আরবি-ফারসি শিক্ষা, গান বাজনা চর্চার পাশাপাশি বিপ্লবী পত্র-পত্রিকা গোপনে সংগ্রহ করে পড়া, বেশ কিছু বাংলা পত্র-পত্রিকার চাঁদা দিয়ে গ্রাহক হয়ে আনানো ও পড়া – এই ছিল তাঁর নিবিড় দিনলিপি। পল্টনে নজরুলের সঙ্গী অনেকেই পরবর্তীকালে উল্লেখ করে গেছেন, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের তখন পর্যন্ত প্রকাশিত অনেক বই তাঁর সংগ্রহে ছিল। এছাড়া বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রায় সব প্রধান সাময়িকীর গ্রাহক ছিলেন তিনি। বলা যায় নজরুলের সাহিত্যচিন্তা, সমাজ ভাবনা ও আন্তর্জাতিক চেতনার আলোকে মুক্তি সংগ্রামী কবি হয়ে ওঠার প্রস্তুতি পর্ব রচিত হয়েছিল এখানেই। আর এটাও সহজেই অনুমান করা যায় যে, হিন্দু- মুসলমান বিদ্বেষ-কলুষ ঘোচাবার দৃঢ় মনোভূমি তাঁর গড়ে উঠেছিল করাচির এই সেনানিবাসেই। 

এখানে নির্দিষ্ট দায়িত্বের বাইরেও তিনি সবার বিপদে, সমস্যা নিরসনে অবলীলায় উদ্যোগী হতেন। সামাজিকভাবে সবার সঙ্গে মেলামেশা করতেন এবং অল্প সময়ের মধ্যে সবাইকে আপন করে নিতে পারতেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নজরুল সবার কাছে পরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। প্রাণচঞ্চল নজরুল সব সময় আনন্দ উল্লাসে মশগুল হয়ে থাকতেন এবং গোটা পল্টন মাতিয়ে রাখতেন। সর্বদা হই-হই করে বেড়াতেন বলেই সবাই নজরুলকে বলতেন  ‘হৈ হৈ কাজী’

লাল ফৌজের বিজয় উদ্‌যাপন

করাচির পল্টনে থাকার সময়েই কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবে লাল ফৌজের বিজয় বার্তা  পৌঁছায় নজরুলের কাছে। এই বার্তা শুনে উচ্ছ্বসিত নজরুল এখানেই এক সন্ধ্যায় সঙ্গী বন্ধুদের নিয়ে আলোচনা, প্রবন্ধ পাঠ ও গানের মধ্য দিয়ে আনন্দ উদ্‌যাপন করেছিলেন। নজরুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায় তাঁকে লেখা নজরুলের পল্টন-সঙ্গী জমাদার শম্ভুচন্দ্র রায়ের  একটি চিঠি(১৯৫৭ সালের ৬ জুন)  তাঁরই(প্রাণতোষ) রচিত নজরুল-জীবনী ‘ কাজী নজরুল গ্রন্থে তুলে ধরে এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন এভাবে:

“একদিন সন্ধ্যায়, ১৯১৭ সালের শেষের দিকেই হবে, এখন ঠিক স্মরণে আনতে পারছি না, হয়ত সেটা শীতের শেষ দিক।  নজরুল তার বন্ধুদের মধ্যে যাদের বিশ্বাস করতেন তাদের এক সন্ধ্যায় খাবার নিমন্ত্রণ করে। অবশ্য এরকম নিমন্ত্রণ তাই সে তার বন্ধুদের করত। কিন্তু ঐদিন যখন সন্ধ্যার পর তার ঘরে আমি ও নজরুলের অন্যতম বন্ধু, তার অর্গান মাস্টার হাবিলদার নিত্যানন্দ দে প্রবেশ করলাম, তখন দেখলাম অন্যান্য দিনের চেয়ে নজরুলের চোখে মুখে একটা অন্যরকম জ্যোতি খেলে বেড়াচ্ছিল। উক্ত নিত্যানন্দ দে মহাশয়ের বাড়ি ছিল হুগলী শহরের ঘুটিয়াবাজার নামক পল্লীতে। তিনি অর্গানে  একটা মার্চিং গৎ বাজানোর পর নজরুল সেদিন যে সব গান গাইলেন ও প্রবন্ধ পড়লেন তা থেকেই আমরা জানতে পারলাম যে রাশিয়ার জনগণ জারের কবল থেকে মুক্তি পেয়েছে। গান বাজনা প্রবন্ধ পাঠের পর রুশ  বিপ্লব সম্বন্ধে আলোচনা হয় এবং লাল ফৌজের দেশপ্রেম নিয়ে নজরুল খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। এবং ঠিক মনে নেই, সে গোপনে আমাদের একটি পত্রিকা দেখায়। ঐ পত্রিকাতে আমরাও বিশদভাবে সংবাদটি দেখে উল্লসিত হয়ে উঠি। সেদিন সারা রাতই প্রায় হৈ হুল্লোড়ে আমাদের কেটে গিয়েছিল। ” 

পল্টন-জীবনে প্রথম কবিতা প্রকাশ

মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ রচিত ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা’ থেকে জানা যায়, ৪৯ নম্বর বেঙ্গলি রেজিমেন্টের কয়েকজন সৈনিক ১৯১৮ সালের এপ্রিল মে মাস থেকেই ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ র গ্রাহক হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই পত্রিকা অফিসে চিঠিপত্র লিখতেন। এই পত্রলেখকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি সেনানিবাসে বসেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় গল্প-কবিতা ইত্যাদি পাঠাতেন। এভাবে চিঠিপত্রের মাধ্যমে ১৯১৮ সালে নজরুল ইসলামের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের। ১৯১৯ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে  ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ য় প্রথম  নজরুল ইসলামের ‘মুক্তি’ নামের কবিতাটি ছাপা হয়। এই কবিতাটি ছাপা হওয়ার পর নজরুল খুশি হয়ে পত্রিকার সম্পাদককে একটি চিঠি লিখেছিলেন।

 সেনাবাহিনীতে থাকাকালীনই রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব এবং লাল ফৌজের সাফল্যের প্রভাবে নজরুলের দেশপ্রেম এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয়তাবাদী চেতনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আন্তর্জাতিকতাবাদী চেতনা। তিনি আকৃষ্ট হয়েছিলেন সাম্যবাদী মতাদর্শ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি। বাহিনীতে থাকার সময়েই তিনি যে ‘হেনা ‘ ‘ব্যথার দান’ শীর্ষক  দুটি ছোটো গল্প পাঠিয়েছিলেন ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ য়, সেই গল্প দুটি এই চেতনারী সাক্ষ্য বহন করে। ‘হেনা’ গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৩২৬ সালের কার্তিক সংখ্যায় (অক্টোবর, ১৯১৯) এবং ‘ব্যথার দান’ গল্পটি এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ১৩২৬ সালের মাঘ সংখ্যায় (জানুয়ারি, ১৯২০)। নজরুলের প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘মুক্তি’ ও দুটি গল্প ‘হেনা’ ‘ব্যথার দান’ পড়ে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের অন্তরে যে অনুভবের সঞ্চার হয়েছিল তা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। তিনি তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা’ য় লিখেছেন:

“আমি কবি বা সাহিত্যিক নই। কাব্য বা সাহিত্যের আমি যে একজন সমঝ্‌দার সে-কথাও জোর গলায় প্রচার করার অধিকার আমার নেই। তবুও নজরুল ইস্‌লামের এই প্রথম কবিতাটির (‘মুক্তি’) পাণ্ডুলিপি হাতে পেয়ে আমি অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলেম। সমালোচক ও সমঝ্‌দাররা এই কবিতাটির তারিফ করেননি। কেউ কেউ বলেছেন কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের অনুকরণ। যিনি যা কিছু বলুন না কেন, আমি কিন্তু নজরুল ইসলামের এই কবিতাটিতে তাঁর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেম। তার এই কবিতা এবং ‘হেনা ‘ ও ‘ব্যথার দান’ প্রভৃতি ছোটগল্প পড়ে আমার মনে হয়েছিল যে বঙ্গ সাহিত্যে একজন শক্তিশালী কবি ও সাহিত্যিকের উদ্ভব হতে যাচ্ছে।” 

প্রসঙ্গত, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ য় নজরুল যে ‘ব্যথার দান’ গল্পটি পাঠিয়েছিলেন সেখানে ‘লালফৌজ’ নামে একটি শব্দ ছিল। গল্পটি ছাপানোর সময়ে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ ‘লালফৌজ’ শব্দটির পরিবর্তে ‘মুক্তিসেবক সৈন্যদের দল’ শব্দ বসিয়ে দেন। ব্রিটিশ শাসকের রোষানলে যাতে পড়তে নাহয় সেজন্যই নজরুলকে না জানিয়েই তিনি এই পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। কারণ তখন ব্রিটিশ ভারতে ‘লালফৌজ’ কথাটি উচ্চারণ করাও দোষের ছিল। এজন্য নজরুল করাচি থেকেই ধন্যবাদ জানিয়ে ছিলেন। পরে যখন মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে তখনও জানিয়েছেন, তাঁর সেই শব্দের পরিবর্তনে তিনি খুশি হয়েছিলেন। 

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, নজরুলের বেঙ্গলি রেজিমেন্টে যোগদান নিছক কোনো তাৎক্ষণিক ভাবনা বা কৌতূহল নিবৃত্তির বিষয় ছিল না। এ প্রসঙ্গে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ তাঁর লেখা নজরুল স্মৃতিগ্রন্থে লিখেছেন: 

“বেঙ্গলী ডবল কোম্পানিতে যোগদান করার যে-ডাক নজরুল ইস্‌লামের কানে পৌঁছেছিল সেটা ছিল তার নিকটে দেশপ্রেমের আহ্বান। তা না হলে মেট্রিকুলেসন ক্লাসের প্রথম ছাত্র সে, সকলে মনে করেছে পরীক্ষা দিয়ে সে জলপানি পাবে, — সে কি কারণে সব ছেড়ে দিয়ে পৌঁছে চলে গেল?

“আমি নজরুল ইস্‌লামের নিকটে জানতে চাইলাম সে রাজনীতিতে যোগ দেবে কিনা। জওয়াবে নজরুল বললেন, ‘তাই যদি না দেব তবে পৌঁছে গিয়েছিলাম কিসের জন্যে’।” 

মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ

৪৯ নম্বর বেঙ্গলি রেজিমেন্ট ভেঙে যাওয়ার অল্প কিছুদিন আগে (১৯২০) নজরুল সাত দিনের ছুটি পেয়েছিলেন। এই সাত দিনের ছুটির মধ্যে নজরুল ইসলামের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয় মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের। তাঁকে ৩২, কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর বন্ধু, পরবর্তীকালের বিশিষ্ট সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। সেদিনই এই দু’জনের সঙ্গে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের প্রথম পরিচয়। সেদিনের সেই সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ লিখেছেন:

“কাজী নজরুল ইসলামকে সেদিন আমি প্রথম দেখলাম। সে তখন একুশ বছরের যৌবনদীপ্ত যুবক। সুগঠিত তার দেহ আর অপরিমেয় তার স্বাস্থ্য। কথায় কথায় তার প্রাণ খোলা হাসি। তাকে দেখলে, তার সঙ্গে কথা বললে যে কোন লোক তার প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে পারত না। আমার সঙ্গে তার অনেক কথা হলো। যে-সব কথা আগে চিঠি-পত্রের মারফত হয়েছে, সে-সব কথা আবারও হলো। তাকে আমি কলকাতায় এসে থাকতে বললাম। সাহিত্য সমিতির ঘরগুলি তাকে দেখিয়ে দিলাম। বললাম, এখানেই তার থাকার জায়গা হবে । ঊনপঞ্চাশ নম্বর বেঙ্গলি রেজিমেন্ট তখন ভাঙনের মুখে।…আমি নজরুল ইসলামকে বলে দিলাম রেলওয়ে স্টেশন হতে সে যেন সোজা সাহিত্য সমিতির অফিসে চলে আসে। তাতেই সম্মতি জানিয়ে সেদিন সে চলে গেল। ” (‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা’) 

কলকাতায় মুজফ্‌ফর-সান্নিধ্যে

১৯২০ সালের মার্চ মাসে সেনাবাহিনী থেকে ফিরে কলকাতায় নজরুল মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের কাছে ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে এসে উঠলেন। তখন তার মধ্যে ছিল প্রবল স্বদেশ প্রেম ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয়তাবাদী মনোভাব। এরই পাশাপাশি ছিল আন্তর্জাতিকতাবাদী চেতনা এবং বলশেভিক বিপ্লব, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সাম্যবাদী মতাদর্শের প্রতি সুতীব্র  আকর্ষণ। 

মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ লিখেছেন: ” ফৌজ হতে তরুণ সৈনিকেরা প্রায়ই উদ্দাম স্বভাব নিয়ে ফিরে আসে,কিন্তু নজরুল ইসলাম ফিরে ছিল দেশপ্রেমে ভরপুর হয়ে। ” (প্রাগুক্ত) 

এখানে এসে সাংবাদিকতার কাজে প্রবেশের মধ্য দিয়েই নজরুলের রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত। এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের সহযোগী। তিনি লিখেছেন :“১৯২০ সাল হতে খবরের কাগজ চালানোর ভিতর দিয়েই নজরুল ইসলাম আর আমি রাজনীতি করেছি। ” ( সূত্র : আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’)। উল্লেখ্য, অবিভক্ত বাংলায় মুজফ্‌ফর আহ্‌মদকে কেন্দ্র করেই প্রথম কমিউনিস্ট গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল কলকাতায়। তিনিই ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম কমিউনিস্ট এবং অবিভক্ত বাংলায় কমিউনিস্ট আন্দোলনের পথিকৃৎ। ১৯২১ সালে তিনি কমিউনিস্ট মতাদর্শ গ্রহণ করেন এবং কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কাজী নজরুল ইসলাম মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের এই প্রাথমিক প্রয়াসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ লিখেছেন:” ১৯২১ সালের নভেম্বর মাসে নজরুল আর আমি ঠিক করি যে আমরা কমিউনিস্ট পার্টি করার কাজে এগিয়ে যাব। পড়াশুনা করব বলে সামান্য কিছু পুঁথি-পুস্তকও কিনেছিলেম।”( সূত্র : ওই)

পত্রিকা প্রকাশ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড 

১৯২০ সালের ১২ জুলাই মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ ও কাজী নজরুল ইসলামের যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সান্ধ্য দৈনিক পত্রিকা ‘নবযুগ’। এই পত্রিকার মাধ্যমে উভয়েরই সাংবাদিকতার সূচনা। পত্রিকার মালিক ছিলেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ একে ফজলুল হক। এই পত্রিকায় মজুর এবং কৃষকদের কথা নিজেদের অভিজ্ঞতায় তুলে ধরতেন মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ এবং নজরুল ইসলাম। এই পত্রিকায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রবল আক্রমণাত্মক লেখা প্রকাশিত হয়েছিল।  সম্পাদকীয় স্তম্ভেও অনেক জ্বালাময়ী ও আবেগপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন নজরুল । ‘নবযুগ’ পত্রিকায় এই ধরনের লেখার জন্য জামিনের একহাজার টাকা বাজেয়াপ্ত করে ব্রিটিশ সরকার। ফলে ১৯২১ সালের জানুয়ারি মাসে ‘ নবযুগ’  পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়।  

‘নবযুগ’ পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলেও মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ এবং নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক কার্যকলাপ চলতে থাকে। ১৯২০ সালে তাসখন্দে প্রতিষ্ঠিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মানবেন্দ্রনাথ রায়ের প্রতিনিধি হিসেবে নলিনী গুপ্ত ১৯২১ সালের ২৩ ডিসেম্বর কলকাতায় আসেন। তিনি অনুশীলন ও যুগান্তর দলের বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। এই সময়ে তিনি গোপনে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ ও নজরুল ইসলামের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করে দীর্ঘ আলোচনা করেন।  

১৯২১  সালটি নজরুল-জীবনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তখন তিনি থাকতেন মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের সঙ্গে ৩/৪ সি,তালতলা লেনের বাড়িতে। এখানেই তিনি ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে রচনা করেন তাঁর অনবদ্য কবিতা ‘বিদ্রোহী’। এই কবিতার প্রথম শ্রোতা ছিলেন মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ। কবিতাটি জনমানসে এতটাই আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল যে, বিমুগ্ধ পাঠকেরা তাঁর নামের আগে তাঁরই রচিত কবিতার নাম সংযোজন করে তাঁকে মহিমান্বিত করেছিলেন‘ বিদ্রোহী কবি ‘ হিসেবে। এই কবিতায় প্রতিধ্বনিত হয়েছিল তাঁর অন্তরের গভীরে পুঞ্জিভূত  বিদ্রোহ ও বিপ্লবের স্পর্ধিত উচ্চারণ:

“বল বীর–
বল উন্নত মম শির, 
শির ‘নেহারি’ আমারি, নত-শির ওই
শিখর হিমাদ্রীর!”…

নজরুলের সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক জীবনে আরো একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ‘ধূমকেতু’  পত্রিকা প্রকাশ। ১৯২২ সালের (১৩২৯ বঙ্গাব্দ) ১২ আগস্ট এই সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। সম্পাদক হিসাবে নজরুল  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে বাণী প্রার্থনা করেন। রবীন্দ্রনাথ  এই পত্রিকার দিক্‌ চিহ্নিত করে ১৩২৯ সালের ২৪ শ্রাবণ লেখেন : 

কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু-

“আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, 
দুর্দ্দিনের এই দুর্গশিরে 
উড়িয়ে দে তোর বিজয়কেতন !”…

এই ‘ধূমকেতু’-তে একের পর এক লেখায় নজরুল জনমানুষকে উদ্‌বেলিত করেছিলেন, এমনকী বিপ্লবীদের প্রাণেও দোলা দিয়েছিলেন। ১৯২২ সালের ১৩ অক্টোবর এই ধুমকেতু পত্রিকার পাতায় বিদ্রোহী কবি দৃঢ়তার সঙ্গেই ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তুলেছিলেন। এই পত্রিকা কলকাতা মহানগরীকে যেন কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এই পত্রিকার অক্টোবর সংখ্যায় নজরুলের লেখা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ এবং লীলা মিত্রের‘ বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ’ রচনা দু’টি ব্রিটিশ সরকারকে প্রচণ্ড রুষ্ট করে তোলে। পত্রিকা অফিসে পুলিশ চড়াও হয়ে ছাপানো সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করে এবং নজরুলের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে । নজরুল আত্মগোপনে যাবার কিছুদিন পর ১৯২২ এর ২৩ নভেম্বর কুমিল্লা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় । রাজদ্রোহের অপরাধে সশ্রম কারাদণ্ড হয় তাঁর। নজরুলকে প্রথমে প্রেসিডেন্সি, তারপর আলিপুর জেল হয়ে নিয়ে যাওয়া হয় হুগলি জেলে। এখানে নানান অব্যবস্থা এবং বিচারাধীন বন্দিদের প্রতি জেল কর্তৃপক্ষের অমানবিক আচরণের প্রতিবাদে নজরুল রাজনৈতিক সহবন্দিদের নিয়ে অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। এভাবে দীর্ঘদিন অনশন চলার পথ উদ্‌ বিগ্ন রবীন্দ্রনাথ শিলং থেকে হুগলি গেলে নজরুলের উদ্দেশে তারবার্তা পাঠান-

“অনশন ত্যাগ করো, আমাদের সাহিত্য তোমায় দাবি করে (Give up hunger strike, our literature claims you)।” জেল কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবেই নজরুলের হাতে সেই টেলিগ্রামটি পৌঁছে দেয়নি। ৩৯ দিন অনশনের পর কুমিল্লা থেকে বিরজাসুন্দরী দেবী( নজরুল যাঁকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করতেন) এসে কবির অনশন ভাঙান। ১৯২৩ এর ১৫ ডিসেম্বর তিনি কারা জীবন থেকে মুক্তি পান। 

‘ধূমকেতু’ র পর নজরুলের সাংবাদিক- জীবনে ‘লাঙল’ পত্রিকা প্রকাশ একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯২৫ সালের ১ নভেম্বর কংগ্রেসের মধ্যে থাকা তরুণ প্রগতিশীল দের নিয়ে গড়ে ওঠে ‘লেবার স্বরাজ পার্টি ‘ বা ‘শ্রমিক প্রজা স্বরাজ পার্টি ‘। প্রথমে এই দলের ইংরেজি নাম ছিল ‘দ্য লেবার-স্বরাজ পার্টি অফ দি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস’ বাংলায় ‘ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত শ্রমিক-প্রজা স্বরাজ দল’। এই দলে অন্যান্যদের সঙ্গে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদও জেল থেকে ছাড়া পাবার পর যুক্ত হয়েছিলেন। এই দলের ইশতেহার লিখেছিলেন নজরুল ইসলাম। এই দল গঠিত হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আর সপ্তাহিক মুখপত্র হিসেবে ‘লাঙল’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত (২৫ ডিসেম্বর, ১৯২৫) হয়। এই পত্রিকার প্রধান পরিচালক হিসেবে নজরুল ইসলাম এবং সম্পাদক হিসেবে মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়(নজরুলের বাঙালি পল্টনের বন্ধু)-এর নাম ছাপা হতো। এই পত্রিকার জন্যও নজরুলকে আশীর্বাণী পাঠান রবীন্দ্রনাথ। তিনি লিখে দেন: 

“জাগো জাগো জাগো বলরাম, ধরো, তব মরু-ভাঙা হল,
প্রাণ দাও,শক্তি দাও,স্তব্ধ করো ব্যর্থ কোলাহল। “

‘লাঙল’-এর প্রথম সংখ্যাতেই নজরুল লেখেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘সাম্যবাদী’। ‘ঈশ্বর’, ‘মানুষ’, ‘পাপ’,’ বারাঙ্গনা ‘ ‘নারী’ ‘কুলি-মজুর’ উপশিরোনামে বিভক্ত এই দীর্ঘ কবিতায় বিভিন্ন ধর্ম, সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে মৈত্রী ও সাম্যের কথা, মানুষের মধ্যেই ঈশ্বর সন্ধান করা, সমাজের নিপীড়িত, বঞ্চিত বিশেষ করে সমাজে নারীদের অসামান্য ভূমিকা ও মর্যাদার কথা সোচ্চারে ধ্বনিত করেছেন বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম। ‘লাঙল’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা থেকে প্রতিটি সংখ্যাতেই সম্পাদকীয় নিজেই লিখতেন নজরুল। মুজফ্‌ফর আহ্‌মদও এই পত্রিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন এবং সময়োপযোগী অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন। 

আর্থিক সমস্যা ও ১৯২৬ এর এপ্রিলে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গার জন্য ‘লাঙল’ পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বঙ্গীয় কৃষক শ্রমিক দলের মুখপত্র হিসেবে ১৯২৬ সালের ১২ আগস্ট প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘গণবাণী’। এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ। নজরুল ইসলাম ছিলেন এই পত্রিকার নিয়মিত লেখক। পত্রিকার ২৬শে আগস্ট (১৯২৬) সংখ্যায় সেই সময়ের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ বক্তব্য প্রকাশ করেন তাঁর  বিখ্যাত ‘মন্দির ও মসজিদ’ প্রবন্ধে। এছাড়াও এখানে ‘হিন্দু ও মুসলমান’ শীর্ষক  আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধও লেখেন। মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের অনুরোধে নজরুল ‘অন্তর-ন্যাশনাল’ নাম দিয়ে বিখ্যাত ‘ইন্টারন্যাশনাল’ সংগীতের অনুবাদ করেন, যা প্রকাশিত হয় ‘গণবাণী’র ১৯২৭ সালের ২৯ এপ্রিল সংখ্যায়। এ ছাড়াও নজরুলের লেখা ‘রক্ত পতাকার গান’, ‘জাগর তূর্য ‘, ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’, ‘ছাত্রদলের গান’ ইত্যাদি তাঁর বিখ্যাত রচনা বিভিন্ন সময়ে এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। যতদূর জানা যায়, ১৯২৮ সালের ১৩ অক্টোবরের পর সম্ভবত ‘গণবাণী’ র আর কোনো সংখ্যা প্রকাশিত হয়নি। বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ‘নবযুগ’, ‘ধূমকেতু’, ‘লাঙল’ এবং‘গণবাণী’ পত্রিকায় নজরুলের সাংবাদিকতা, জ্বালাময়ী নিবন্ধ-সম্পাদকীয় ইত্যাদি যেমন বাংলা সংবাদপত্র জগৎকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছে, তেমনি গণ-জাগরণ ও বিপ্লবের বাণী প্রচারে এবং শ্রমজীবী মানুষকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে তাঁর সাংবাদিক ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। 

১৯২৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে কুষ্টিয়ায় এক কৃষক সম্মেলনে হেমন্ত কুমার সরকারের আহ্বানে যোগ দিয়েছিলেন মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ, আব্দুল হালিম, ফিলিপ স্প্রাট প্রমুখ। নজরুল ইসলামও সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন। এই কৃষক সম্মেলনেই মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ এবং নজরুল ইসলাম শেষবার একসঙ্গে রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন। এই সম্মেলন থেকে ফেরার পর ২০ মার্চ(১৯২৯) ‘মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা’য়  আরো অনেকের সাথে গ্রেফতার হন মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ। তিনি ছাড়া পান ১৯৩৬ সালে। সময়ে বাংলা প্রদেশে কমিউনিস্টদের তৎপরতা সহ শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনও কিছুদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। নজরুল ইসলামও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। সাংবাদিকতার এক দীর্ঘ পর্বেরও পরিসমাপ্তি ঘটে। তিনি তখন সম্পূর্ণরূপে মনোনিবেশ করেন কাব্য ও সংগীত জগতে। 

এরপর দীর্ঘদিন বিরতির পর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এ কে ফজলুল হক আগের সেই ‘নবযুগ’  পত্রিকার তীব্র রাজনৈতিক প্রভাবের কথা স্মরণ করে নবপর্যায়ে দৈনিক হিসাবে ‘নবযুগ’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। অনেক অনুরোধের পর মূলত আর্থিক সংকটের জন্য নজরুল ইসলাম  প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব নিতে সম্মত হন। তবে তখন তাঁর লেখনীর ধারও অনেকটাই কমে এসেছিল। তবুও তিনি এই পত্রিকায় ‘পাকিস্তান না ফাঁকিস্তান’, ‘আজ কি চাই’, ‘আমার সুন্দর’, ‘লক্ষ্যভ্রষ্ট’ ইত্যাদি শিরোনাম দিয়ে কিছু সম্পাদকীয় রচনা করেছিলেন। এছাড়াও সময়ে এই নবপর্যায়ের ‘নবযুগ’-এ কবিতায় সম্পাদকীয় লিখে তাঁর অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তারপর একটা সময়ে এটা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এক রকম বিরক্ত হয়েই নজরুল এই পত্রিকার দায়িত্ব ছেড়ে দেন। এভাবেই তাঁর সাংবাদিক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। তবে তখন তাঁর সাংবাদিক জীবন শুধু নয়, ধীরে ধীরে সৃষ্টি ক্ষমতার প্রবাহও স্থিমিত হয়ে আসছিল। তিনি ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন। এমনই একটি অবস্থায় ১৯৪২ এর ৯ জুলাই মাত্র ৪৩ বছর বয়সে আকাশবাণীতে এক অনুষ্ঠানে অংশ নেবার সময়ে তিনি আকস্মিকভাবে অসুস্থ হন এবং বাক্‌রুদ্ধ হয়ে পড়েন। তারপর দীর্ঘ জীবন কাটান সংবিৎহারা হয়ে। যা ছিল বাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, সামগ্রিকভাবে সৃষ্টির জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি ।

অনন্য বৈশিষ্ট্য 

আগেই উল্লেখিত হয়েছে, বিদ্রোহী  কবি কাজী নজরুল ইসলাম শৈশবের প্রবল  দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতা, লেটোর দলে যোগ দিয়ে গ্রাম-প্রত্যন্তে ঘুরে বেড়ানো, কৈশোরে উপার্জনের লক্ষ্যে কঠিন-কঠোর জীবন-সংগ্রাম, তার মধ্যেই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, বিপ্লবীবাদীদের সঙ্গে সংস্রব, যৌবনের উদ্দীপনায় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় সেনাবাহিনীতে অংশগ্রহণ ইত্যাদি বিচিত্র-ব্যতিক্রমী জীবনপ্রবাহ থেকে অফুরন্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। যে অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল দেশকে পরাধীনতার কবল থেকে মুক্ত করা এবং বিদ্রোহ-বিপ্লব ও তীব্র প্রতিবাদের বাসনা। তারই প্রবহমানতায় তিনি প্রবেশ করেছিলেন রাজনীতির বৃহত্তর অঙ্গনে। তিনি প্রাণিত হয়েছিলেন সাম্যবাদী আদর্শে। যার প্রতিফলন ও অনুরণন লক্ষ করা যায় তাঁর কাব্য-সাহিত্যে, সৃষ্টির অফুরান ভাণ্ডারে। ব্যক্তি জীবনে নজরুল অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা, প্রতিকূলতা সামলেছেন, প্রবল আর্থিক সংকটে দীর্ণ হয়েছেন, অতি স্নেহের পুত্র বুলবুলকে অকালে হারিয়ে শোকে বিহ্বল হয়েছেন, স্ত্রী প্রমীলার কঠিন অসুখ সারাতে কিছুটা দিশাহীন হয়ে পড়েছেন, তবুও শারীরিক ও মানসিকভাবে যতদিন তিনি সচল ও সজীব ছিলেন, ততদিন সাম্যবাদী আদর্শকে, নিপীড়িত, শোষিত, বঞ্চিত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে, উগ্র ধর্মীয় গোড়ামির প্রাচীর ভাঙতে তীব্র প্রতিরোধের স্পৃহা তাঁর অন্তরে লালন করেছেন। বিদ্রোহের কবি,চেতনার কবি নজরুলের জীবনের এই অনন্যসাধারণ বৈশিষ্ট্য স্ফুলিঙ্গ-সঞ্চারিত প্রেরণা হয়ে থাকবে অনন্তকাল।

তথ্যসূত্র :

* কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা, মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, কলকাতা-৭৩; 
* আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, কলকাতা-৭৩;
* জনগণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কল্পতরু সেনগুপ্ত, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ, কলকাতা;
* নজরুল জীবনী, অরুণ কুমার বসু, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাডেমি, কলকাতা;
* রাজনীতির নজরুল, সম্পাদনা- অরুণাভ ঘোষ, প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, কলকাতা-৭৩; 
* নজরুল জীবন কথা, মোরশেদ শফিউল হাসান, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা-১২১৫;
* সৈনিক নজরুল, মুহাম্মদ লুৎফুল হক, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা-১২১৫;

লেখক:
Sandeep Dey
সন্দীপ দে, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক; কলকাতা

*প্রকাশিত লেখার বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট