ফিলিস্তিনের একগুচ্ছ কবিতা

Comments

অনুকরণ

কন্যা আমার
মাকড়শাটার কোন ক্ষতি করতে চায় না
যেটা বাসা বেঁধেছে
ওর বাইসাইকেলের হ্যান্ডেলের মাঝে
প্রায় দু’সপ্তাহ সে
অপেক্ষা করেছে
যতদিন না ওটা নিজে নিজে চলে যায়
বললাম তুমি যদি জালটা ভেঙ্গে দিতে
ওটা বুঝে যেত
ওখানে ওর বাসা বানাবার কথা নয়
আর তুমিও সাইকেল চালাতে পারতে
ও বলল, এভাবেই তো সবাই
রিফিউজি হয়ে ওঠে, তাই না?

মূল শিরোনাম: Mimesis
কবি: ফাদি জৌদাহ

কাকতাড়ুয়া

ধানক্ষেতের পাখিরা কাকতাড়ুয়া দেখে বোকা বনে না,
তারা জানে তারা কী ভালোবাসে, শস্যের দুধ।

ঘটনা ঘনিয়ে এলে, কাউকে খোঁজারই সময় হবে না,
স্বামী, সন্তান কিংবা নয় ভাইবোনের কাউকেই না।

প্লাস্টিকের বালতি পেটানোর আখের টুকরো ছুঁড়ে ফেলে,
পাখি তাড়ানোর চিৎকার থামিয়ে তুমি ছুটবে।

তারা তোমাকে ট্রাকে তুলে শত মাইল দূরে নিয়ে যাবে,
বৃদ্ধরা শেখাবে চেকপয়েন্টের সৈনিকদের সাথে লেনদেন।

তুমি তোমার চামচ, কম্বল আর মটরশুটি দিয়ে দেবে,
বিনিময়ে তারা জানটা রাখতে দেবে। আর যদি ট্রাক থেকে লাফ দাও,

পেছন থেকে ছুটে এসে সামরিক যান পিষে যাবে তোমাকে।
পরে, তোমাকেই অভিযুক্ত করবে ভিটা ছেড়ে চলে গিয়েছিলে বলে।

এরপর, তুমি ত্রাণগ্রহণের সারিতে দাঁড়াবে অথচ যথেষ্ট খাবার পাবে না।
তোমার মা আটার বস্তা কেটে বুনে দেবে নতুন অন্তর্বাস।

এরপর তারা তোমাকে দেবে প্লাস্টিকের তাবু, রান্নার তৈজস,
টিকার বই, সাদা বড়ি আর উলের কম্বল।

তবু তুমি তোমার শান্ত মেজাজ ধরে রাখবে।
চোখ দু’টো এমনভাবে বুজে থাকবে যেন চোখে সাবান ঢুকেছে।

হাতদু’টো এমনভাবে ছড়িয়ে দাঁড়াবে যেন তুমি বৃষ্টির জল ছুঁতে চাইছ।

মূল শিরোনাম: Scarecrow
কবি: ফাদি জৌদাহ

তোমাদের শিল্পের ফাঁকাবুলি পুছি না, আমার স্বজনেরা মরছে

দখলদারেরা ফুলের কথা লেখে।
আমি তোমাকে বলি ইসরায়েলি ট্যাঙ্কের দিকে পাথর ছুঁড়ে মারা শিশুদের কথা
কয়েক সেকেন্ডের মাঝে বুনোফুলে পরিণত হয়ে ওঠার আগে।
আমি সেই কবিদের মতো হতে চাই যারা চাঁদের কথা ভাবে।
ফিলিস্তিনিরা বন্দিশালা আর জেলখানা থেকে চাঁদ দেখে না।
কতই না সুন্দর, ঐ চাঁদ।
কী অদ্ভুত সুন্দর, ফুলগুলো সব।
আমি আমার মৃত বাবার জন্য ফুল তুলে আনি, যখন কষ্ট লাগে।
তিনি সারাদিন কেবল আল জাজিরা দ্যাখেন।
ইশ, জেসিকা যদি আমাকে রমজানের শুভেচ্ছা জানিয়ে টেক্সট করা বন্ধ করত।
আমি জানি আমি আমেরিকান, কারণ আমি যখন কোনো ঘরে ঢুকি
কিছু একটা মরে যায়।
মৃত্যু বিষয়ক রূপকল্প সেইসব কবিদের জন্য, যারা মনে করে
বিদেহীরা শব্দের পরোয়া করে।
যখন আমি মারা যাব, কথা দিচ্ছি তোমাদের অনন্তকাল তাড়া করে ফিরব।
একদিন, আমি ফুলের কথা লিখব এমনভাবে যেন ফুলগুলো আমাদেরই ছিল।

মূল শিরোনাম: Fuck Your Lecture on Craft, My People Are Dying
কবি: নূর হিন্দি

এর চেয়ে ভালো কোন মৃত্যু আমাদের প্রাপ্য 

এর চেয়ে ভালো কোন মৃত্যু আমাদের প্রাপ্য
শরীরগুলো আমাদের দোমড়ানো মোচড়ানো
বুলেট আর বিস্ফোরকের কণার নকশাদার সেলাইয়ে সাজানো
আমাদের নামগুলো ভুল উচ্চারনে ধ্বনিত হয়
বেতারে টিভিতে
ভবনগুলোর দেয়ালে পলেস্তারায় আমাদের ছবি
ফ্যাকাশে হয়ে ম্লান হয়ে আসে
আমাদের কবরের খোদাই করা পরিচয় মুছে যায়
ঢাকা পড়ে পাখি ও সরীসৃপের মলে
যে গাছগুলি আমাদের সমাধিতে ছায়া দেয়
সেগুলোতে পানি দেওয়ার কেউ নেই
জ্বলন্ত সূর্য গ্রাস করে ফেলছে .
আমাদের ক্রমশ পচে যাওয়া দেহ।

মূল শিরোনাম: We Deserve a Better Death
কবি: মোসাব আবু তোহা

কোন এক তারানেভা রাতে

কোন এক তারানেভা রাতে,
বিছানায় আমি এপাশ ওপাশ করি।
দুনিয়া কেঁপে ওঠে হঠাৎ আর
বিছানা থেকে ছিটকে পড়ে যাই।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই।
পাশের বাড়িটা আর দাঁড়িয়ে নেই।
জমিনের মেঝেতে পুরনো গালিচা হয়ে
পড়ে আছে।
ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে থেঁতলে গ্যাছে, পুরু চপ্পল
উড়ে গ্যাছে বিচ্ছিন্ন পায়ের পাতা থেকে।
জানা ছিল না
আমার পড়শির ছোট্ট টিভিটা তখনো ছিল,
সেই পুরনো ছবিটা তখনো দেয়ালে ঝুলত,
আর বেড়ালটা কতগুলো বাচ্চা দিয়েছিল।

মূল শিরোনাম: On a Starless Night
কবি: মোসাব আবু তোহা

আমার মুখের দেয়ালে বিপ্লব

স্বপ্নে,
অচেনা আঙ্গুলগুলো আমার দাঁত উপড়ে ফেলতে চাইছিল,
একসময় শুনলাম, তাদের পড়ে যাওয়ার শব্দ,
একটা একটা করে দাঁত।

আরবের প্রাচীন প্রবাদ বলে
স্বপ্নে দাঁত পড়ে যাওয়া মৃত্যুর আলামত:
যদি শুধু সামনের দাঁত পড়ে,
তবে কথা বলার ক্ষমতা হারাবে,
যদি সবগুলো পড়ে, তবে আপনজনদের মৃত্যু হবে,
শুধু তুমি পড়ে রইবে একা।

আমি জেগে উঠে দেখলাম, আমার মুখটা একটা গুহা,
চিৎকার করলাম, কিন্তু সে চিৎকারকে গিলে ফেলল অসীম শূন্যতা,
আমি কথা বললাম, কিন্তু সে কথা পাথরের মাঝে হারিয়ে গেল,
আমি নিজেকে বললাম, কিচ্ছু যায় আসে না,
আমি শূন্য মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়াবো,
কিন্তু হৃদয় থাকবে পূর্ণ।

ঘর ছাড়লাম, নিজের নামটা দেখব বলে,
যেটা ডুবছে আর সাহায্য চেয়ে ডাকছে।
আমি তাকে আমার হাত বাড়িয়ে দিলাম, কিন্তু বাতাস ধমকে উঠল:
“নতুন সময় নতুন নাম চায়,
যেখানে প্রতিটি বইয়ের পৃষ্ঠা সাদা,
আর আমাদের নদীগুলো ভাবনার রঙে রঙিন।”
বিপ্লব হলো এক বিশাল জুতো,
এদিকে আমাদের পা যে খুব ছোট।

আমার স্বজনেরা চিত হয়ে ভাসছে,
হাত নেড়ে নেড়ে ভেসে যাচ্ছে বিস্মৃতির স্রোতে।

আমার বাবার অনুপস্থিতি খুঁটি থেকে ঝুলছে,
তাঁর সোনালি দাঁতে এসে ইতিহাস লীন হয়ে গেছে,
হাসছেন, যেন জীবন এক কৌতুক।
আমাদের হাসি ঝরে যায়, হাসিঠাট্টা বাসি হয়ে ওঠে,
আর আমি শোকগাঁথা লিখতে শুরু করি,
কিন্তু সাজানো কথাগুলো লাফিয়ে
ভয়ের নৌকায় চেপে বসে,
তাকে অন্ধ মুরগিছানার মত অনুসরণ করে সেগুলোর অর্থ।

আমি একটি কথা বলতে চাইছিলাম,
না, আসলে অর্ধেক কথা: ইশ যদি…
ইশ, যদি বাবা বেঁচে থাকতেন।
কিন্তু আমার বাবা তাঁর মরণের পরেও মরেই যেতে থাকেন।

আমি নদীর পাড়ে একটা গাছ হয়ে গেলাম,
আমার শেকড় কাটা, আমার স্মৃতিরা নীল।
স্বপ্ন দেখলাম স্বপ্নগুলো আমার মুখ থেকে পড়ে গিয়ে
নদীর তলদেশে জমে জীবাশ্ম হয়ে গেছে।
প্রাচীন আরবেরা সব চলে গেছে,
আমার জন্য রেখে যায়নি,
ভাষা বা তার অর্থের কোনটাই।

পুরনো যুদ্ধগুলো বিদায় নিয়েছে,
যেগুলো কখনো ঘটেনি সেগুলোর মতই,
তাদের দাঁতও পড়ে গেছে,
এবং তাদের বলা হয়েছে:
তোমাদের জন্য এখানে নেই রুটি কিংবা রক্ত,
যার প্রথমটা খেয়ে ফেলা হয়েছে, দ্বিতীয়টা জমাট বেঁধে গেছে।

এই সেই জমিন যার আকাশকে উপরে তোলা হয়েছে,
যার পাহাড়কে উঁচু করা হয়েছে,
যার সন্তানেরা ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করেছে।
দ্যাখো,
নিজেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে সে
তার বুকের পরে তৈরি সব সেতু ধরে,
পাহাড়েরা উপুড় হয়ে পড়ে আছে,
সন্তানেরা তার ভেঙে পড়ছে, শোলার মত।

শুধু আমি রয়ে গেছি তীরে,
একটি গাছ থেকে কেটে ফেলা একটি গাছ।
অনেক প্রজন্ম পেরিয়ে গেছে আমাকে পাশ কাটিয়ে,
আমার মুখের দেয়ালে আঁকা ছবি ফুটে উঠেছে।

প্রাচীন একটি কথা স্মরণ করি,
আর সেটি উচ্চারণ করতে উদ্যত হই…
না… আমি তার এক-তৃতীয়াংশ উচ্চারণে উদ্যত হই।

হয়তো আমি কখনো সেটি উচ্চারণ করিনি,
হয়তো শুধু ভেবেছিলাম কথাটা।

পৃথিবী ফিরে থাকায়,
দানবীয় দেহগুলো উঠে দাঁড়াতে প্রস্তুত হয়,
আর আমার ভেজা নাম তার বিশাল মাথাটা তুলে ধরে।

হাজার হাজার বছর আগের,
সেই মুহূর্ত থেকে,
আমি দীর্ঘ এক ভাঙনের চাপা শব্দ শুনে আসছি,
আর শুনছি পৃথিবীর দাঁতগুলো পড়ে যাওয়ার আওয়াজ।

সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৪

মূল শিরোনাম: Revolution on the Walls of my Mouth
কবি: আসমা আজাইজেহ

আমরা কখনো থামি না

ফেরার মত কোনো দেশ নেই আমার
আবার নিষিদ্ধ হবো এমন কোন দেশও নেই:
এমন একটা গাছ যার শিকড়
হলো প্রবহমান নদী:
থমকে দাঁড়ালে সে মরে যায়,
আবার না থামলেও মরে যায়।

জীবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলো আমি কাটিয়েছি
মৃত্যুর গালে গাল রেখে তার বাহুডোরে,
প্রতিদিন আমি যে ভূমি হারিয়েছি
তা আবার নতুন করে ফিরে পেয়েছি দিনশেষে।
মানুষের এক্টুকরো দেশ ছিল শুধু
অথচ আমার হারিয়ে হারিয়ে বেড়েছে বহুগুণ,
আমার না থাকার কালে নতুন করে সেজেছে।
তার শিকড়, আমারই মতো, জল:
যদি থেমে যায় শুকিয়ে যাবে,
যদি থেমে যায় মরে যাবে।
আমরা দুজনই ছুটছি
সূর্যের আলোর নদী ধরে,
সোনার চূর্ণ বয়ে যাওয়া নদী
যা বয়ে আসছে প্রাচীন ক্ষত থেকে,
আমরা কখনো থামি না।
ছুটতে থাকি,
কখনো থেমে যাওয়ার কথা ভাবি না
যাতে আমাদের দুইজনের পথ এক হতে পারে।

নিষিদ্ধ হবো এমন কোন দেশ নেই আমার,
ফেরারও কোনো দেশ নেই:
মরে যাব যদি থেমে যাই,
মরে যাব যদি ছুটে চলি।

অক্টোবর ২৯, ২০২৪

মূল শিরোনাম: We Never Stop
কবি: নাজওয়ান দারবিশ

বাংলা অনুবাদক:
Ahsanul Karim
আহসানুল করিম
কবি ও অনুবাদক; যুক্তরাষ্ট্র

মূল লেখক পরিচিতি

ফাদি জৌদাহ

ফিলিস্তিনি আমেরিকান কবি, অনুবাদক ও চিকিৎসক। তিনি ১৯৭১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর কবিতায় প্রবাস, ফিলিস্তিন, যুদ্ধ, পরিচয় এবং মানবিক অভিজ্ঞতার গভীরতা ফুটে ওঠে। ফাদি জৌদাহ-র প্রথম কাব্যগ্রন্থ “The Earth in the Attic” (২০০৮) ইয়েল সিরিজ অফ ইয়াং পোয়েটস পুরস্কার অর্জন করে। এছাড়া তিনি ফিলিস্তিনের কবি মাহমুদ দরবিশের কবিতার ইংরেজি অনুবাদ করেছেন। তাঁর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে “Alchemy of Hours”, “Textu”, এবং “Tethered to Stars”।

নূর হিন্দি

ফিলিস্তিনি আমেরিকান কবি। প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ২০২২ সালে; নাম – হে খোদা, হে হাড়গোড়, হে হলুদ (Dear God. Dear Bones. Dear Yellow)। ফিলিস্তিনের স্বাধিকার নিয়ে সোচ্চার, সকল অত্যাচারিতের মুক্তি নিয়ে তিনি সোচ্চার। কবিতাটি ফিলিস্তিনি শিশু আর নরনারীদের জীবন নিয়ে লেখা।

মোসাব আবু তোহা

ফিলিস্তিনি কবি ও লেখক। গাজার মানুষ। ২০২৩ এর অক্টোবরে ইসরায়েলের বোমাহামলার হুমকিতে স্ত্রী ও সন্তানসহ ঘর ছেড়ে জাবালিয়া শরণার্থি শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ইসরায়েলি আগ্রাসনের মুখে গাজার মানুষের জীবনের কথা এই কবিতায় তিনি বলতে চেয়েছেন।

আসমা আজাইজেহ

ফিলিস্তিনি কবি, লেখক ও সাংস্কৃতিক কর্মী।

নাজওয়ান দারবিশ

ফিলিস্তিনি কবি, জেরুজালেম। তিনি আরবি ভাষায় নয়টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর কবিতা বিশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। নিউইয়র্ক রিভিউ বুকস, যেটি তাঁর ইংরেজি অনূদিত দুটি বই Nothing More to Lose এবং Exhausted on the Cross প্রকাশ করেছে, এবং তাঁকে এসময়ের “আরবি ভাষার অন্যতম প্রধান কবি” হিসেবে বর্ণনা করেছে।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট