মোহাম্মাদ নাকিবউদ্দীনের কবিতা

Comments

ভয়

ভয় যদি কর তুমি তুলির আঁচড়,
নিমেষেই ক্ষেপে গিয়ে বসাও কামড়-
দুর্বলতাটুকু হয় যে খবর,
ধৈর্য্য নাই নাই, আঁধার বিবর।

ভয় যদি কর তুমি গায়কের সুর,
বাঁশী কেড়ে দাও বাঁশ-ই, ঘুষি, অসুর-
দুর্বলতাটুকু হয় যে খবর,
ধৈর্য্য নাই নাই, আঁধার বিবর।

ভয় যদি কর তুমি রাজপথ কবি,
গুঁড়িয়ে শ্লোগান-গান, কান্নার ছবি-
দুর্বলতাটুকু হয় যে খবর,
ধৈর্য্য নাই নাই, আঁধার বিবর।

ভয় যদি কর তুমি পেন্সিল রেখা,
আক্রোশে থামিয়ে দাও, শিল্পীর আঁকা-
দুর্বলতাটুকু হয় যে খবর,
ধৈর্য্য নাই নাই, আঁধার বিবর।

ভয় যদি কর তুমি লেখক কলম,
পাঠাও পোষা পেশী, টিকটিকি, যম-
দুর্বলতাটুকু হয় যে খবর,

ভয় যদি কর তুমি প্রতিবাদী স্বর,
টুঁটিচেপে বল তারে, এই ব্যাটা মর-
দুর্বলতাটুকু হয় যে খবর,
ধৈর্য্য নাই নাই, আঁধার বিবর।

ভয় যদি কর তুমি সত্য-সংবাদ
সত্যডালায় তালা, ধূলায় বরবাদ-
দুর্বলতাটুকু হয় যে খবর,
ধৈর্য্য নাই নাই, আঁধার বিবর।

ভয় যদি কর তুমি, স্বাধীন মনন,
বিষবাষ্পে কর, চেতনা হনন-
দুর্বলতাটুকু হয় যে খবর,
ধৈর্য্য নাই নাই, আঁধার বিবর।

ভয় যদি কর তুমি যুবক কিশোর,
নিহত আহত অপমানে জর্জর,
জেনো, নিহত আহত তারা হয় যে অমর।
শোনো আওয়াজ ডানা মেলে মুক্ত ভ্রমর।
দুর্বলতাটুকু হয় যে খবর,
ধৈর্য্য নাই নাই, আঁধার বিবর।

মনে রেখো একদিন, তোমারও শুরু,
বজ্রকন্ঠে দীক্ষাগুরু,
নির্ভীক প্রতিবাদী চোখ-মুখ-ভুরু,
স্বাধীনতা-বীজ, পঞ্চাশে তরু।

ঠগ বাছতে কেন গাঁ উজার,
পাবে নাকো নিখাদ, মানুষ আবার।
পাবে শুধু মীরজাফর, লোভী, চাটুকার-
ইতিহাস নির্মম – শিক্ষা সবার।

গড় দেশ, অশেষ, নিশঙ্ক প্রহর,
কর খোলসবন্দী, আতঙ্ক-হাঙর।
দুর্বলতা যেন, হয় না খবর,
সফলতা নির্ভয়, অজর, আপামর।

লকডাউন

আমরা কি খামু?
নিত্যিদিনের নুন-পান্তা কুনখানে যে পামু!
শখের পান্তা, পান্তা ইলিশ,
দূরের খোয়াব বিনা বালিশ,
ফুটপাতেরই এক কোণাতে চাটাই বিছাই শুমু
মাটির মানুষ, কাদার ফানুস, আমরা কোথায় যামু?
তোমরা শুরু কর বছর,
শানকী ভরা পান্তা নহর,
শখের বশে নাইম্যা আস,
একটা দিনেই পাশে বস
বাদবাকী দিন মেঘের কোলে,
পঙ্খীরাজে হেইল্যা দুলে,
নাগরা পায়ে
আলো ছায়ে
দুনিয়া দাবাই
খোদার দোহাই
কার কাছে তয় যামু?
ভাবছো কি ভাই,
ভাই আমি তোর, কার কাছে আজ চামু

জলেও জ্বলে

কেমন আছো?
কেমন ছিলে?
দিন-দুনিয়ার
খালে বিলে।
অষ্টপ্রহর
কষ্ট কামড়
নিত্যদিনের
চলনবিলে।
সুখ-ফোয়ারা
দুখ-সাহারা
এক মুদ্রার
দু’পিঠ ঝুলে।
ছন্দে আশা
গন্ধে খাসা
ভালোবাসা
দুলকি চালে।
না-বলা কথা
অবলা ব্যথা
হৃদমাঝারে
দোলায়, দোলে।
অতীত হাওয়া
পতিত চাওয়া
ঈশান কোণে
পাষান গলে। 
ওই তো আলো
সেই তো ভালো
জলেও আগুন
জ্বালায়, জ্বলে।

মাৎস্যন্যায়

কত বর্গী এ’লো দেশে
হিন্দুকুশ পাদদেশে
ছিঁড়েকুঁড়ে অবশেষে
ছোবড়াটাও চিবানোর আশে।

মাঝেমধ্যে অবশ্য চলে কিছুদিন,
আপাত: বিরতির পালা:
ঝোলে মূলা,
মোড়লদের ডাংগুলি খেলা,
জোরসে করতালি, হল্লা,
জ্বলে তন্দুর-কাবাবের চুলা।।

কে জানে কতক্ষণ, কতদিনের এই হাফ টাইম,
কিংবা মূকাভিনয়, বোবা “মাইম?
ওপরে ওপরে শান্ত সাগর,
পানির নীচেই প্রস্তুতি সমর।

সতরঞ্জী বিছাতে বিছাতে
সতরঞ্জ কি খিলাড়ি,
আনাড়ি, কিম্বা জুয়ারী,
সবাই একটু দম নেয়,
হাত বুলিয়ে দেয় আমাদের মাথায়,
মুচকি হাসে, পরম মমতায়।

তারপর!
তারপর!
তারপর!
অকস্মাৎ ঘূর্ণিঝড়!

সতরঞ্জী সরে যায়,
আবালবৃদ্ধবনিতা তলায়, চোরাবালিতে ডুবে, হায়!
ভেসে যায়, অসহায়, কান্নায়।
মোড়ের মাস্তান আস্তিন গুটায়, ভণিতা সরায়,
শাণিত খঞ্জরে শোণিতের ক্ষুধা পায়।

কথার ফেনা তোলে কপচানো বুলি,
চোখে ছিটানো হয় মিথ্যের ধুলি,
অঙ্গুলি, হাতে, অমানিশার রংতুলি।

নতুন অধ্যায়, পাল্টায় দৃশ্যকল্প,
সভ্যতা উজারে, “সভ্যতা সংরক্ষন প্রকল্প!,”
বাতাসে দীর্ঘশ্বাস, হাঁসফাঁস, কত কেচ্ছা, সাচ্চা আচ্ছা গল্প।

আরেকটিবার ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে,
নতুন ভাগাড়, পোড়াকপাল, আবারও পুড়ে যায়।
আশা-ভালবাসা পোড়ে কয়লায়,
চলে রুদ্র তাণ্ডব, মচ্ছব আর মাৎস্যন্যায়।।

বেচাকেনা

বেচি না স্বদেশ
করে নি:শেষ
স্বার্থ জলাঞ্জলি
গর্ব অশেষ
অল্পেই বেশ
ঘামেভেজা আধুলি
এপার-ওপার
কত দরকার
লোভাতুর চোখগুলি
হিসহিসে সাপ
আঁকাবাঁকা পাপ
সরু সরু অলিগলি
হাজারো খোলস
শতেক মুখোশ
কাঁধে ঝোলা একই থলি
ঝোল বদলায় হাড্ডি চিবোয়
জনগণ হয় বলি
কড়ি চুরি পাচার
শ্রমের আচার
সঞ্চিত মাদুলি
প্রকৃতির শাপ
না হয় যে মাফ
অথৈ চোরাবালি।

গল্পটা আষাঢ়ে

পূর্ণিমায় রোদ ওঠে আকাশের কিনারে,
ঝাঁকেঝাঁকে হাতি ওড়ে বনে ও বাদারে
চামচিকা চেঁচামেচি, হঠাৎ কি হোলো রে?
হুলো বেড়াল হ্যালো বলে গলা খুলে বেতারে
পুকুরের মাছগুলো কেঁদেকেটে আহারে!
বলে, পানি আর না, চা দাও আমারে
লেপের নীচেতে দেখি ঠকঠক কাঁপেরে
চাঁদমামা শীতে জমে দাঁতেদাঁত লাগেরে
আমি বলি ওমা একি ঘরে এত আলোরে
চেয়ে দেখি জোনাকিরা ঝিমোচ্ছে চেয়ারে
দেয়ালে টাঙানো ছিল মোর ছবি বাহারে
ছবি আমার নেমে বলে, চেন না-কি আমারে
বিশ্বাস হচ্ছে না, চোখ টিপে হাসোরে
মাঘ মাসে গাঁজাখুরি গল্পটা আষাঢ়ে

লেখক:
Mohammad Naqibuddin
ডা. মোহাম্মাদ নাকিবউদ্দীন, বিতার্কিক, চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও কবি

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট