নোঙর ফেলো
এক দিঘি জল
একটু কাজল–
নোঙর ফেলো।
এক আষাঢ়ে
অশ্বত্থ ছায়ে–
আগুন জ্বেলো।
এক মাঘেতে
বুকের ছাদে–
মখমলি এক বিছান দিও।
এক বোশেখের
একটি বিকেল–
মেলায় নিও।
একতারাতে তিনটি চুড়ি
ভাঙলো যখন–
পবন কেটে সুরটি নিও।
এক পৌষে
দিন ফুরোলে–
নতুন ধানের বীজটি বুনো।

জোনাক জ্বলা বাসর
মেঘ সিথানে
একটু নুয়ে
ঝিলের জলে
চন্দ্র দোলে।
আয়না তাহার
ঢেউ খেলে যায়
মুখটি চাঁদের
ডুব দিয়ে যায়।
তুই কি আমার
স্বপ্ন হবি?
চাঁদের মতো
জলের মতো
পূর্বরাগে পাখির মতো
শীত সকালে
রোদের মতো
অরুন্ধতী স্বাতী’র মতো?
জলের বুকে
পদ্ম হবি?
কাঁটা তুলে
পুষ্প হবি
বজ্র ছিনে
বাষ্প হবি?
আয়-না তবে
আসর পাতি
জোনাক জ্বলা
বাসর পাতি!

অবিনাশ-১
একটা ঘাসফড়িং বিকেলে তুই আমাকে
মৃত পাখিদের উড়ে যাবার গল্প বলেছিলি অবিনাশ,
আমি তখনও বুঝিনি,
কী করে বন্দি হয় অমিত আকাশ!
মনে আছে অবিনাশ?
তুই আমাকে বলেছিলি, আমরা অতিক্রম করব অক্ষরেখা, উত্তর থেকে দক্ষিণে–
আমি এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছি বিষুবরেখায়।
সেই যে, তুই যেদিন আমাকে বিষুবীয় রেখায় দাঁড় করিয়ে চলে গেলি,
আমার হাতের মুঠোয় ভরে দিলি অলকানন্দা ভোর–
সেই থেকে আমি অপেক্ষায়,
আমি তখনও বুঝিনি;
দখিনে দোল খাওয়া বসরাই গোলাপ
কী করে হয়ে যায় বারো নং লেনের ডেনড্রোবিয়াম!
জানিস অবিনাশ,
আমি এখনও খুঁজে পাইনি
পৃথিবীর জলভাগ, স্থলভাগ কিংবা অক্ষাংশ!
ছুঁতে পারিনি দ্রাঘিমারেখা।
শুনেছি,
আমাকে বিষুবরেখায় দাঁড় করিয়ে,
তুই ঠিকই অতিক্রম করেছিলি অক্ষরেখা।
বসরাই গোলাপের বিনিময়ে–
দক্ষিণ গোলার্ধে গড়ে নিয়েছিস আপন নিবাস।
তোর নামটি কিন্ত বেশ, অবিনাশ!
সত্যিই বিনাশ নেই তোর, তোদের…

অবিনাশ-২
তুই দক্ষিণে চলে যাবার পর
আমি আর কবিতা লিখিনি অবিনাশ।
বিষুবরেখায় দাঁড়িয়ে
আমি আর দেখিনা অমিত আকাশ,
একটা প্রলয়ঙ্কারী ঝড়ের শেষে
উদ্ভ্রান্ত বৃক্ষের হাহাকার দেখি–
দেখি, ঝোড়োপাতার মুদ্রাহীন নৃত্য
কী করে অদৃশ্য হয়ে যায় অবেলায়।
তুই অভিমন্যু হতে পারিসনি অবিনাশ,
হতে পারিসনি ভীম কিংবা নিদেনপক্ষে অর্জুন!
কী অবলীলায় ক্যাসিনোয় উড়িয়ে দিলি–
দেশ, আর ডেন্ড্রোবিয়াম!

চন্দ্রাবতী
আজ খবরের কাগজে,
আরও একটি চন্দ্রমল্লিকার খুনের খবর…
আরও একটি বিশুদ্ধ লাল গোলাপ বর্ণহীন
আরও একটি পক্ষীশাবক নিখোঁজ
আরও একটি গন্ধরাজ শহর থেকে উধাও।
টিভিতে শুনলাম,
এই শহরের সব বুনো ফুলেদের দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন;
গেরুয়া দেয়ালের সব কালো টিকটিকিগুলোকে নাকি
ছেড়ে দেওয়া হয়েছে মানিক মিয়া এভিনিউতে
ওড়ার জন্য দেওয়া হয়েছে ফিনিক্স পাখির ডানা!
এ শহরে ১৪৪ ধারা জারি হয়েছে সব ফুলেদের নামে
সস্তায় বিক্রি হচ্ছে চন্দ্রমল্লিকা, গন্ধরাজ, বকুল, কদম, এমনকি গোলাপও…
এ শহরে মানুষ যাঁরা ছিলো, তাঁদের নাকি
নিউরনে দুঃখ-প্রবাহ ছাড়া আর কোন সাড় নেই…
সামনে তমসা ঘনা রাত, এক পা এগুলেই কৃষ্ণ গহ্বর!
এমন বিবস্ত্র যুগে তুমি আর কতবার জন্ম নেবে চন্দ্রাবতী?

স্বপ্ন চুরি
কতদিন রৌদ্র মাখি না গায়ে
কতদিন দেখি না সুর্য!
পূবে হাইরাইজ, পশ্চিমেও তাই…
কতদিন ছুঁইনি তোমাকে গোধুলি বিকেল?
ভোরে যাযাবর আলো এসে বলে যায়
জেগেছ তুমি,
দাঁড়াই বারান্দায়…
সামনের পুরোনো বাড়িটার কুঞ্জলতার ঝাড়ে
তোমার বিকীর্ণ কিরণ
দোল দিয়ে যায়…
তবু যে দেখি না তোমায়!
চারিদিকে ছড়িয়ে আছে তোমার আলো
হাইরাইজের আলপথ বেয়ে…
রাস্তায়, মানুষে, রিক্সায়, গাড়িতে, ইটে, কাঠে, কংক্রিটে,
নিম গাছের নকশি পাতায়…
তবু অদৃশ্য তুমি!
এ কেমন লুকোচুরি খেলা–
বেলা-অবেলা?
রাতের বিজনে খুব কাছে গিয়ে
কতদিন খুঁজেছি তোমাকে চাঁদ,
মুখে এক আঁজলা জ্যোৎস্না মাখব বলে
দক্ষিণের এক চিলতে বারান্দায়;
কত উঁকিঝুঁকি কতশত কাতর মিনতি _
কামিনী’র তীব্র সুগন্ধ অন্ধকারের বুক চিরে
ভেসে আসে– সে কোন বাতাসে?
মাঝে মাঝে কৃপা করে
হঠাৎ-ই সামনের ছাদে কিঞ্চিৎ আলো ফেলে যাও
তবুও সারি সারি হাইরাইজের আলপথে–
কোথা কোন গোপন গুহাতে লুকাও??

লেখক:
রোকসানা শাহ্নাজ
কবি; ঢাকা