বিশ্ববিখ্যাত সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ বলতেন,
‘সংগীত আমার জাতি আর সুর আমার গোত্র।’
যাঁর শব্দভিত্তিক সুরের খেলায় রাগরাগিণীর অসাধারণ সৃষ্টি ভারতবাসীসহ সমগ্র বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল, তাঁর পক্ষে এমন কথা বলাই স্বাভাবিক। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’র হাত ধরেই ভারতীয় উপমহাদেশের রাগসংগীত সর্বপ্রথম পাশ্চাত্যের শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি পায়। কথিত আছে, তাঁর সেতারের ঝঙ্কারে মানুষ মোহিত হয়ে যেত এবং প্রকৃতি নাকি তখন থমকে দাঁড়াত।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ
ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে এক সংগীতপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আলাউদ্দিন খাঁ।বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ পিতা সবদর হোসেন খাঁ ওরফে সদু খাঁ এবং মাতা সুন্দরী বেগমের তৃতীয় পুত্র তিনি। ডাকনাম ছিল আলম। সংগীতপরিবারের একজন বিধায় সেই রক্তের আদলে তিনি সংগীতে হাতেখড়ি নেন তাঁরই বড় ভাই ফকির আফতাব উদ্দিন খাঁ’র কাছ থেকে। কিন্তু এতে তাঁর সাধ মেটে না। মাত্র ১০ বছর বয়সে সুরের সন্ধানে পালিয়ে যান ঘর থেকে। এদিক-সেদিক কিছুদিন ঘোরাফেরা করে একটি যাত্রাদলে যোগ দেন। যাত্রাদলের সঙ্গে গ্রামগঞ্জে ঘুরে বেড়াতে থাকেন। জীবনের পটপরিবর্তন হতে থাকে। কারণ ওই সময়ে জারি-সারি, বাউল, ভাটিয়ালি কীর্তন, পাঁচালি, ইত্যাদি বৈচিত্র্যময় গানের সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত হন তিনি। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন দলে গাইতে গাইতে একসময় পৌঁছযেযান ঢাকায়। কিছুদিন ঢাকায় থেকে সোজা চলে যান কলকাতায়। কলকাতার মতো বড় শহরে যেয়ে তিনি খানিকটা দিশেহারা হয়ে পড়েন। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর এক কিশোরকে দেখে এগিয়ে এসেছিলেন এক ভদ্রলোক। ভদ্রলোক বালক আলাউদ্দিনের সংগীত প্রেমে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে নিয়ে গেলেন শ্রেষ্ঠ সংগীতজ্ঞ গোপালকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের কাছে। গোপালকৃষ্ণ তখন শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ ছিলেন। সংগীতের প্রতি বালক আলমের তীব্র অনুরাগ দেখে অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও গোপালকৃষ্ণ তাঁকে গান শেখাতে সম্মত হলেন। শুরু হলো একজন গুরুর কাছে বসে গান শেখার পালা। সারগাম সাধনা করতে করতেই প্রায় সাত বছরের মাথায় গুরুর গোপালকৃষ্ণ প্রয়াত হলেন। এই সাত বছরের সংগীত সাধনা তাঁকে বিশাল অর্জন এনে দিয়েছিল। যথার্থ গুরুর যথার্থ শিষ্য আলাউদ্দিন গান শুনেই সারগাম লিখে দিতে পারতেন। এরপর তিনি কণ্ঠসংগীতের সাধনা ছেড়ে যন্ত্রসংগীত সাধনায় নিযুক্ত হন। স্টার থিয়েটারের সংগীতপরিচালক অমৃতলাল দত্ত ওরফে হাবু দত্তের কাছে বাঁশি, পিকলু, সেতারা, ম্যান্ডোলিন, ব্যাঞ্জো ইত্যাদি দেশী-বিদেশী বাদ্যযন্ত্র শিখতে থাকেন এবং অল্পদিনের মধ্যে প্রায় সর্বক্ষেত্রে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। সংগীতের সাথে তাঁর রোমান্স ছিল।তিনি বলতেন,
‘সংগীতের প্রতি অনুরাগই জীবনের শ্রেষ্ঠ রোমান্স।’
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, তিনি লবো সাহেব নামে এক গোয়ানিজ ব্যান্ড মাস্টারের কাছে পাশ্চাত্য রীতিতে এবং বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ অমর দাসের কাছে দেশীয় পদ্ধতিতে বেহালা শেখেন; একই সময়ে তিনি মিসেস লবোর কাছে স্টাফ নোটেশনও শিখে নেন। এ ছাড়া হাজারী ওস্তাদের কাছে সানাই, নাকারা, টিকারা, জগঝম্প আর নন্দবাবুর কাছে মৃদঙ্গ ও তবলা শেখেন। এভাবেই তিনি সর্ববাদ্যে বিশারদ হয়ে ওঠেন। তিনি দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে অর্কেস্ট্রার স্টাইলে একটি যন্ত্রীদল গঠন করে নাম দিয়েছিলেন ‘রামপুর স্ট্রিং ব্যান্ড’।
আলাউদ্দিন খাঁ কিছুদিন ছদ্মনামে মিনার্ভা থিয়েটারে তবলা শিল্পী হিসেবে চাকরিও করেন। একবার ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদার জগৎকিশোর আচার্যের আমন্ত্রণে তাঁর দরবারে সংগীত পরিবেশন করতে গেলে সেখানে ভারতের বিখ্যাত সরোদিয়া ওস্তাদ আহমেদ আলী খাঁর সরোদবাদন শুনে তিনি সরোদের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং তাঁর কাছে পাঁচ বছর সরোদে তালিম নেন। পরে ভারতখ্যাত তানসেন বংশীয় সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর কাছে সরোদ শিখতে রামপুর যান। ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ রামপুরের নবাব হামেদ আলী খাঁ’র সংগীতগুরু ও দরবার-সংগীতজ্ঞ ছিলেন। আলাউদ্দিন তাঁর কাছে দীর্ঘ ত্রিশ বছর সেনী ঘরানায় সংগীতের অত্যন্ত দুরূহ ও সূক্ষ্ম কলাকৌশল আয়ত্ত করেন। আলাউদ্দিন খাঁ সরোদে বিশেষত্ব অর্জন করেন। সহজাত প্রতিভাগুণে তিনি সরোদবাদনে ‘দিরি দিরি’ সুরক্ষেপণের পরিবর্তে ‘দারা দারা’ সুরক্ষেপণ-পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। সেতারে সরোদের বাদনপ্রণালী প্রয়োগ করে সেতারবাদনেও তিনি আমূল পরিবর্তন আনেন। এভাবে তিনি সংগীতজগতে এক নতুন ঘরানার প্রবর্তন করেন, যা ‘আলাউদ্দিন ঘরানা’ বা শ্রেণী ‘মাইহার ঘরানা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। তিনি প্রচুর গান রচনা করেছেন। তাঁর রচিত গানে তিনি ‘আলম’ ভনিতা ব্যবহার করেছেন। ১৯১৮ সালে নবাব তাঁকে মধ্য প্রদেশের মাইহার রাজ্যে প্রেরণ করেন। মাইহারের রাজা ব্রিজনারায়ণ আলাউদ্দিন খাঁকে নিজের সংগীতগুরুর আসনে অধিষ্ঠিত করলে তিনি মাইহারে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বেরিলির পীরের প্রভাবে তিনি যোগ, প্রাণায়াম ও ধ্যান শেখেন। জীবনের একটা বড় অংশ শিক্ষার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেন তিনি।
১৯৩৫ সালে তিনি নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। নৃত্যাচার্য উদয়শংকর পরিচালিত নৃত্যভিত্তিক ‘কল্পনা’ শীর্ষক একটি ক্ল্যাসিকধর্মী ছায়াছবিতে আবহসংগীতে সরোদ পরিবেশন করেন তিনি।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ
আলাউদ্দিনের পরামর্শ ও নির্দেশে কয়েকটি নতুন বাদ্যযন্ত্র উদ্ভাবিত হয়। সেগুলির মধ্যে ‘চন্দ্রসারং’ ও ‘সুরশৃঙ্গার’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি অনেক রাগ-রাগিণীও সৃষ্টি করেন, যেমন: হেমন্ত, দুর্গেশ্বরী, মেঘবাহার, প্রভাতকেলী, হেম-বেহাগ, মদন-মঞ্জরী, মোহাম্মদ (আরাধনা), মান্ঝ খাম্বাজ, ধবলশ্রী, সরস্বতী, ধনকোশ, শোভাবতী, রাজেশ্রী, চন্ডিকা, দীপিকা, মলয়া, কেদার মান্ঝ, ভুবনেশ্বরী ইত্যাদি। তিনি স্বরলিপিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাঁর বহুগানের স্বরলিপি সংগীতবিজ্ঞান প্রবেশিকা গ্রন্থে নিয়মিত প্রকাশ হতো। মাইহার রাজ্যে, ‘মাইহার কলেজ অব মিউজিক’ প্রতিষ্ঠা তাঁর সঙ্গীত জীবনের এক শ্রেষ্ঠ অবদান। তিনি ছিলেন কলেজের সর্বেসর্বা পরিচালক।
কথিত আছে, সংগীতপ্রেমী আলাউদ্দিন খাঁ বিয়ের রাতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’র এক পুত্র ও তিন কন্যা। পুত্রের নাম আলি আকবর খান এবং কন্যাদের নাম সরিজা বেগম (সরোজিনী), জাহান আরা বেগম ও রওশন আরা (অন্নপূর্ণা)। তাঁর পুত্র-কন্যারাও সুযোগ্য সংগীতপ্রেমী। ‘মদন মঞ্জরী’ নামের রাগটি তাঁর সহধর্মিনী মদিনা বেগমের নামেই রচনা করেন। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর তালিমের গুণে তাঁর পুত্র সরোদশিল্পী ওস্তাদ আলী আকবর খান বিশ্ববিখ্যাত হয়েছেন। ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মভূষণ’ ও ‘পদ্মবিভূষণ’ এবং তাঁর জামাতা সেতারশিল্পী পন্ডিত রবিশঙ্কর বিশ্বখ্যাত হয়েছেন এবং ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মভূষণ’, ‘পদ্মবিভূষণ, ও ‘ভারতরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।
সংগীতের প্রতি ভালোবাসা, সাধনা, সংকল্প, প্রবল ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য, নিষ্ঠা আর আন্তরিকতাই আলাউদ্দিন খাঁকে ‘ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’ করে তুলেছে। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘খাঁ সাহেব’ উপাধিতে ভূষিত করে। ভারত সরকার তাঁকে একে একে ‘সঙ্গীত নাটক আকাদেমী সম্মান’ (১৯৫২), ‘পদ্মভূষণ’ (১৯৫৮) ও ‘পদ্মবিভূষণ’ (১৯৭১); বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ‘দেশিকোত্তম’ (১৯৬১) এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ‘ডক্টর অব ল’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৫৪ সালে তিনি ভারত সরকার কর্তৃক প্রথম সঙ্গীত নাটক আকাদেমীর ফেলো নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ্ মুসলিম হল তাঁকে আজীবন সদস্যপদ দান করে। তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমন্ত্রণে শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীতে আমন্ত্রিত অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এসব দুর্লভ সম্মান ও খেতাব সংগীতবিদ্যায় আলাউদ্দিন খাঁ’র অসাধারণ কীর্তি ও সাফল্যকেই সূচিত করে।

আব্বাসউদ্দিন আহমেদ ও কাজী মোতাহার হোসেনের মাঝখানে ওস্তাদজি।
১৯৭৩ শাস্ত্রীয় সংগীতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের প্রাণকেন্দ্রে কুমারশীল রোডে প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি সংগীত অ্যাকাডেমি ও জাদুঘর। এই জাদুঘরে সংরক্ষিত ছিলো বিভিন্ন স্থানে সংগীত পরিবেশনের অনেক ছবি ও তার ব্যবহার করা বাদ্যযন্ত্রসমূহ।
কিন্তু ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের হামলায় শাস্ত্রীয় সংগীতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’র স্মৃতিচিহ্নগুলো ২০১৬ সালে এক ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদ মার্কেটের একটি দোকানের সামনে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কান্দিপাড়া জামেয়া ইসলামিয়া ইউনুসিয়া মাদরাসা ছাত্রদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বিরোধের ফলে এক সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়। তখন গুরুতর আহত হয় মাদরাসা ছাত্র হাফেজ মাসুদুর রহমান। হাসপাতালে নেওয়ার পর দিন মারা যান মাসুদুর রহমান।
তার মৃত্যুর পর ছাত্ররা আবার শুরু করে দেয় তাদের তাণ্ডব। এ তাণ্ডবে তারা আলাউদ্দিন খাঁ’র স্মৃতিচিহ্নগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ফলে ধ্বংস হয়ে যায় শাস্ত্রীয় সংগীতের পুরোধা ব্যক্তিত্বের স্মৃতিবিজরিত এ জাদুঘর।
মানুষের হৃদয়ে কেউ হামলা করতে পারে না, তান্ডব চালাতে পারে না। প্রতিটি সংগীতপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে তিনি আছেন, থাকবেন চিরদিন।