১৯৭৫ পর থেকে আগস্ট মাসটাকে শোকের মাস হিসেবেই মেনে এসেছি তখন কি জানতাম এই মাসটা সত্যিই শোকের মাস। আমার জীবনের সব আনন্দ আগস্ট মাসেই থেমে যাবে। আমাকে লড়তে হবে বৈরি আবহাওয়ার সাথে। আমাকে প্রতিবাদ করে চাইতে হবে একটি নিরাপদ সড়ক। ১৩ আগস্ট আমি হারিয়েছি আমার স্বজন, আমার বন্ধু। প্রতিদিন বাংলাদেশের মানুষ হারাচ্ছে তাদের স্বজন বিভীষিকাময় সড়কে। আমরা কোথায় যাব? কার কাছে চাইবো আমাদের স্বজনদের সড়কে হত্যার বিচার দাবি, সড়কের নিরাপত্তা?
আমাদের সন্তানরা এই শোকের মাসেই রাস্তায় নেমেছিল নিরাপদ সড়কের দাবী নিয়ে। আমাদের সন্তানরা বেড়ে উঠছে সড়কে প্রতিনিয়ত প্রিয়জন, স্বজন, বন্ধু হারিয়ে। ওদের মানসিক অবস্থার কথা দেশের কর্তা ব্যক্তিরা কি কখনো ভেবেছেন? না! তাদের সেই সময় কোথায় সময় নষ্ট করবার। তাদের ভাবনা অনেক উচ্চে। হাত বাড়িয়ে সেই ভাবনাকে ছোঁয়া সাধারণের সেই যোগ্যতা নেই। তারপরও যখন কিশোর কিশোরীরা রাস্তায় নেমে দেখিয়ে দেয় পথ, বড়দের বিবেক বোধ উদয় হয় না, বরং উল্টো হয়। সুন্দর নিষ্পাপ একটি নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকে কলুষিত করলো। আমরা অসহায় পিতামাতা চেয়ে চেয়ে দেখলাম। প্রতিবাদ করতে পারলাম না সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে। আমি অতি সাধারণ বাঙালি মা-আমি “ঈশ্বরী পাটনি”। যে ঈশ্বরের কাছ থেকে শুধু সন্তানের নিরাপদ জীবন প্রার্থনা করে। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনায় বলি “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”।

মিশুক মুনীর
আমাদের সন্তানদের উপদেশ দেয়ার অধিকার এই দেশের কর্তা ব্যক্তি, জ্ঞানী-গুণীজন হারিয়েছেন। মুখেই বলেছেন “তোমাদের থেকে আমরা শিখেছি” মিথ্যে কিছুই শেখেনি। এই দেশে যারা জ্ঞানীগুণী, যারা দেশ চালান, অনেক তাদের জ্ঞান। ছোট শিশু কিশোর কিশোরীর থেকে কি শিখব। এই গর্ব আমাদের বড়দের। সন্তানের দেখানো আলোয় বড়রা পারেনি নিজেকে আলোকিত করতে। পারেনি ওদের দেখানো পথ চলতে। পেরেছে ওদের সেই আলোকে অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলে দিতে। আমাদের সন্তানরা সকালবেলার পাখি হয়ে কুসুমবাগে ডেকে উঠতে চেয়েছিল, ওরা ডেকে উঠেছে। শুধু জানতো না কর্তাদের পোষা নেকড়ে যে কুসুমবাগের ভিতরে রয়েছে। বুঝতে পারেনি ভোরের পাখির দল বড়দের ভিতরটা এতোটা কুৎসিত, বুঝতে পারেনি নোংরা দখল করে আছে ওদের মন। ওরা এক একজন বাংলাদেশ হতে চেয়েছে। কিন্তু মাথার উপরে থাকা কর্তা ব্যক্তিরা ওদের সকাল বেলার পাখি বাংলাদেশ হতে দিতে চায়নি। বড়দের ভয়, যদি ওরা জেগে ওঠে তাহলে সব অন্ধকার শেষে জ্বলে উঠবে সূর্যের আলোয়।
আগস্ট আর শোকের নয়। যে মানুষটার জন্য এতো শোকের মাতম সেই আলোকিত মানুষটা ওপার থেকে চেয়ে আছে সকাল বেলার পাখিদের জন্য। কখন তারা আবার জেগে উঠবে। এই মাসটা ভোরের পাখিদের ডেকে উঠার মাস। হ্যাঁ আমাদের সন্তানরা জেগে উঠলে রাত পোহাবে সেই আশায় প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছি।
