স্মরণে কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল (ছবি, বক্তব্য, উদ্ধৃতি)

Comments

 

জসিম উদ্দিন মন্ডল নামের এক ভদ্রলোকের মৃত্যু বার্ষিকী আজ। কি ভ্রু কুঁচকে যাচ্ছে? অনিচ্ছা সত্ত্বেও ব্রাউজারের ডানপাশে আরেকটা ট্যাব খুলে নামটা সার্চ করছেন? লাগবে না, আপনাদের বিরক্তিমাখা খোঁজ কমরেড জসিম উদ্দিন মন্ডলের লাগবে না। খুঁজতে চাইলে ভালোবেসে খুঁজুন, সম্মান নিয়ে খুঁজুন। ১১ বছর বয়সে আপনার কথা, আপনাদের কথা বলতে রাস্তায় নেমেছিলেন ট্রাক শ্রমিকদের আন্দোলনের সারথি হয়ে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিটা আন্দোলনে, লড়াই-সংগ্রামে আওয়াজ তুলেছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন সৈনিক হিসেবে।  মুম্বাই, মাদ্রাজসহ বিভিন্ন বন্দর থেকে যেসব কামান, বারুদের গাড়ি আসত, সেগুলো ট্রেনে আসামে পৌঁছে দিতেন। ট্রেনের ইঞ্জিনের বয়লারে কয়লা ভরতেন। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত যুদ্ধে সব রকমের সাহায্য করেছেন।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করেছেন। ছিলেন কমরেড জ্যোতি বসুর ঘনিষ্ঠ। ১৯৪০-৪১ সালের কলকাতা থেকে ট্রেনে চেপে জ্যোতি বসু ঈশ্বরদী এসে দু’তিন দিন থেকে একে একে সান্তাহার, পার্বতীপুর, লালমনিরহাট প্রভৃতি এলাকায় রেল শ্রমিকদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। সে সময় শ্রমিকদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে তাকে এমএলএ প্রার্থী করা হলে জ্যোতি বসুর কাছে মুসলিম লীগের প্রার্থী হুমায়ুন কবির বিপুল ভোটে পরাজিত হন। জ্যোতি বসুর লাল ঝাণ্ডার পক্ষে মুসলিম লীগের কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে সে সময় জসিম মণ্ডলের মাথা ফেটে যায়।

তাদের দেখে কলোনির লোকেরা ঠাট্টা করতেন- “এরা বলে ব্রিটিশ খেদাবে! এরা বলে ধনী উচ্ছেদ করবে!” কিন্তু লাল ঝাণ্ডা যে সাচ্চা লোকদের পার্টি এটাও তাঁরা বলতেন। তাঁরা জানতেন, এই পার্টিতে এমন সব সেলাক আছেন, যা অন্য কোনো পার্টিতে নেই। তার কিছু  উদ্ধৃতি আপনাদের জন্য-

‘গরীবরা চুরি করেনা, তারা পরিশ্রম করে উপার্জন করে। চুরি করে শালার বড়লোকেরা। এই অঙ্ক বুঝিতেই হইবে। এই সমাজ পঁচা গলা, এ সমাজ ভাঙিতেই হইবে।’

– কমরেড জসীম উদ্দীন মণ্ডল

 

 

“যে কথা আমরা ঢাকায় বলি, সেটি যদি গ্রামে না নিয়ে যাই, আমতলা, বাঁশতলা, কাঁঠালগাছের নিচে, হাটে, ঘাটে, মাঠে, গ্রামের মানুষের কাছে না নিয়ে যাই, তাহলে কিভাবে হবে? সে জন্য ঢাকায় আসতে চাইনি। আমার কথা হলো, পার্টিকে গ্রামে নিতে হবে।”

– কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল

 

…জেলখানায় নিম্নমানের খাবার নিয়েও আন্দোলন শুরু করি। জেলখানায় আন্দোলনের ফলে এক মাস ঘানি টানার শাস্তি দেয় জেল কর্তৃপক্ষ। ঘানি টানার বিরুদ্ধে কথা বলা ও জেল কর্তৃপক্ষের বকাবকির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালে আমাকে উলঙ্গ করে মাঘের শীতে ঠাণ্ডা পানির মধ্যে ডুবিয়ে রাখা হয়। খবর পেয়ে আমার স্ত্রী তত্কালীন জেলা প্রশাসককে অবহিত করলে তিনি জেল পরিদর্শনে এসে আমাকে উলঙ্গ দেখতে পান। এ সময় তিনি পোকাওয়ালা সিদ্ধ ছোলা খাবার দেওয়া, ঘানি টানাসহ সব বন্ধ করে দেন। ওই সময় থেকে আজ পর্যন্ত পাবনা কারাগারে আর কখনো ঘানি টানানো হয়নি কয়েদিদের দিয়ে। আমার আন্দোলন সফল হয়।”

– কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল

 

…ওই সময়ে পাকিস্তান সরকার রেলশ্রমিকদের রেশনে খুদ (চালের ক্ষুদ্র অংশ) দিত। একদিন খুদ নিয়ে মাকে বললাম, ‘তোমার পাকিস্তান সরকার খাবার জন্য এগুলো দিয়েছে। এটাই পবিত্র চাল! মুসলমানদের চাল!’ তখন তার মা পাকিস্তানের পতাকা বাড়ি থেকে নামিয়ে ঝাঁটা দিয়ে পতাকার ওপর কয়েকটি বাড়ি দিয়ে আমাকে বললেন, ‘এই খুদের বিরুদ্ধে আন্দোলন কর।’ ওই দিন আমি আর আমার মা পার্বতীপুরের রেল কলোনিতে যারা বসবাস করত তাদের নিয়ে আমরা সংগঠিত হতে থাকলাম।

– কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল

 

 

‘সিক্স পর্যন্ত পড়েছি। তবে মার্ক্সবাদ শুনে, পড়ে শিখেছি। তা ছাড়া মানুষের সঙ্গে মিশি। আমার বক্তৃতা গরিবরা বেশি শোনে। কারণ গরিব যে ভাষায় শুনতে চায়, সেই ভাষা আমি জানি। ওই জীবনযাপন করি, ওভাবে চলাফেরা করি।’

– কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল

 

 

“আমি তৈরী করবো কাটারীভোগ চাল। আমি সেই ধান বুনবো। সেই ধান নিড়াবো। সেই ধান কাটবো। বাড়ীতে নিয়ে এসে সেই ধান মাড়াই করবো। ধান বাইর করবো। সেই ধান আমার বউ সিদ্ধ করবে, শুকাবে। ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে চাল বের করবে। গন্ধে ঘর ভরে যায়। সেই চাল আমার ছেলে খেতে পাবে না। সেই চাল আমার মেয়ে খেতে পাবে না। সেই চাল বাড়ীআলা খেতে পাবে না। সেই চাল খাবে কিডা? আল্লাহ্ যার কপালে রেখেছে। কার কপালে রেখেছে? গুলশানে যে থাকে। ধানমন্ডিতে যে থাকে। বনানীতে যে থাকে। জমিদারের পুলা যে। জমিদারের মেয়ে যে। জোতদারের মেয়ে যে। তারাই খাবে কাটারী ভোগ। তৈরী করবো আমি, আর খাবে সে।

আপনাদের কাছে আমি বলি- এই সমাজ মানি না। এই সমাজ ভাঙতে হবে, সমাজতন্ত্র গড়তে হবে”

– কমরেড জসিম উদ্দিন মন্ডল

কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডলের একটি বক্তব্য-

https://www.facebook.com/bangalianaa/videos/2107786969484471/?__xts__[0]=68.ARAvbIO1nODu29CuAaOXLgF2YowLpp0XZgfFoxUEK40zZbd5eE8q6ay7q2xMbjrUNR4LDOJZXCOShmdr3s0FFx3dbGZUrKkztfHDK7VT72Nezumey2RlIVGydeMXKU6gJHnnsVi5vM2nGacBxgvqsVncIVE8LnKeQL-CHwOrza-wBHMQB5BRHA&__tn__=-R

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.