পৃথিবীতে অসংখ্য বিষয়ের মতো “মৃত্যুদণ্ড” প্রশ্নে মত-বিভক্তি রয়েছে ব্যাপক। নৃশংস অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি “মৃত্যুদণ্ড” সঠিক মনে করেন কেউ, কেউ আবার এর বিপরীতেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। এই বিভক্তি হয়তো থাকবে আরও বহুদিন। তবে এ বিষয়ে নিজের যৌক্তিক মত প্রকাশ করার ক্ষেত্র প্রস্তুতে বাঙালীয়ানা প্রয়াসী।
বাঙালীয়ানার আহ্বানে সারা দিয়ে অনেকেই এ বিষয়ে তাদের ভাবনা লিখে পাঠিয়েছেন। বাঙালীয়ানা তার পাঠকের জন্যে সেই ভাবনাগুলো প্রকাশ করছে প্রতিদিন ধারাবাহিকভাবে। – সম্পাদক
গৌতম বুদ্ধের পরম বাণী- অহিংসা পরম ধর্ম।
একজন মানুষ হিসেবে আমরা অন্য সব প্রাণীর থেকে অনেক বেশি ভাগ্যবান। তাই বুঝি সৃষ্টির সেরা জীব আমাদেরই বলা হয় । আরও অনেক কারণ অবশ্যই রয়েছে সেরা হওয়ার তার মধ্যে একটি হলো, ‘ ভাল-মন্দ অনুভব করা’। যেমন ভাল-মন্দ কিছু করার আগেই আমাদের বিবেক একবার হলেও নাড়া দেয়।
ছোট থেকে আমরা সকলেই অনেক নীতি বাক্য পড়েছি। তার মধ্যে অন্যতম এবং সর্বাধিক পড়া বাক্য হলো, ‘পাপ কে ঘৃণা কর, পাপী কে নয়’। এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর যে এ বাক্য পাঠ করেননি বা কখনো শোনেননি! তবে হ্যাঁ আমরা পড়ছি ঠিকই কিন্তু এর উপযুক্ত ব্যাখ্যা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। আদও বুঝতে পারবো কি না এ নিয়ে সন্দেহ আছে।
আজ যে বিষয়টি নিয়ে লেখছি সেটি হচ্ছে, “একজন মানুষের মৃত্যুদন্ড ও তাঁর অধিকার”। অনেকেই হয়তো প্রশ্ন তুলবেন যে, মানুষের নাকি অপরাধীর ফাঁসি?
আমি উওরে শুধু বলবো যে ধৈর্য হারাবেন না। আমি যতটুকু সম্ভব বলে যাবো। শুধু ধৈর্য আর অপেক্ষা করতে হবে। আচ্ছা কেউ কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন যে এখন পর্যন্ত কোন নিরাপরাধ মানুষকে রাষ্ট্র দ্বারা মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়নি? আপনার কাছে হয়তো নেই আমার প্রশ্নের উওর। কিন্তু আমার কাছে উওর আছে যে অনেক নিরাপরাধ মানুষকে রাষ্ট্র কর্তৃক মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছে এবং পরে প্রমাণ হয়েছে যে তারা সবাই নির্দোষ ছিলেন। তবে আপনিই বলেন আমি কি ভাবে না জেনেই বলবো যে সে অপরাধী? তাই মানুষ বলেই সম্বোধন করলাম।
‘অভিযুক্ত’ ও ‘অপরাধী’ !!
‘অভিযুক্ত’ মানে হলো যে একটি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এর জন্য রাষ্ট্র বা ব্যক্তি উপরোক্ত অপরাধের জন্য অনেকজনকে অভিযুক্ত করে মামলা করেন। এতে কিন্তু অনেক নিরপরাধ ব্যক্তিদেরও জড়ানো হয়।
বি: দ্র: অভিযুক্ত ব্যক্তিরা শেষ পর্যন্ত সবাই কিন্তু অপরাধী প্রমাণিত হয় না। কারণ তাঁরা অনেকেই অপরাধ সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
‘অপরাধী’ মানে হলো যে, কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের আদালত দ্বারা দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের সাথে সম্পর্ক আছে বা সরাসরি হস্তক্ষেপ রয়েছে। উপরোক্ত দুই ধরনের ব্যক্তিদের মধ্যে কোন পার্থক্য করতে আমাদের সমাজ কখনো প্রস্তুত নই। আর এজন্য অবশ্যই আমাদের সমাজ ব্যবস্থাকেই দায়ী মনে করি।
এটা হয়তো আপনারা অনেকেই মানতে চান না। ‘অভিযুক্ত’ ও ‘অপরাধী’ এক নয়। এদের মধ্যে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। এই পার্থক্য চেনার উপায় আমাদেরই বের করতে হবে। না হয় নিঃসেন্দহে এভাবেই কেটে যাবে দিনকে দিন।
সমগ্র পৃথিবী আজ একটি বিষয়ে দুইটি মতে বিভক্ত হয়ে গেছে। কোন সন্দেহ নেই কারণ নৃশংস অপরাধের জন্য অনেকেই সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ড পছন্দ করেন। আবার এর বিপরীতেও অনেকের অবস্থান সুস্পষ্ট।
এমন একটি প্রশ্ন থেকেই যায় যে, তবে কি ভয়াবহ এই নির্বিচারে মৃত্যুর পাল্টা কি তবে বিচারে মৃত্যু?
রাষ্ট্র মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার জন্য যে সকল পদ্ধতি গ্রহণ করা হয় তার মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো: ফাঁসি, শিরচ্ছেদ, ইলেকট্রনিক্স শক, রাসায়নিক ইনজেকশনের, ফায়ারিং স্কোয়াডের দ্বারা মাথার পিছনের অংশে গুলিবর্ষণ ইত্যাদি।
আমরা সবাই একটি বিষয়ে একমত যে, মানুষ মাতৃগর্ভ থেকে অপরাধী হয়ে জন্ম না। কিন্তু এটা অনেকেই বলে যে মানুষ জন্মগত ভাবে অপরাধপ্রবণ। অপরাধ সংগঠন নির্ভর করছে স্থান, কাল, পাত্র এবং সুযোগের ওপর। আত্মকল্যাণ বিরোধী কর্ম দ্বারা আত্মতৃপ্তি লাভ করাই মানুষের সহজাত ধর্ম।
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘নারী’ কবিতায় লিখেছেন, ‘পৃথিবীতে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’।
অপরদিকে পৃথিবীতে যা কিছু অকল্যাণকর, অনাচার, অনাসৃষ্টি সবকিছুর পিছনে রয়েছে এই অপরাধ প্রবণতা। সমাজ, সভ্যতা, মানবিক মূল্যবোধ, প্রেম-ভালোবাসা সব কিছুর শত্রু এই অপরাধ প্রবণতা।
আর এই অপরাধ প্রবণতা সমাজ ব্যবস্থা থেকে অপরাধ মুছে ফেলতে, চোখের বদলে চোখই কি একমাত্র সমাধান? এই প্রশ্নের উওর খুঁজতে কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয় আমাদের তাই দেখব।
ক্রিমিনলোজি ‘র ‘রিট্রিবিউটিভ জাস্টিস’ থিওরি যে কথা বলে সেটি হলো, শাস্তিকে হতে হবে অপরাধের ভয়াবহতার আনুপাতিক, যাতে করে এক ধরনের নৈতিক ভারসাম্য বজায় থাকে। খুনের ভারসাম্য বজায় রাখবে মৃত্যু। এক্সোডাস দাবি করেন “জীবনের বদলে জীবন, চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাতঁ”। (এক্সোডাস ২১:২২:২৩)।
উপরোক্ত যুক্তি দাঁড়িয়ে আছে সুতীব্র প্রতিশোধস্পৃহা, ঘৃণা ও ভয়ের মতো আদিম কিছু প্যাশন ও আবেগের উপর।
‘An eye for an eye’ এই বাক্যটি এসেছে ‘বাইবেল’ থেকে। সঙ্গে ‘বাইবেল’ এটাও রয়েছে যে, ‘Vengeance is mine, Says the Lord’ –‘ঈশ্বর বলেছেন যে, শাস্তি শুধু আমিই দিতে পারি’। তাই খুব সহজেই বলা যায় যে শাস্তি দেওয়া অধিকার আমাদের কারোই নেই। তবে অপরাধীকে আটকে রেখে সংশোধনের অধিকার রাষ্ট্রের আছে। তাই বুঝি রাষ্ট্রের প্রধান জেলখানার প্রধান ফটকের সামনেই বড় করে লেখা আছে “রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ”।
আমার মত অনেকেই মনে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, তবে কেন এখনো মৃত্যুদণ্ডের বিধান রহিত করা হয় নাই? নাকি তাঁরা ‘আলোর পথ’ বলতে মৃত্যুদন্ড দেওয়াকেই বুঝিয়েছেন!! আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে এটা বোধগম্য নয়। কারণ আলো আঁধারে খেলা চলছে সর্বত্র।
কারণ, ‘আলোর পথ’-কে তাঁরা এখনো সংশোধনের পথ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
বি: দ্র: ‘ওপারের পথ’ বলতে মৃত্যুর পথকে বুঝানো হলো।
আদালতে, ‘রেয়ারেস্ট অফ দ্য রেয়ার কেস’ হিসেবেই বিবেচিত হয় মৃত্যুদন্ড।
মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে জোরালো যুক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান যুক্তি হল, ‘এই শাস্তি শুধু অপরাধীকেই নয়, উদাহরণ সৃষ্টির মাধ্যমে এটা সম্ভাব্য অপরাধীদের সমজাতীয় অপরাধকর্ম থেকে বিরত রাখে। কিন্তু এই জোরালো যুক্তির বিপক্ষে অধিকতর জোরালো পাল্টা যুক্তিও রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা হয়, রানী প্রথম এলিজাবেথের সময় (১৫৩৩-১৬০৩) ব্রিটেনে পকেটমার অপরাধের শাস্তি ছিল মৃত্যুদন্ড। সেই সময় মৃত্যুদন্ড প্রকাশ্য স্থানে জনসম্মুখে কার্যকর করা হত। এর উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে দেখানো যে অপরাধী বা পকেট মারের অনিবার্য পরিণতি মৃত্যুদন্ড। কিন্তু চরম আশ্চর্যের বিষয় যে মৃত্যুদন্ড প্রদান অনুষ্ঠিত যে জনসমাগম হতো সেই সমাগমেও অনেকের পকেট মার যেত। এখানেই সুস্পষ্ট ধারণা করা যায় যে, জীবন্ত মানুষকে ছিন্ন-ভিন্ন করার শাস্তি অপরাধীদের মনে কোন প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করতে পারেনি।
ইতিহাসে সর্বপ্রথম মৃত্যুদণ্ডের বিধান রহিত করা হয় আমেরিকার মিশিগান রাষ্ট্র ১৮৪৬ সালে। এরপর ১৮৬৭ সালে ভেনেজুয়েলা এবং ১৮৭০ সালে নেদারল্যান্ডস সেই পথ অনুসরণ করে। ১৯৭০ এর দশকে সারা বিশ্বের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ড বিধান বিলুপ্ত করার হিড়িক পড়ে যায়। ১৯৮৬ সাল নাগাদ পৃথিবীর প্রায় ৬৪ টি দেশের বিচার ব্যবস্থা থেকে সকল প্রকার অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বিলুপ্ত করা হয়।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম একটি ধরন হলো রাষ্ট্র কর্তৃক সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান হিসেবে মৃত্যুদন্ডাদেশের আইন। ১৯৪৮ সালে সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত হওয়ার পর মাত্র ৮টি দেশ অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ডের বিধানকে বাতিল করে। ১৯৭৭ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬ তে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসেব অনুযায়ী, ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ১৪০টি দেশ সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান হিসেবে মৃত্যুদন্ডের আদেশকে বাতিল করে যা বিশ্বের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ দেশের সমপরিমাণ। তবে এ দেশগুলোর মধ্যে কেবল ১০২টি দেশ সকল প্রকার অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদন্ডের আইনকে বাতিল ঘোষণা করেছে।
সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক শ্রেণী কিংবা জাতিগত, বর্ণভিত্তিক অথবা ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী অধিক মৃত্যুদন্ডের শিকার হয় বিচারিক নিরপেক্ষতার অভাবে। মৃত্যুদন্ডের বিধানকে ইরান ও সুদান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক্ষেত্রে তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছে। এগুলো হলো: বিশ্বের যে সকল দেশে মৃত্যুদন্ডের বিধান রয়েছে তা রহিত করা, যে সকল দেশে মৃত্যুদন্ডাদেশ রহিতকরণ সম্পন্ন হয়েছে সে সকল দেশে এ বিধান চিরতরে বাতিল করা এবং সকল প্রকার মৃত্যুদন্ডের শাস্তিকে কারাদন্ডে রূপান্তরিত করা।
মৃত্যুদন্ডের শাস্তি মানেই রাষ্ট্র কর্তৃক একজন নাগরিকের বেঁচে থাকার অধিকার হরণ করা। এটি সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের দুটি বিধানকে সরাসরি লঙ্ঘন করে। প্রথমটি হল, জীবন ধারণের অধিকার এবং দ্বিতীয়টি, অত্যাচার থেকে মুক্ত হয়ে বেঁচে থাকার অধিকার। মৃত্যুদন্ডের বিধান একটি চূড়ান্ত ও অনড় শাস্তি। এর মাধ্যমে নিষ্পাপদের শাস্তি দেয়ার সম্ভাবনা সর্বদা রয়ে যায়। ১৯৭৩ পরবর্তী আমেরিকা-যুক্তরাষ্টে ১৫০ জন বন্দীকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় যারা পরবর্তীতে নির্দোষ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিলেন।
অভিজ্ঞতা বলে, মানুষ যে অপরাধ করেনি, তার জন্যও দন্ডিত হয়। তদন্তকারীরা অযোগ্য হতে পারে, তদন্ত হতে পারে অক্ষম ও অনুপযুক্ত। সাক্ষীদের ঘুষ দিয়ে, ভয় দেখিয়ে, সাক্ষ্য ম্যানুফ্যাকচার করে অথবা চেপে দিয়ে, পুলিশ ও প্রসিকিউটার সুবিচার থেকে কাউকে বঞ্চিত করতে পারে;অভিযুক্তের সমর্থনে দাঁড়াতে পারে অনুপযুক্ত বা যথেষ্ট প্রস্তুতিহীন আইনজীবী; সাক্ষীরা ভুল করতে পারে। এর মধ্যে যে কোনো একটি কারণে যদি কারও মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়ে যায়, তবে সেই ভুল আর সংশোধন করার উপায় নেই। মৃত্যু একটি চরম ও অন্তিম ঘটনা, যাকে উল্টে দেওয়া যায় না।
যে সকল আন্তর্জাতিক আইন যুদ্ধাপরাধ ব্যতীত অন্য সকল ক্ষেত্রে মৃত্যুদন্ডের বিধানের বিরোধিতা করে সেগুলো হলো- The Second Optional Protocol to The International Covenant on Civil and Political Rights, Protocol No: 6 to The European Convention on Human Rights, The Protocol to The American Convention on Human Rights to Abolish Death Penalty; তবে যুদ্ধাপরাধসহ সকল ক্ষেত্রে মৃত্যুদন্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে “Protocol No: 13 to The European Convention on Human Rights” আইনটি। বিভিন্ন দেশের আইন হত্যার মত অপরাধের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ডের বিধানের প্রয়োজনীয়তার যুক্তি দেখালেও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে এটি কোন সমাধান নয়।
মৃত্যুদণ্ডের ভয়ে অনেকেই অপরাধ করে না এমন অনেক মানুষ বলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন কোন পরিসংখ্যান বের করা কষ্টকর এবং প্রায়ই অসম্ভব যে তারা এটা সাপোর্ট করেন। তবে এটার উল্টো পরিসংখ্যান আছে, ১৯৯১ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত ‘ইউনাইটেড স্টেইটস অব আমেরিকা’ যেসব রাজ্যে মৃত্যুদণ্ড আছে সেখানে মার্ডার বেশি হয়েছে। অপরদিকে যেখানে মৃত্যুদণ্ড বাতিল সেখানে মার্ডার কম। এর থেকে এও প্রমাণ হয় না যে মৃত্যুদন্ড তুলে দিলে অপরাধ কমে যাবে। তবে হ্যাঁ মৃত্যুদন্ড ও অপরাধের যে কোন সরাসরি সম্পর্ক নেই সেটি অবশ্যই প্রমাণিত। উপরে এমন আরো প্রমাণ আমরা দেখেছি।
শেখ ফজলল করিম, একজন স্বনামধন্য বাঙালি সাহিত্যিক। তার লেখা কবিতার কয়েকটি লাইন,
“কোথায় স্বর্গ?
কোথায় নরক?
কে বলে তা বহুদূর?
মানুষেরই মাঝে স্বর্গ-নরক,
মানুষেই সুরাসুর”।
আশা করি সবাই কম আর বেশি উপরোক্ত কবিতা পড়েছেন।
আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি যে, জঘন্যতম অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদন্ড হচ্ছে ‘মুক্তি’। সেই যে ব্যক্তি জঘন্যতম অপরাধ করেছে তাকে তা উপলব্ধি ও অনুশোচনা করার সুযোগ দেওয়া উচিত।
তাই বলা যায় অপরাধীকে মৃত্যুদন্ড নয় বরং আমৃত্যু কারাদণ্ড দিলেই যথাযথ হয়। কারণ একমাত্র কারাদণ্ডভোগকারী ব্যক্তি অপরাধবোধ উপলব্ধি করতে পারে।
পক্ষান্তরে আজ যে সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক, কাল সে তা নাও থাকতে পারে। কারাদণ্ড পুনর্বাসনের সম্ভাবনাটিকে খোলা রাখে, কিন্তু মৃত্যুদন্ড রাখে না। তাই অপরাধীকে সংশোধনের সুযোগ অবশ্যই রাষ্ট্রের নিজ দায়িত্বে করে দিতে হবে।
তবে হ্যাঁ, যাদের কাছের মানুষ খুন হয়। তাদের প্রতি রাষ্ট্রের অবশ্যই সহানুভূতি ও শ্রদ্ধা থাকবে ও তাদের আবেগকে সম্মান করবে। কিন্তু শ্রদ্ধা, সম্মান ও সহানুভূতি মানে এই নয় যে রাষ্ট্র তাদের পক্ষে প্রতিশোধ নিতে নেমে পড়বে। সেই কাজ রাষ্ট্রের নয়।
বিজ্ঞ মানুষরা বলেন যে, রাষ্ট্রের কাজ একটি শ্রেয় নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করা। রাষ্ট্র যদি মনে করে একটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার হচ্ছে তাঁর সবচেয়ে বড় ও মুখ্য অধিকার। তাহলে একটি লোককে রাষ্ট্র কখনো মৃত্যুদন্ড দিতে পারে না।
এবার কেউ কেউ বলবেন যে, ক্রিমিনাল তো সে অধিকারকে সম্মান করেননি। ক্রিমিনাল তো সে রাইটর্সকে লঙ্ঘন করেছে। হ্যাঁ আপনি ঠিক বলেছেন। এর জন্যই তো সে ক্রিমিনাল। এখন প্রশ্ন হলো রাষ্ট্র কি কখনো ক্রিমিনাল কে অনুসরণ করতে পারে? যদি উওর ‘হ্যাঁ’ হয়! তবে রাষ্ট্র আর ক্রিমিনাল এর মধ্যে পার্থক্য থাকে না।
‘চোখের বদলে চোখ’ – এ যে একের বদলে এক করে নেওয়া। আপনি আমার ভাইকে মেরেছেন, আমি আপনার ছেলেকে মেরে শোধ নেব। এই প্রতিশোধের খেলায় একটি ঝামেলা হচ্ছে যে এটি কখনো এক এর ভিতর সীমাবদ্ধ থাকে না।
‘মহাভারত’ এ ‘দ্রোণাচার্য’র নেতৃত্বের অনেকজন মিলে অভিমন্যুকে হত্যা করে। তার বিপরীতে ‘যুধিষ্ঠি’-র ভাষার রাজনীতির আশ্রয় নিয়ে দ্রোণাচার্যকে হত্যা করেন। প্রতিশোধের নেশায় দ্রোণের ছেলে ‘অশ্বত্থামা’ রাতের অন্ধকারে পান্ডবদের ছেলেকে এবং আরো অনেকে হত্যা করেন। হত্যাকান্ড খবর ‘দ্রৌপদী’ শুনতে পেরে বললেন, “এখুনি অশ্বত্থামা কে হত্যা না করলে আমি প্রাণত্যাগ করিব”। এই যে প্রতিশোধের খেলায় মেতে উঠেছিল সবাই। এর কোন শেষ নেই। ‘মহাভারত’ আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, তুমি যদি একবার প্রতিশোধের খেলায় ঢুকে যাও! তবে তুমি জয়ী হও আর পরাজিত হও তোমার মধ্যে কোন পার্থক্য থাকবে না।
রাষ্ট্র ও অপরাধীর মধ্যে পার্থক্য কি?
শুনুন তবে বলি,
‘রাষ্ট্র’ বলতে এমন এক রাজনৈতিক সংগঠনকে বোঝায় যা কোন একটি ভৌগোলিক এলাকা ও তৎসংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার সার্বভৌম ক্ষমতা রাখে। রাষ্ট্র সাধারণত একগুচ্ছ প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ভৌগোলিক সীমার ভেতর বসবাসকারী সমাজের সদস্যদের শাসনের জন্য নিয়ম-কানুন তৈরি করে। যদিও একথা ঠিক যে রাষ্ট্র হিসেবে মর্যাদা পাওয়া না পাওয়া বহুলাংশে নির্ভর করে, রাষ্ট্র হিসেবে তার উপর প্রভাব রাখা ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির উপর।
‘অপরাধী’ হচ্ছে কোন ব্যক্তি কর্তৃক আইনবিরুদ্ধ কাজ। দেশ বা অঞ্চলের শান্তি -শৃঙ্খলা রক্ষার্থে প্রণীত আইন পরিপন্থী কার্যকলাপই অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
তাই আমি উপরোক্ত সংজ্ঞার আলোকে মনে করি যে, ‘রাষ্ট্র’ ও ‘অপরাধী’ কখনোই এক হতে পারে না। কিন্তু এখন অনেকেই রাষ্ট্র ও অপরাধীকে একই পাল্লায় মাপা শুরু করেছেন। এটা মনে করার অবশ্যই যুক্তিযুক্ত বহু কারণ বিদ্যমান।
বিখ্যাত এক মানুষ বলেছিলেন যে, একটা মানুষ যখন মানুষকে খুন করে এটা জঘন্য। আর রাষ্ট্র যখন মানুষকে খুন করে সেটা জঘন্যতম। তার কারণ রাষ্ট্র বলে দেয় যে তোমাকে মৃত্যুদন্ড (খুন) দেওয়া হবে এতদিন পর। আপনি নিজেই ভাবেন সেই ব্যক্তির মনের মধ্যে কি চলে? হয়তো সে এমনই ভাবে যে, “আর ৯দিন, আর ১ঘন্টা, খাবার সময় সে ভাবে এই তো শেষ খাবার খাচ্ছি, যখন মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়ার ৫মিনিট বাকি আর তাকে কালো মুখোশ পড়ানো হয়। তখন সে অবশ্যই ভাবে যে এই তো শেষ আলো দেখলাম! কতই না সুন্দর পৃথিবী”।
এই ভয়াবহ টর্চার থেকে কি আর নৃশংস কিছু হতে পারে? ভাবুন একবার!
‘চোখের বদলে চোখ’ এই যে প্রতিশোধের যুক্তিটি আছে। মূলত সমান সমান। ভাবনার বিষয় যে রাষ্ট্র যে ‘রিট্রিবিউটিভ জাস্টিস’ এর যুক্তির উপর ভিত্তি করে মৃত্যুদন্ড দিচ্ছে। এটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত। কারণ উপরোক্ত উদাহরণে দেখা যাচ্ছে যে রাষ্ট্র সমান শাস্তি দিচ্ছে না। বরং রাষ্ট্র বেশি শাস্তি দিচ্ছে এবং রাষ্ট্র সংশোধনের চেষ্টা একদমই করছে না। “যেহেতু শাস্তি পরিমাপক যন্ত্র এখনো আবিষ্কার হয়নি”।
আপনাদের হয়তো মনে হয় যে ঐ ক্রিমিনাল কি আর সংশোধন হয় নাকি? সে তো জঘন্য। আরে ভাই সেই ক্রিমিনাল একজন মানুষ, মশা নয়। কারণ মশার ধর্মই হচ্ছে রক্ত খাওয়া। পক্ষান্তরে মানুষের ধর্ম অবশ্যই অপরাধ করা নয়।
মনে রাখবেন ‘বেনিফিট অব ডাউট’ ব্যাটসম্যান কে দেওয়া হয়।
একটা মানুষকে কোন ধরনের সংশোধন হওয়ার সম্ভাবনাকে মেরে কোন রকম সুযোগ না দিয়ে তাকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক প্রশ্ন থেকেই যায়।
আমরা যে এত কথা বলি যে, ধর্ম-অধর্ম, মূল্যবোধ, দর্শন, ন্যায়-অন্যায় সব তো বলছি বেঁচে থাকার প্যারামিটারে।
যে মৃত্যু সম্পর্কে আমাদের নূন্যতম জ্ঞান নেই। মৃত্যু কি আমরা কি জানি নাকি রাষ্ট্র জানে? যে বিষয়ে আমাদের কারো সুনির্দিষ্ট ধারণা নেই। রাষ্ট্র জ্ঞান সম্পূর্ণ হওয়ার পরও কি করে বলে যে, তোমার মৃত্যুদন্ড কার্যকর হবে শীঘ্রই (কয়েকদিন পর থেকে তুমি আর থাকবে না) । আমি মনে করি যে শাস্তি রাষ্ট্র তাদের দিচ্ছে সেটা তো রাষ্ট্রের জ্ঞানের বাহিরে এবং রাষ্ট্রের এটা এখতিয়ারেও বাহিরে।
রাষ্ট্র যখন হিংসার আশ্রয় নেয়, তখন সে এই বার্তা পাঠায় যে হিংসাই হল সর্বশেষ সমাধান।
সাধারণত এমন সবাই বলে যে, মৃত্যুদন্ড উচিত। কারণ এটি আইন ও বিধি মোতাবেক। যে মানুষ অনেকগুলো মানুষ হত্যার নৃশংস অপরাধের সাথে জড়িত। তার মৃত্যুদন্ড হওয়াই উচিত।
কিন্তু আপনারা কি কখনো একটু অন্য দৃষ্টি থেকে দেখেছেন!
হয়তো না। কিন্তু চিন্তা করবেন না আমি সাহায্য করবো। আচ্ছা কখনো কি মনে হয়নি যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা বিনা কারণে অন্য রাষ্ট্রে যেয়ে বোমা ফেলে আসে। নির্বিচারে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় গুলি চালায় এবং দেশদ্রোহীর তকমা জুড়ে দিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে। উদাহরণ দিচ্ছি,
‘মুর্তজা মৃত্যুদন্ড ঠেকাতে সোচ্চার বিশ্ব’ – প্রবল সর্বাত্মকবাদী ও দমনমূলক সৌদি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে মাত্র ১০ বছর বয়সে সোচ্চার হয়েছিল মুর্তজা কুরেইরিস। আরব বসন্তের ঢেউ এসে নাড়া দিয়েছিল তার চৈতন্যে। ২০১১ সালে অহিংস প্রতিবাদী এক সাইকেল মিছিল থেকে মুর্তজা দাবি করে বসেছিল ‘মানবাধিকার’। সেই অপরাধের ‘প্রহসন’-এর বিচার শেষে সদ্য ১৮-তে পা রাখা সেই মুর্তজার ফাঁসি কার্যকরের অপেক্ষায় সৌদি আরব।
এ নিয়ে তোলপাড় চলছে বিশ্বজুড়ে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই সৌদি পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। রিয়াদকে এ মৃত্যুদন্ড কার্যকরের সিদ্ধান্ত থেকে বের করে আনতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছে তারা।
তার ফাঁসি কার্যকর হলে সৌদি আরবের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী কারও মৃত্যুদন্ড কার্যকর হবে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ১৮ বছর বয়সী মুর্তজার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হলে তা হবে বিশ্বের শিশুদের আইনি সুরক্ষার সব থেকে ভয়াবহ লঙ্ঘনের ঘটনা। আরবের দুর্নীতিপ্রবণ ও জনবিরোধী শাসকদের বিরুদ্ধে যখন বসন্তের ঢেউ খেলে গিয়েছিল, সে সময় সৌদি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল ১০ বছর বয়সী শিশু মুর্তজা কুরেইরিস। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে নিরস্ত্র অবস্থায় সাইকেল নিয়ে অহিংস প্রতিবাদে নেমেছিল সে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, তাকে ‘বিচারিক হত্যা’র বলি বানানোর অপেক্ষায় রয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১১জুন, ২০১৯)
যে রাষ্ট্র ব্যবস্থার মদদে গ্রামকে গ্রাম আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, মহিলাদের ধর্ষণ করে, শিশু-মহিলা ও বয়স্ক মানুষদের হত্যা করে। (৭১রে বরর্বতার কথা তো অবশ্যই মনে আছে আপনাদের)
আপনাদের কি মনে হয় সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থার ফাঁসি হওয়া উচিত?
যদি তাই হয়, তবে আমরা অতীতও দেখেছি এখনও দেখছি। অনেক রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র প্রধানের মৃত্যুদন্ড হওয়া উচিত।
আপনারা কি সেই আবেদন জানাতে পেরেছেন?
বিশ্বের সবচেয়ে নিষ্ঠুর শাসকের মধ্যে ‘এডলফ হিটলারের’ অবস্থান সবার শীর্ষে। এরপরই রয়েছেন সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘জর্জিয়ান জোসেফ স্ট্যালিন’। ইতিহাস এদের ভয়ঙ্কর সব অত্যাচারের সাক্ষী হয়ে আছে।
‘মাও জে ডং’ চীনে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসার পরে চীন গড়ে তোলার খাতিরে (তার মতে) কয়েক মিলিয়ন মানুষের প্রাণ নিয়েছিলেন।
তাঁরা প্রাণ নিতেই পারেন কারণ তাঁরা হলেন রাষ্ট্র নেতা। প্রাণ নেওয়ার অধিকার তার আছে। এটাকে কেউ অপরাধ বললে, যে বলবে তারও প্রাণ যাবে। যেমন ‘মুর্তজা কুরেইরিস’।
সুতরাং, হত্যা করলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে। কিন্তু শাসক বা রাষ্ট্র যদি প্রাণ নেয় তবে তা উন্নত সমাজ গড়ার খাতিরে হতে পারে। এতে কোন সংকোচ ও অনুশোচনা বোধ দরকার নেই। তাই তো ?
পরিশেষে বলতে পারি রাষ্ট্র ও অপরাধীর মধ্যে একটাই পার্থক্য লক্ষ্যণীয় যে, শুধু রাষ্ট্র বলে তার ক্ষমতার দাপট থাকবে। রাষ্ট্র চাইলেই ১০০ জন মানুষকে দেশের উন্নতির জন্য খুন করতে পারবে। আমরা প্রায়ই দেখে এসেছি যৌক্তিক আন্দোলনে গেলেই রাষ্ট্র ব্যবস্থা দ্বারা নানা রকম বাধা বিপত্তি মুখোমুখি হতে হয়।
রাষ্ট্র ও অপরাধীরা নিজের স্বার্থের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। পার্থক্য শুধু কেউ অপরাধীর তকমা পায় আর কেউ বীর উপাধি লাভ করেন।
কথিত আছে, ‘লঙ্কায় যে যায় সেই রাবণের ভূমিকা পালন করে’।
সব কিছুর ক্ষতিপূরণ সম্ভব। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের ক্ষতিপূরণ কখনোই সম্ভব নয়। তাই রাষ্ট্রকে মানবিক হতে হবে।
“অপরাধী লোকগুলো যদি কখনো মানুষ হওয়ার অধিকার হারিয়ে ফেলে। পক্ষান্তরে, রাষ্ট্রের কোন দিনই উচিত নয় মানুষ হওয়ার সুযোগ দেওয়ার উদারতা কমানোর”।
গান্ধীজি বলেছিলেন যে, চোখের বদলে চোখ নিলে পুরো পৃথিবী একদিন অন্ধ হয়ে যাবে।
আমারও একই মত যে হিংসা বিদ্বেষ ভুলে পৃথিবীটা হোক ভালোবাসার। কেবল ভালোবাসা দিয়েই একমাত্র এই পাথরের পৃথিবীতে ফুল ফোটানো সম্ভব।
তারপরও যারা ‘চোখের বদলে চোখ’ এই যুক্তিতে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। তাদের উদ্দেশ্য শেষ একটা উদাহরণ দিচ্ছি,
“একটি ছেলে যখন ভালোবাসায় প্রতারিত হয়, তখন তাঁর কি করা উচিত বলে মনে করেন? মানে বলতে চাচ্ছিলাম যে আপনার ‘চোখে বদলে চোখ’ এ যুক্তি মেনে চলবে কি সে? যদি, মানে, তবে, সে আবার তার প্রতারক প্রেমিকার ছোট বোনকে ভালোবাসার অভিনয় করে প্রতারণার শোধ নেবে! একের বদলে এক। এটাই আপনাদের সমাধানের পথ!
কিন্তু আপনি যদি বলেন যে না ‘চোখের বদলে চোখ’ কখনোই সমাধান হতে পারে না। আপনার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে যদি অহিংসার পাঠ পড়ান যে, ‘ক্ষমার কোন সীমা নেই’ এবং ‘অহিংসাই পরম ধর্ম’।
তবে সেই ছেলেটি অবশ্যই প্রতিশোধের খেলায় মেতে উঠবে না। সে অবশ্যই অন্য কোন মেয়ে খুঁজবে যিনি তাঁর মত ভালোবাসায় প্রতারিত হয়েছেন”। এটাই ভালোবাসা, এটাই মানবিকতার।
সর্বশেষে বলা যায় যে, আমাদের বিচার ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। সমস্যা কি তা বুঝতে হবে। দেশের আইন ব্যবস্থা অনেক ত্রুটিপূর্ণ। একই সাথে দেখা যায় যে সাধারণ মানুষ যথাযথ বিচার পায় না। বিচারিক খরচও অনেক বেশি। আর সরকারি আইন সেবাও সবার জন্য যথেষ্ট নয়। আর অনেক গুলো প্রশ্ন বরাবরই থেকে যায়, জেলখানা কি এখনো সংশোধনাগার হতে পেরেছে? তবে আইনের প্রতি অবশ্যই শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আশা করি অবশ্যই ‘একদিন আঁধার কাটিয়ে আলো আসবেই’।
তাই বারবার বলতে চাই যে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ড রহিত করা হোক। আর অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া হোক সাথে শোধরানোর সুযোগ। মৃত্যুদণ্ডের বদল অন্য যেকোনো শাস্তিই হোক অপরাধীর।
হিংসা, ঘৃণা ও প্রতিশোধ নিপাত যাক, ভালোবাসা ও মানবিকতা মুক্তি পাক।
লেখক:

রঞ্জন সরকার, শিক্ষার্থী, চতুর্থ বর্ষ, আইন ও মানবাধিকার বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি)