হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী: পাকিস্তানের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নাম । সাগর লোহানী

Comments

দেশবিভাগের পর প্রথম অবস্থায় হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী পাকিস্তানে আসেননি। মুসলিম লীগের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারক অর্থাৎ নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রের কর্ণধারদের সঙ্গে কখনোই তাঁর সুসম্পর্ক ছিল না। খাজা নাজিমুদ্দিন পূর্ববাংলার মূখ্যমন্ত্রী হবার পর বেশ কয়েকবার সোহরাওয়ার্দীকে “ভারতীয় এজেন্ট” এবং “পাকিস্তানের শত্রু” হিসেবে অভিহিত করেন।  এসময় ১৯৪৯ সালে সোহ্‌রাওয়ার্দী পাকিস্তানের স্থায়ী বাসিন্দা নন এ অজুহাতে লিয়াকত আলী খানের সরকার পাকিস্তানের গণপরিষদ থেকে সোহ্‌রাওয়ার্দীর সদস্য পদ খারিজ করে দেয়।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের প্রাক্কালে সোহ্‌রাওয়ার্দী সমগ্র বাংলা, আসাম ও বিহারের মানভূম, সিংভূম ও সম্ভবত পূর্ণিয়া জেলা সমন্বয়ে যে ‘বৃহৎ বাংলা’ নামে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং ভারত বিভাগের প্রাক্কালে বাংলা প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সোহ্‌রাওয়ার্দী শরৎচন্দ্র বসু, কিরণ শংকর রায়, সত্যরঞ্জন বক্শি প্রমুখ নেতাদের সহযোগে ভারত ও পাকিস্তানের পাশাপাশি অখন্ড স্বাধীন বাংলা হিসেবে তৃতীয় একটি ডোমিনিয়ন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন তা ব্যর্থ হলে এবং ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হলে তিনি তার সে স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দেন। ১৯৪৯ এ তিনি করাচী চলে যান।

বাংলা বিভাগের পর সার্বিকভাবেই একটি ভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি সম্মিলিত পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর আওতায় সমঅধিকার ও ক্ষমতার সমান অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বাঙালী ও অবাঙালী সমস্যার সমাধানের পথকেই যথার্থ বলে ভেবেছিলেন। তিনি পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে সমতার নীতি এবং পশ্চিম পাকিস্তান এক ইউনিট গঠনের একান্ত সমর্থক হয়ে উঠেছিলেন।

হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী ১৮৯২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এস.সি (সম্মান) ও বি.সি.এল ডিগ্রি লাভ করে লন্ডনের গ্রেইজ ইন থেকে বার-এট-ল সম্পন্ন করেন।

১৯২০ সালে ইংল্যান্ড থেকে ভারতে ফিরেই হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী পরিপূর্ণভাবেই রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯২৪ সালে কলকাতা কর্পোরেশনের ডেপুটি মেয়র, ১৯৩৭ সালের নির্বাচনোত্তর ফজলুল হক কোয়ালিশন মন্ত্রিসভার শ্রম ও বাণিজ্য মন্ত্রী, ১৯৪৩-১৯৪৫  সালে খাজা নাজিমউদ্দীন মন্ত্রিসভায় বেসামরিক সরবরাহ মন্ত্রী, ১৯৪৬-৪৭ সালে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, পাকিস্তান আমলে ১৯৫৪-৫৫ সালে মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভায় আইনমন্ত্রী এবং ১৯৫৬-১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী: মানসপুত্র নাকি বিশ্বাসঘাতক
পড়ুন

সোহ্‌রাওয়ার্দী একজন শ্রমিকনেতা হিসেবে কলকাতায় রাজনৈতিক কর্মজীবন শুরু করে স্বল্প সময়ের মধ্যে নাবিক, রেলকর্মচারী, পাটকল ও সুতাকল কর্মচারী, রিক্সাচালক, গাড়িচালক প্রভৃতি মেহনতি মানুষের প্রায় ৩৬টি ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯২৯ সালে তিনি বেঙ্গল মুসলিম ইলেকশন বোর্ড নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের আগে সোহ্‌রাওয়ার্দী কলকাতায় ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি নামে একটি দল গঠন করেন এবং নিজে এই দলের সম্পাদক হন। আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ভারতের মুসলমানদের একটি সর্বভারতীয় সংগঠন হিসেবে মুসলিম লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। সোহ্‌রাওয়ার্দী জিন্নাহর আহবানে সাড়া দিয়ে নিজের নবগঠিত দল নিয়ে মুসলিম লীগে যোগ দেন। প্রধানত সোহ্‌রাওয়ার্দীর সাংগঠনিক শক্তির সুবাদেই মুসলিম লীগ ভারতের সর্বমোট ১১ প্রদেশের মধ্যে কেবল বাংলায় সাফল্য অর্জন করে। ১২১ টি মুসলিম আসনের মধ্যে ৩৯ টি আসন পায় মুসলিম লীগ এবং ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন কৃষক-প্রজা পার্টির সঙ্গে কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠনে সমর্থ হয়। ১৯৩৭-৪৩ সালে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে সোহ্‌রাওয়ার্দী সমগ্র প্রদেশে দলকে সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। হক-বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে মাত্র ১৬ মাসের মধ্যে শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার (১৯৪১-১৯৪৩) পতন ঘটানোর ক্ষেত্রে তিনিই ছিলেন মূল শক্তি। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলায় মুসলিম লীগের বিজয়ের রূপকারও ছিলেন তিনি। সেই নির্বাচনে মুসলিম লীগ ১২১টি সংরক্ষিত আসনের মধ্যে জিতেছিল ১১৪টি আসনে।

বিভাগপূর্বকালে মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থরক্ষায় বরাবরই তৎপর সোহ্‌রাওয়ার্দী ১৯৩২ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত তৃতীয় গোলটেবিল বৈঠকে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি তাদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থারও অটল সমর্থক ছিলেন। জিন্নাহর উদ্যোগে ১৯৪৬ সালের ৭-৯ এপ্রিল দিল্লিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম আইন প্রণেতাদের কনভেনশনে গৃহীত আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের প্রস্তাবকও ছিলেন তিনি। সোহ্‌রাওয়ার্দী বাংলার মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে পাকিস্তানের দাবিতে মুসলিম লীগ কর্তৃক প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস (১৬ আগস্ট ১৯৪৬) পালনকালে কলকাতায় ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস’ হিসেবে পরিচিত এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয় যার দায় থেকে তিনি যেমন মুক্ত হতে পারেননি তেমনই এ দাঙ্গার দায় থেকে মুক্ত হতে পারেননি শ্যামা প্রসাদরাও। ভয়াবহ এ হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা প্রশমনে সোহ্‌রাওয়ার্দী মহাত্মা গান্ধীর সাহায্য চান এবং মহাত্মা গান্ধী যৌথ ভূমিকার শর্তে সোহ্‌রাওয়ার্দীসহ শান্তি মিশন শুরু করেন এবং মূখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি এসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মাসে পাকিস্তানের প্রধান বিরোধীদল আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। মওলানা ভাসানী হন এর সভাপতি। কিছু দিন পরে সোহ্‌রাওয়ার্দী আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেন। ৫২ –র ভাষা আন্দোলনের প্রাক্কালে তিনি এক বিবৃতিতে উর্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবার যোগ্যতা রাখে বলে উল্লেখ করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয় আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতা কর্মীরা। শেখ মুজিবুর রহমান ছুটে যান করাচীতে। শেখ মুজিব তার কাছে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার যৌক্তিকতা তুলে ধরলে সোহ্‌রাওয়ার্দী কিছুদিন পরে অপর এক বিবৃতিতে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে সমর্থন দেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ৭ বছরের মধ্যে ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে মুসলিম লীগ যুক্তফ্রন্টের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এই নির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রাদেশিক পরিষদের সর্বমোট ৩০৯ আসনের মধ্যে মাত্র ৯ আসন লাভ করে। নির্বাচনের এই ফলাফলে সোহ্‌রাওয়ার্দীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

সোহ্‌রাওয়ার্দী সাংবিধানিক শাসনে দৃঢ়বিশ্বাসী ছিলেন; আর এ কারণেই তিনি ১৯৫৪ সালে দলীয় আপত্তি উপেক্ষা করে মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভায় আইনমন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন। তিনি পাকিস্তানের ১৯৫৬ সালের সংবিধান প্রণয়নে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আইনমন্ত্রী থাকাকালে সোহ্‌রাওয়ার্দীর বলিষ্ঠ ও উদ্যোগী ভূমিকার সুবাদেই পাকিস্তানের দুই অংশের নেতৃবৃন্দের মধ্যে ১৯৫৫ সালে মারী চুক্তি সম্ভব হয় এবং এই চুক্তি পাকিস্তানের ১৯৫৬ সালের সংবিধান প্রণয়নের পথ সুগম করে। পাকিস্তানের এই সংবিধানেই অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা স্বীকৃতি পায়।

এসময়ে তিনি মার্কিন ঘেঁষা পাক পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রতিরক্ষানীতির সমর্থক হয়ে পড়েন। পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি এবং সিয়েটো, সেন্টো চুক্তি স্বাক্ষর হলে তার দল আওয়ামী লীগে এর প্রবল সমালোচনা ওঠে। তিনি এ প্রসঙ্গে দলের বিরুদ্ধ মতাবলম্বীদের আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে পাকিস্তানের সম্পৃক্ত হবার বিরোধীতা করে বলেন, শূন্য প্লাস শূন্য ইকুয়েলস টু শূন্য (০+০=০) । ফলশ্রুতিতে আওয়ামী লীগ ভেঙ্গে যায়। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে যান এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করেন। একই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী সোহ্‌রাওয়ার্দী নতুন সংবিধানে ৯৮% স্বায়ত্বশাসন দেয়াই হয়ে গেছে বলে উল্লেখ করে সমালোচিত হন।

১৯৫৮ সালে ইস্কান্দার মীর্জা পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারী করেন। ১৯৫৯ এর আগষ্টে ইলেক্টিভ বডি ডিসকুয়ালিফিকেশান অর্ডার অনুসারে হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দীকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। পাকিস্তান নিরাপত্তা আইনে রাষ্ট্রবিরোধী কাজের অপরাধ উল্লেখে তাকে ৩০ জানুয়ারি, ১৯৬২ তে গ্রেফতার করা হয় এবং করাচি সেন্ট্রাল জেলে অন্তরীণ রাখা হয়। ১৯ আগস্ট, ১৯৬২ তে তিনি মুক্তি পান। অক্টোবর, ১৯৬২ তে তিনি আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের উদ্দেশ্যে ন্যাশনাল ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট (এন ডি এফ ) গঠন করেন।

হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী লেবাননের রাজধানী বৈরুতে অবস্থানকালে ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।

 

লেখক:

সাগর লোহানী

 

সম্পাদক, বাঙালীয়ানা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.