হয় উপাচার্য সরান নয়তো বঙ্গবন্ধুর নাম সরান! । ইমতিয়াজ মাহমুদ

Comments

আপনারা বরং এক কাজ করেন, ঐ বিশ্ববিদ্যালয়টা থেকে বঙ্গবন্ধুর নামটা সরিয়ে দেন। কেননা আপনারা তো মনে হচ্ছে এই স্বেচ্ছাচারী ধরণের উপাচার্যকে সরাবেন না, তাহলে বরং “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়” এর নাম থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম সরিয়ে নিন। এইটাকে গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় নাম দেন, বা অন্য যে কোন কিছু, চাইলে এরশাদের নামও দিতে পারেন বা জিয়াউর রহমান- কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নাম নয়। বঙ্গবন্ধু বেচারা আমাদের জন্যে জীবন দিয়েছেন- যেন আমাদের একান্ত আপন যীশুটি, বাঙালীকে ভালোবেসে বাঙালীর পাপ মাথায় কাটার মুকুটের মতো ধারণ করে প্রাণ দিয়েছেন- তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে সেখানে এইরকম স্বেচ্ছাচার আর অগণতান্ত্রিক ফাজিল ধরণের আচরণ চালাবেন সেটা তো হয় না।

শোনেন, বঙ্গবন্ধুর জীবনের গল্প বলি। এখন তো ফ্রিডম পার্টি থেকে আর বিএনপি থেকে এসে আওয়ামী লীগের নেতা হওয়ার প্রথা চালু হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর গল্প এরা খুব বেশী করবে না। আমি বলছি, শোনেন।

বঙ্গবন্ধু তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র। আইনে সেকেন্ড ইয়ারে পড়েন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে অনার্স আর মাস্টার্স প্রোগ্রাম এখনকার মতো ছিল না, কিন্তু সাবজেক্টটা ছিল। ১৯৪৯ সনের কথা এটা। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা আন্দোলন করছিল কিছু ন্যায্য দাবীদাওয়া নিয়ে। বঙ্গবন্ধুসহ বেশ কয়েকজন ছাত্র নেতা সে সময় কর্মচারীদের এই আন্দোলনে সমর্থন জানায় আর তার কর্মসূচীতে অংশ নেয়। অনেক ছাত্রই অংশ নিয়েছিল সেই আন্দোলনে, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখন করলো কি বেছে বেছে পাঁচজন ছাত্রকে এই আন্দোলনে অংশ নেওয়ার ‘অপরাধে’ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শাস্তি প্রদান করা হয়।

পাঁচজন কে কে? একজন তো হলেন আমাদের শেখ মুজিবর রহমান, আর বাকি চারজন ছিলেন কল্যাণ দাশগুপ্ত, নাঈমউদ্দিন আহমেদ, নাদেরা বেগম আর আবদুল ওয়াদুদ। শাস্তিটা কি ছিল? শাস্তিপ্রাপ্তরা ১৫ টাকা করে জরিমানা দিবে আর সাথে ক্ষমা চেয়ে অভিভাবকদের মাধ্যমে মুচলেকা দিবে। তাইলে ওরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে। আর সেটা যদি না দেয় তাহলে ওদেরকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হবে। বাকি চারজনের কথা বাদ দিলাম, শেখ মুজিবর রহমান নামের সেই যুবকটি কি করেছিল অনুমান করেন তো? জ্বী, সেই যুবক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ক্ষমাও চায়নি, মুচলেকাও দেয়নি, জরিমানাও দেয়নি। মাথা উঁচু করে বলেছে, যা করেছি ঠিক করেছি, ন্যায় করেছি, ন্যায্য আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছি, বেশ করেছি।

আমাদের শেখ মুজিবর রহমানের আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শেষ করা হয়নি, আইন পাশ করা হয়নি। কিন্তু সেই যুবক গিয়ে বাঙালী নামক একটি জাতি প্রতিষ্ঠা করেছে এবং সেই জাতির জন্যে একটি জাতিরাষ্ট্র গঠন করেছে। আমরা এখন তাঁকে বঙ্গবন্ধু বলে ডাকি, জাতির পিতা বলি আর নিজেদের প্রয়োজনে মাঝে মাঝেই তাঁর নাম বিক্রি করি।

এখন আমাকে বলেন, বঙ্গবন্ধুর নামে যে বিশ্ববিদ্যালয় হবে, সেখানে কি কথায় কথায় ছাত্র ছাত্রীকে বহিষ্কার করা মানায়? জ্বী না, মানায় না। কেন? কারণ বঙ্গবন্ধু মানেই তো যৌবনের ঔদ্ধত্য, ঘাড় ত্যাড়া করে দুরন্ত অশ্বের মতো সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। এই লোকের নামে বিশ্ববিদ্যালয় বানাবেন আর ছাত্ররা আন্দোলন করবে না? এটা কি হয় নাকি? বরং যেসব ছাত্রছাত্রী নতজানু স্বভাবের, অন্যায় জেনেও মেনে নেয় আর ক্ষমা টমা চায়, তাদেরকে আপনি এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দিতে পারেন। কেন? বলা উচিত, তোমরা ভাই একটু সুবোধ ধরণের আছ, বঙ্গবন্ধু নামটার সাথে তোমাদের ক্যারেক্টার যাচ্ছে না, তোমরা অন্য কোথাও গিয়ে পড়।

বলতে পারেন যে ছাত্রদের তো শৃঙ্খলা মানতে হবে। হ্যাঁ, হবে। কিন্তু ছাত্রদের শৃঙ্খলা আর মিলিটারি পুলিশের শৃঙ্খলা তো ভাই এক না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা মানে কি? বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা মানে হচ্ছে ‘মানি না, মানবো না’। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম কানুন হচ্ছে যৌবন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ফিজক্যাল জেসচার হবে মেরুদণ্ড সোজা করে ঘাড় বাঁকা করে প্রশ্ন করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা কিছুই মানবে না- এইটাই তো নিয়ম। সকল প্রথা প্রতিষ্ঠান আইন কানুন শৃঙ্খলা সেগুলিকে যদি বুড়ো আঙ্গুলি না দেখাবে তাইলে তো ওরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যোগ্যই না।

আপনি বঙ্গবন্ধুর নামে বিশ্ববিদ্যালয় খুলবেন, আর সেখানে যৌবন জলতরঙ্গ খলবল করবে না সেটা কি করে হয়? দুরন্তপনার জন্যে যদি ছাত্রকে বহিষ্কার করা হয় তাইলে তো আপনি সেই পাকিস্তান আমলের বিশ্ববিদ্যালয়ই বানালেন- যারা বঙ্গবন্ধুকে বহিষ্কার করে। আপনি যদি বঙ্গবন্ধুকে একটুখানি কণামাত্রও বুকে ধারণ করেন তাইলে তো বলার কথা যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন ছাত্রকে আন্দোলন করা বা দুরন্তপনা করার জন্যে বহিষ্কার করা যাবে না। আপনার তো বলার কথা যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবক ডেকে তাদেরকে অপমান করা যাবে না। বঙ্গবন্ধুর নামে বিশ্ববিদ্যালয় হবে আর সেখানে ছাত্রকে বলা হবে ক্ষমা চাইতে বা মুচলেকা দিতে! এটা হয়? এটা হয় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার পাপ মোচনের উদ্যোগ নিয়েছে সেই ঘটনার প্রায় ষাট বছর পর। এই বছর আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট মিটিঙে ওরা বঙ্গবন্ধুকে বহিষ্কারের সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে। এতে করে ব্যক্তিগতভাবে বঙ্গবন্ধুর কিছু আসে যায় কিনা সেই কথা নয়, কিন্তু এই সিদ্ধান্তের ফলে যেই কথাটা প্রতিষ্ঠিত হল সেটা বুঝুন। এখন তো তাইলে আমরা বলবোই যে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা বা সমর্থন দেওয়ার কারণে ছাত্রদেরকে শাস্তি দেওয়া অন্যায়। যে ছাত্রদের মুচলেকা দেওয়া বা নতজানু হওয়ার আদেশ দেওয়া অন্যায়। বলবো না? এইটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আজকে। আর আপনারা তার উল্টোটা করবেন? তাও বঙ্গবন্ধুর নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে?

ধিক। ধিক।

সেইজন্যেই বলছি, হয় এই উপাচার্যটাকে সেখান থেকে তুলে এনে ছুঁড়ে ফেলুন অথবা বঙ্গবন্ধুর নামটা সরিয়ে দিন। এই উপাচার্য যা করছে ছাত্রদের সাথে, বঙ্গবন্ধুর নামের সাথে এটা যায় না, এটা বঙ্গবন্ধুর নামের অপমান, তাঁর জীবনের ও কর্মের ও আদর্শের অপমান। আপনারা বরং বিশ্ববিদ্যালয়টার অন্য কোন নাম দিন।

লেখক:
Imtiaz Mahmood
ইমতিয়াজ মাহমুদ, মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত ও বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.