তারেক-হারিসের যাবজ্জীবন, বাবর -পিন্টুর ফাঁসি

Comments

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং হামলার সময়ে বিএনপি-জামায়াত সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মামলার আরও ১১ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজার আদেশ দেওয়া হয়েছে।

ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন আজ সকালে যে কোনো সময় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা আলোচিত দুই মামলার রায় ঘোষণা করবেন। নাজিমুদ্দিন রোডের পুরাতন কারাগারের পাশের ভবনে এ আদালতের বিশেষ এজলাসে গত ১৮ সেপ্টেম্বর এ মামলার বিচার কাজ শেষ হয়।

রায়কে ঘিরে সকাল থেকেই নাজিমউদ্দিন রোড ও আশপাশের এলাকায় নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নিয়েছে।

এ মামলায়  আসামির সংখ্যা ৪৯। এই আসামিদের মধ্যে পলাতক রয়েছে ১৮ জন। বাকি ৩১ জন আটক রয়েছে। এই মুহুর্তে এই ৩১ আটক আসামীকে কাসিমপুর কারাগার থেকে এনে বক্সিবাজারে আলিয়া মাদ্রাসার মাঠে রাখা হয়েছে। মামলা শুরুর প্রাক্কালে এদের আদালতে হাজির করা হবে।

উল্লেখ্য, শনিবার, ২১ আগস্ট, ২০০৪, বিকেল বেলা। সন্ত্রাস ও বোমা হামলার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সমাবেশ। সমাবেশের প্রধান অতিথি ছিলেন সেই সময়ের বিরোধী দলের নেতা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। একটি ট্রাককে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ভাষণ শেষে বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দিয়ে ট্রাক থেকে নামতে যাবেন শেখ হাসিনা, ঠিক সেই সময়ে বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে শুরু হয় গ্রেনেড হামলা। টানা দেড় মিনিটে ১৩টি আর্জেস গ্রেনেডের (সমরাস্ত্র) বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা মানব প্রাচীর তৈরি করে তাদের নেতাকে রক্ষা করেন। রক্তে ভেসে যায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে  বিস্ফোরণে আহত-নিহতদের খণ্ডবিখন্ড দেহ। একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। ১৩টি গ্রেনেড বিস্ফোরণের বিভৎসতায় রক্ত আর লাশের স্তুপে পরিণত হয় সমাবেশস্থল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক কলঙ্কময় ঘটনা হয়ে থাকে এটি।

এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পর এই ঘটনায় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মামলা দিতে গেলে তৎকালীন পুলিশ সে মামলা নেয়নি। তার আগেই পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে মামলার তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়। জজ মিয়া নামের এক যুবককে ধরে নিয়ে এসে আদালতে মিথ্যা জবানবন্দি আদায় করা হয়। পরবর্তী সময়ে, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে মামলাটির নতুন করে তদন্ত শুরু করলে বের হয়ে আসতে থাকে একের পর এক সত্য। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে অধিকতর তদন্ত করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয়। তাতে বিএনপির নেতা তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ আরও অনেকের নাম চলে আসে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর ২২ আগস্ট, ২০০৪, দন্ডবিধির ১২০/বি, ৩২৪, ৩২৬, ৩০৭, ৩০২, ২০১, ১১৮, ১১৯, ২১২, ৩৩০, ২১৮, ১০৯ ও ৩৪ ধারা মোতাবেক মতিঝিল থানার এসআই শরীফ ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে একটি মামলা (নং-৯৭) দায়ের করেন। এরপর মামলাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা ব্যর্থ হলে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার মামলার পুনঃতদন্ত শুরু করে। অতঃপর, ৯ জুন, ২০০৮ সালে হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে সিএমএম আদালতে দু’টি অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন সিআইডির সিনিয়র এএসপি ফজলুল কবির। একই বছর মামলা দু’টির কার্যক্রম দ্রুত বিচার আদালত-১ এ স্থানান্তর করা হয়। এ আদালতে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের ২৯/১১ (হত্যা), ও ৩০/১১ (বিস্ফোরক) মামলা দু’টির বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সিআইডি এই মামলার অধিকতর তদন্ত করে এবং ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয়। এর ভিত্তিতেই, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনের পুরাতন একটি সরকারি ভবনে মামলার বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং মামলার বিচার শেষ পর্যায়ে আছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে। এছাড়াও, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্রুত মামলার নিস্পত্তির বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে আহতরা, নিহতদের স্বজনরা বয়ে বেড়াচ্ছে প্রিয়জন হারানোর শোক। রি-রোলিং মিলের ব্যবসায়ী নারায়ণগঞ্জের নিহত রতন শিকদার, শেখ হাসিনার তৎকালীন দেহরক্ষী নিহত মাহবুবুর রশীদ সহ ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। নিহত মাহবুবুর রশীদের সহধর্মিণী শামীমা আক্তার বলেন, ‘আজ তিন বছর ২১ আগস্টের অনুষ্ঠানে যাই না। আহত-নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সেখানে বসার জায়গা হয় না।’  সেদিনের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সবাই এর উপযুক্ত শাস্তি চান, তাঁদের অনেকেই বিচারের দীর্ঘসূত্রিতায় অসন্তোষও প্রকাশ করেন। এছাড়াও ক্ষতিগ্রস্তরা সরকারের কাছে উপযুক্ত সহায়তাও কামনা করেন।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.