৬৩ জেলায় সিরিজ বোমা হামলার ৪৯টি মামলার নিষ্পত্তি হয়নি আজও

Comments

১৭ আগস্ট জঙ্গিদের সিরিজ বোমা হামলার ১৪ বছর। ২০০৫ সালের এদিনে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬৩ জেলায় (মুন্সীগঞ্জ ছাড়া) জঙ্গি সংগঠন ‘জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ’ (জেএমবি) একযোগে বোমা হামলা চালায়। ৬৩ জেলার প্রায় পাঁচ শ’ স্পটে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দেয় জঙ্গি সংগঠন জেএমবি। এতে দু’জন নিহত ও শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়।

সেই হামলার পর সারাদেশে দায়ের করা ১৪৯টি মামলার মধ্যে ৯৩টির নিষ্পত্তি হয়েছে। ১৪৯টি মামলায় ১১০৬ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। বাকি ১০টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে ৯৩টির রায়ে মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে ৩৩৪ জনকে সাজা দেয় আদালত। তাদের মধ্যে ২৭ জনকে দেয়া হয় মৃত্যুদন্ড। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ৩৪৯ জন অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে। বিচারাধীন আছে ৩৮৬ জন। ১০টি মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট দিয়েছে পুলিশ। বাকি ৫৯টি মামলা এখনও বিচারাধীন রয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ৩১ জুলাই ফরিদপুরের একটি মামলায় ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

August 17_01

বিস্ফোরিত একটি বোমার অংশ

ফরিদপুরের সর্বশেষ রায়কৃত মামলাটি ছাড়া বিগত দু’বছরে মামলাগুলোর কোন ধরনের অগ্রগতি হয়নি। আদালত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে আসছে না, তাদের খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছে না, তাই মামলা ঝুলে আছে। অনেক মামলায় ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত জঙ্গিদেরও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরো জানা গেছে, সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় ঢাকায় দায়ের হওয়া ১৮টি মামলার মধ্যে ১১টির ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। ৫টি চলমান, আর ২টির রায় হয়েছে। এর মধ্যে তেজগাঁও মামলায় দুইজনকে ১০ ও ৭ বছর সাজা দেয়া হয়েছে। আর বিমানবন্দর থানার মামলায় একজনকে ১০ বছর সাজা দেয়া হয়েছে।

পুলিশ সূত্র বলছে, মামলা দায়েরের সময় কাউকে আসামি করা হয়নি, সব অজ্ঞাত ছিল। তাই তদন্ত করে করে অনেককে আটকের পর আসামি করা হচ্ছে। আর সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে না বলে মামলা ধীরগতিতে এগুচ্ছে। এজাহারে সাক্ষীর যে ঠিকানা রয়েছে সেই ঠিকানায় সাক্ষীদের পাওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া, বেশিরভাগ মামলা বাদী হচ্ছে পুলিশ। তাদের অনেকেই অবসরে গেছেন।

এইসব বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হোক তা চান সংশ্লিষ্ট মামলার আইনজীবীরা। তবে তারা এও বলেন, সাক্ষীর অনুপস্থিতির কারণে ও এজাহারে আসামি অজ্ঞাত থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া, এ ঘটনায় অনেক জঙ্গি জড়িত, যারা এখনও অধরা।

উল্লেখ্য, সিরিজ বোমা হামলার সময় জঙ্গিরা একটি লিফলেট ছড়িয়ে জানায়, ‘দেশে কর্মরত বিচারকদের প্রতি একটি বিশেষ বার্তা পাঠায়। দ্রুত এ দেশে ইসলামী হুকুম কায়েম করতে হবে। নতুবা কঠিন পথ বেছে নিতে বাধ্য হবে জেএমবি। ইসলামী হুকুম কায়েমের বিষয়ে তাদের সঙ্গে দেশ-বিদেশের অনেক শক্তিশালী দেশ ও শীর্ষ রাজনৈতিক দল একমত পোষণ করেছে। অতএব যারা বিচারক আছেন তারা তাগুতি আইন বাদ দিয়ে ইসলামী আইনে বিচার করবেন। নতুবা আরও ভয়াবহ বিপদ আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এ সতর্কবাণীর (সিরিজ বোমা হামলা) পর আমরা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করব। তারপর আবার হামলা শুরু হবে।

ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে সেই আত্মঘাতী হামলার পর সারাদেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক দেখা দেয়। বাংলাদেশ জঙ্গিকবলিত হয়ে পড়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আলোচিত হয়।

৬ শীর্ষ নেতার ফাঁসির পর জেএমবি  ২০১৪ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম আহমেদ চৌধুরীর হাত ধরে পুনঃযাত্রা শুরু করে। তার নেতৃত্বে গুলশান হলি আর্টিজান, শোলাকিয়াসহ দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে হামলা চালিয়ে দেশি-বিদেশি নাগরিককে হত্যা করে এই নব্য জেএমবি। ফলে ফের আটঘাট বেঁধে মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জঙ্গি দমন প্রসঙ্গে র‍্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা ইতঃমধ্যে গণমাধ্যমে বহুবার বলেছেন, পুরানো ও নব্য জেএমবির সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে দেয়া হয়েছে। তারাও পারস্পরিক নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানের কারণে সাংগঠনিকভাবে সংঘবদ্ধ হতে পারছে না। তবে তাদের অপতৎপরতা থেমে নেই। জেএমবির ছোট ছোট গ্রুপগুলো নাশকতা চালাতে ছক কষছে সারাক্ষণই। তবে বড় ধরণের হামলা চালাবার সক্ষমতা এখন আর নেই।

বাঙালীয়ানা/এসএল

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.