স্বস্তি ফিরল বাংলাদেশের ক্রিকেটে। প্রথম দফায় যে ১১টি দাবিতে দেশের ক্রিকেটেররা ধর্মঘট ডেকেছিলেন তার ৯টিই মেনে নিয়েছেন বিসিবি। ফলে পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর, ২০১৯ থেকে শুরু হচ্ছে ভারত সফরের কন্ডিশনিং ক্যাম্প। আর শনিবার থেকে মাঠে গড়াচ্ছে জাতীয় ক্রিকেট লিগের তৃতীয় রাউন্ডের খেলা।
বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন জানিয়েছেন প্রথম দফায় দেওয়া ১১টি দাবির যে দু’টিতে বিসিবি বুধবার রাতের সভায় সম্মতি দেননি তার একটি হলো- কোয়াবের পদত্যাগ আর অপরটি দুইয়ের অধিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট লিগ প্রসঙ্গে।
বিসিবি সভপাতি বলেন, ‘যে দাবিগুলো ওদের ছিল ওই ১১টার মধ্যে প্রথমটা (কোয়াবের পদত্যাগ) বলেছি এটা আমাদের বিসিবির কিছু করণীয় নেই। আর শেষেরটা (দুটোর ফ্র্যাঞ্চাইজি ) সম্পর্কে বলেছি এটা আমরা দেখব।’ তিনি বলেন, ‘যদি কেউ আসে কেইস টু কেইস। কারণ এখন পর্যন্ত আমাদের জানা মতে অনেক প্লেয়ার নেই যারা নাকি দুটোর বেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট পায়। যদি এমন হয় তখন আমরা দেখব কেইস টু কেইস। কিন্তু ঢালাওভাবে এখনই কিছু বলতে চাচ্ছি না।’
পাপন বলেন, ‘এনসিএল (জাতীয় ক্রিকেট লিগ) তৃতীয় রাউন্ড যেটা কালকেই শুরু হওয়ার কথা, এখন পর্য়ন্ত যেহেতু ওরা ওখানে যায়ইনি শুরু হবে কিভাবে? ওরা আসার আগে ঠিক করেছিলাম তৃতীয় রাউন্ড বাদ দিব। আর হবে না। কিন্তু ওরা বলছে ওরা খেলতে চায়। ওটা যদি পিছিয়ে করা যায় ওদের জন্য ভাল হয়। আমরা বলেছি ঠিক আছে শনিবার থেকে তৃতীয় রাউন্ড থেকে শুরু করব। আর জাতীয় দলের ক্যাম্প শুরু হবে ২৫ তারিখে। জাতীয় দলের সকলে ক্যাম্পে যোগ দেবে।’
এদিকে সন্ধ্যায় দ্বিতীয় দফায় যে ১৩টি দাবি নতুন করে্ উথ্থাপিত হয়েছে ১১টিই পুরোনো। নতুন ছিল কেবল দুটি। যার একটি হল, বিসিবির রাজস্ব ভাগ চেয়েছেন ক্রিকেটাররা। আর অপরটি ক্রিকেটে লিঙ্গ বৈষম্য দূরিকরণ। অর্থাৎ ছেলে ক্রিকেটাররা যে যে সুবিধা পাবে তা মেয়ে ক্রিকেটারদেরও দিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে অবশ্য এই মুহুর্তে কিছু জানাতে সম্মত হননি বিসিবি সভাপতি। ‘আরও দুটো দাবি নাকি এসেছে। আসলে ও দুটো নিয়ে আমরা আলাপ করিনি। আমি টিভিতে দেখেছি। আমি ওটা দেখিনি। শুনেছি যে লিগ্যাল কিছু একটি নোটিশ এসেছে। আমরা সাথে সাথে ওটা আমাদের লিগ্যাল অ্যাডভাইজর আছে তার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। কারণ লিগ্যাল কিছু আসলে আমরা তা ধরতে চাই না কথাও বলতে চাই না। বাড়তি যদি কিছু থাকে তা নিয়ে আলাপ হয়নি। কালকে পর্য়ন্ত যে ১১টা ছিল সেগুলো নিয়ে কথা বলেছি।’
এদিকে বিসিবি সভাপতির সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসু হয়েছে উল্লেখ করে টেস্ট ও টি টোয়েন্টি দলপতি সাকিব আল হাসান বলেন, ‘পাপন ভাই তো বলেই দিয়েছেন যে আলোচনা ফলপ্রসু হয়েছে এবং আমাদের দাবিগুলো ছিল বোর্ড প্রেসিডেন্টসহ পরিচালকরা সবাই শুনেছেন এবং আমাদেরকে আশ্বাস দিয়েছেন দ্রুততর সময়ে হওয়া সম্ভব সেটা তারা করবেন। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই জাতীয় লিগের প্লেয়াররা শনিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১৯ থেকে জাতীয় লিগ শুরু করছি এবং জাতীয় দলের প্লেয়াররা ২৫ অক্টোরবর থেকে ক্যাম্প শুরু করছি।’
এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটারদের তিন দিনের ধর্মঘটের অবসান হল। অবসান হল বাংলাদেশ ক্রিকেটের অচলাবস্থার। আবার মাঠ ফিরছে ক্রিকেট, মাঠে ফিরছেন ক্রিকেটাররা।
ক্রিকেটারদের ১৩ দফায় কী আছে?
০১. ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবের বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্তদের পদত্যাগ। ক্রিকেটাররা জানিয়েছেন কোয়াবের কোনো দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত কোনো সংঘাত নেই। কেবল স্বার্থের সংঘাত বন্ধ করতেই এই পদত্যাগ করতে হবে। উল্লেখ কোয়াবের দুই শীর্ষ ব্যক্তি বিসিবির পরিচালক। ঘরোয়া ক্রিকেটে বিভিন্ন ক্লাবের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট কোয়াবের নেতৃস্থানীয়রা। এর পাশাপাশি লিস্ট ‘এ’, প্রথম শ্রেণিসহ সব ধরনের পেশাদার ক্রিকেটারদের নিয়ে একটি আলাদা সংগঠন পেশাদার ক্রিকেট সংগঠন গঠন করার কথাও বলা হয়েছে। ১৯৬৭ সালে ইংল্যান্ডে ও ১৯৯১ সালে এমন সংগঠন গঠিত হয়েছে।
০২. ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগের আয়োজন আগের অবস্থায় নিয়ে যাওয়া। এখন যে পদ্ধতিতে প্রিমিয়ার লিগ আয়োজিত হয়, তাতে আছে ‘খেলোয়াড় ড্রাফট’ ও ‘পেমেন্ট স্ল্যাব’। এতে করে ক্রিকেটাররা নিজেদের ইচ্ছামতো ক্লাব বেছে নিতে পারেন না। চাহিদা অনুযায়ী বাজার মূল্যও নির্ধারণ করার অধিকার রাখেন না।
০৩. আগামী বিপিএলেও এই পদ্ধতি চালু করার কথা বলা হয়েছে। এতে খেলোয়াড়েরা নিজের ফ্র্যাঞ্চাইজি বা দল নিজেরাই বেছে নিতে পারবেন, বাজারদরও চাহিদা অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। বিপিএলে বিদেশি ও দেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে পারিশ্রমিকে বৈষম্য দূর করতে হবে। ক্রিকেটাররা বলেছেন, একটা স্বাধীন দেশে এই বৈষম্য অগ্রহণযোগ্য।
০৪. প্রথম শ্রেণির ম্যাচে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক ১ লাখ টাকা করা।
০৫. পারিশ্রমিক বছর শেষে পুনর্মূল্যায়ন করা। প্রথম শ্রেণির দলগুলোর কোচিং স্টাফ সারা বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া। খেলোয়াড়েরা যেন সারা বছর অনুশীলন করতে পারেন, সে ব্যবস্থা করা। প্রতিটি বিভাগে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা।
০৬. বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তিতে ন্যূনতম ৩০ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা।
০৭. লোকাল স্টাফ, গ্রাউন্ডসম্যানদের পারিশ্রমিক বাড়ানো। দেশি কোচদের বেতন বাড়াতে হবে।
০৮. লিস্ট ‘এ’, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেটে ম্যাচের সংখ্যা বাড়ানো। বিপিএলের পাশাপাশি আরও একটি ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট চালু করা।
০৯. ঘরোয়া ক্রিকেটের অপরিবর্তিত ক্যালেন্ডার নিশ্চিত করা। সারা বছর ক্রিকেটাররা খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। ঘরোয়া ক্রিকেটের সূচি নির্দিষ্ট থাকলে সে অনুযায়ী পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় নিশ্চিত করতে পারেন তারা।
১০. খেলোয়াড়দের সব পাওয়া টাকা-পয়সা সময়মতো নিশ্চিত করা। বিপিএল ও প্রিমিয়ার লিগের দলগুলো যেন খেলোয়াড়দের টাকা-পয়সা নিয়ে কোনো টালবাহানা না করে সে ব্যবস্থা করা।
১১. একজন খেলোয়াড়কে দুইয়ের অধিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট খেলার অনুমতি প্রদান। তবে এটা অবশ্যই জাতীয় দলের খেলা ও ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে দিতে হবে।
১২. ক্রিকেট-ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। বিসিবির রাজস্বের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের ক্রিকেট আর কয়েক বছরের মধ্যে ক্রিকেট দুনিয়ার দ্বিতীয় বড় বাজার হতে যাচ্ছে। অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটাররা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার রাজস্বের হিস্যা পায়। তবে এটি ক্রিকেটারদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় পদ্ধতি নিশ্চিত করা।
১৩. নারী ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। পুরুষ ক্রিকেটারদের সমান সম্মান ও তাদের পাওনা।
এই ১৩টি দাবির সঙ্গে আরও কথাবার্তা আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন ক্রিকেটারদের আইনি পরামর্শক ব্যারিস্টার মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, একজন ক্রিকেটার নিজেকে গড়ে তুলতে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেন। তিনি তাঁর একাডেমিক পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে ক্রিকেট খেলেন। সে কারণে অন্যান্য চাকরি বাকরি করার সুযোগও তাঁর কমে যায়। সঙ্গে চোট ও ফর্মহীনতার কারণে তাদের ক্যারিয়ার সংক্ষিপ্ত হতে পারে। চোটের চিকিৎসার জন্য বোর্ডের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর ক্রিকেটারদের নির্ভর করতে হয়। চিকিৎসা যেন নিশ্চিত হয় সে জন্য আলাদা কল্যাণ তহবিলও চেয়েছেন তারা।
ক্রিকেটাররা বলেছেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এই সুযোগ-সুবিধাগুলো খুব সহজেই নিশ্চিত করতে পারে। কারণ বিসিবির সেই আর্থিক সংগতি আছে। ক্রিকেটাররা খেদ প্রকাশ করে বলেছেন, মোটামুটি সচ্ছল ক্রিকেট বোর্ড হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশি বেতনভুক্ত ক্রিকেটারদের বেতন জিম্বাবুয়ে ও আয়ারল্যান্ডের চেয়েও কম। এ ছাড়া বিদেশের মাটিতে দৈনিক ভাতা নিয়েও ক্ষোভ ক্রিকেটারদের। জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটার বিসিবির কাছ থেকে বিদেশে খেলতে গেলে দৈনিক ভাতা পান ৫০ ডলার। অথচ, বিদেশে গেলে বোর্ড কর্তারা পান ৫০০ ডলার করে।
বাঙালীয়ানা/এসএল