১৯৬৩’র ৩১ অগাস্ট থেকে ২০১৩’র ৩০ মে, এই স্বল্প সময়েই তিনি নিজস্ব এক পথ নির্মাণ করেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্র জগতে। কিছুদিন বিজ্ঞাপন জগতে কাজ, কিছুদিন চলচ্চিত্র সাংবাদিকতা। ১৯৯২ তে প্রথম সিনেমা ‘হিরের আংটি’ কিন্তু ছোটদের জন্য। তারপরেই মোড় ঘুরে গেল। ১৯৯৪ এ ‘উনিশে এপ্রিল’, জাতীয় পুরস্কার দিয়ে জয়যাত্রা শুরু। তারপর আরও এক ডজন জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন ঋতুপর্ণ, পেয়েছেন অনেক আন্তর্জাতিক পুরস্কারও।

প্রথম থেকেই তিনি কথা বলেছেন ভিন্ন স্বরে। তাঁর সিনেমাগুলি ‘৯০ এর দশকের মাঝামাঝি থেকে নতুন শতকের প্রথম দশক জুড়ে যে সময়কালে বিস্তৃত তা এ বাংলায়, বিশেষত কলকাতায়, এক স্বপ্নভঙ্গের সময়, অবক্ষয়ের সময়, অন্য একদিকে আর্থিক লিবেরাইজেশন ও গ্লোবালাইজেশনের কারণে পণ্যমুখী এক জীবনধারার বিকাশের সময়। ঋতু আপাদমস্তক শহর কলকাতার চিত্রপরিচালক। শহরের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের জীবন তাঁর মূল ফোকাস। তাঁর সম্বন্ধে সমালোচকরা বলেন যে তাঁর সিনেমা মূলত শহুরে উচ্চমধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমকে ঘিরে আবর্তিত জীবনের কথা বলে। যার সত্যতা মেনে নিলেও বলতেই হবে তিনি এই নাগরিক জীবনের সম্পর্কের টানাপোড়েন, আবেগ ও যৌনতার জটিলতাকে তুলে এনেছেন সিনেমায় আর্ট ফিল্মের সূক্ষ্ম অনুভূতির সঙ্গে কমার্শিয়াল ফিল্মের প্রযুক্তি ও পরিবেশনার রসায়নে। একদিকে বৌদ্ধিক আবেদন অন্যদিকে কমার্শিয়াল বাংলা সিনেমার গল্পের সারল্যকে মিলিয়েছিলেন তিনি, সাধারণ বাঙালী দর্শককে ধরে রাখতে পেরেছেলেন নিজের কাজের জোরে। এই বিশিষ্ট শৈলী তিনি ধীরে ধীরে তৈরি করেছেন একে একে দহন, অসুখ, উৎসব সিনেমাগুলিতে, যা তাঁর শুরুর দিকের কাজ। আবার চোখের বালি, অন্তরমহল বা নৌকাডুবি, যেগুলো পিরিয়ড ফিল্ম সেখানে তাঁর কাজে ফুটে উঠেছে পুরনো বাঙালি এক নস্টালজিয়া। রবীন্দ্রনাথের চিত্রায়ন নিয়ে অবশ্য সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। মাঝখানে হিন্দিতে বা ইংরেজিতেও ছবি করেছেন, অমিতাভ বচ্চন, অপর্ণা সেন, মমতাশঙ্করের মত প্রথিতযশা অভিনেতাদের নিয়ে কাজ করেছেন। রেনকোট, বা দ্য লাস্ট লিয়র সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে।

বস্তুত সমালোচনা কখনই তাঁর পিছু ছাড়ে নি। ঋতুপর্ণর পরের দিকের কাজে ফোকাস থেকেছে মানবিক অন্তরঙ্গতা, যৌনতা, নারী এবং বিশেষত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের প্রান্তিক সত্ত্বার ওপর। এদের ব্যাক্তিত্বের, যৌনতার সামাজিক স্বীকৃতির অধিকারের কথা ক্রমশই বেশি বেশি করে তুলে এনেছেন তিনি। তাঁর নিজের ব্যক্তিসত্তাও এই সময় বেরিয়ে এসেছে খোলস ছেড়ে, অভিনয় করেছেন নিজে কৌশিক গাঙ্গুলির আরেকটি প্রেমের গল্প, বা সঞ্জয় নাগ পরিচালিত মেমরিজ অফ মার্চে। তাঁর শেষ ফিচার চিত্রাঙ্গদাও এই পর্যায়ের সিনেমা, যেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন মানুষের যৌন পছন্দ নিতান্তই তার ব্যক্তিগত বিষয়। ভারতের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে সমকামিতার নাগরিক অধিকার নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
সিনেমার বাইরে ১৯৯৭ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত আনন্দলোক ও পরে মৃত্যু পর্যন্ত সংবাদ প্রতিদিনের রোববার ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিলেন ঋতুপর্ণ। তাঁর লেখা সম্পাদকীয় ‘ফার্স্ট পার্সন’ কলাম হিসেবে পাঠকের নজর কেড়েছিল। শেষ ফিচারের পরিকল্পনা করছিলেন সত্যান্বেষী ব্যোমকেশকে নিয়ে। তার অকালপ্রয়াণ বাংলা সিনেমার এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে রয়ে গেল।
বাঙালীয়ানা/এসসি/এআর