তসলিমা নাসরিনের মরদেহও কী দেশে নিরাপদ?

Comments

। হাসান শান্তনু ।

‘আজ থেকে তসলিমা নাসরিন নিয়মিত ভাত রাঁধবে, ভাত বেড়ে স্বামীকে খেতে দেবে, পাখা নেড়ে তাকে বাতাস করবে।’ জগদ্বিখ্যাত লেখক তসলিমা নাসরিন কথাগুলো লেখেন ঢাকার ‘পূর্বাভাস’ পত্রিকায় (এখন প্রকাশনায় নেই), প্রয়াত সাংবাদিক মিনার মাহমুকে বিয়ে করার পর। কথাগুলো তিনি মন থেকে লিখেছিলেন কী না, তা অনেক পাঠকের পক্ষে জানা সম্ভব হয় না। তবে তাঁর সংসার করা হয়ে ওঠেনি। সংসার পরের কথা, লেখালেখির ‘অপরাধে’ স্বদেশে তিনি থাকতেই পারেননি। তসলিমা নাসরিনকে দেশ ছাড়তে হয়েছিলো বিএনপির সরকারের আমলে। তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার বেলায় বিএনপি ‘উগ্র মুসলমানদের মুখপাত্র’ হলে আওয়ামী লীগ ‘মুখোশ পরা নরম মুসলমানদের মুখপাত্র’। ধর্মপন্থী কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠন, দল এ ক্ষেত্রে যথারীতি আল-কায়েদা, আইএসের প্রতিনিধি। পরজীবী বামদলগুলো থাকে দুইকুলের সতীত্ব রক্ষায় প্রস্তুত পরীক্ষার্থীর ভূমিকায়।

কবি নির্মলেন্দু গুণ সাক্ষী, নির্বাসিত হওয়ার পর তসলিমা নাসরিন গোপনে একবার দেশে ফেরেন, আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে। ‘প্রগতিশীলতার টুপি পরা’ আওয়ামী লীগের প্রশাসন তখনো তাঁকে দেশে থাকতে একবারের জন্যও আশ্বাস দেয়নি। ২০২৩ সালের আগস্টে তসলিমা নাসরিনের জন্মদিনে ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম, “আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব তসলিমার প্রতি ‘বিরক্ত’। এ দলের সরকার তসলিমাকে দেশে ফেরাতে উদ্যোগ নেবে, তা আজকে জন্ম নেয়া গ্যাদা শিশুটাকেও বোঝানো অসম্ভব। জীবদ্দশায় তসলিমা নাসরিনের নিজের জন্মভূমিতে ফেরার মতো পরিবেশের সম্ভাবনা কোনোভাবেই নেই। তসলিমা নাসরিনের মরদেহ কী দেশে ফিরতে পারবে?” এখন আমরা নিশ্চিত হয়ে গেছি, তসলিমার মরদেহও এ দেশে নিরাপদ নয়।

একটা ঘটনা শোনা হোক। প্রয়াত মিনার মাহমুদ তখন সাংবাদিকতা ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে, ট্যাক্সি চালান। তাঁর সদ্য সাবেক স্ত্রী, লেখক তসলিমা নাসরিন প্রায় পৃথিবীজুড়ে তুমুল আলোচনায়। একদিন ট্যাক্সিতে উঠেন আমেরিকান দুই নারী, আলাপ করলে তারা জানতে পারেন চালক মিনার মাহমুদের বাড়ি বাংলাদেশে, তিনি সাংবাদিকতা করতেন। ওই দুইযাত্রী জানতে চান- তিনি (মিনার মাহমুদ) তসলিমাকে চেনেন কী না? ‘বিচিন্তা’র সাবেক সম্পাদক মিনার মাহমুদ জানান- ‘চিনি, তসলিমা আমার বউ ছিলো।’

তাঁর কথা শুনে দুই নারী ‘হেল্প, হেল্প’ বলে চিৎকার শুরু করেন। চালক ট্যাক্সি থামালে কয়েকজন এগিয়ে আসেন। দুই নারী অভিযোগ করেন- ‘চালক পুরো পাগল! তসলিমা নাসরিনের মতো বিখ্যাত নারী নাকি তাঁর স্ত্রী ছিলেন! ‘তসলিমা একবিংশ শতাব্দির মেয়ে, ভুল করে তাঁর জন্ম বিংশ শতাব্দিতে’- এ মূল্যায়ন প্রখ্যাত ছড়াকার অন্নদাশঙ্কর রায়ের। অথচ একবিংশ শতাব্দিতে এসেও নিজের দেশে তিনি ‘নিষিদ্ধ’। তাঁকে ‘সহ্য’ করা, তাঁর লেখার জবাব লেখার মধ্য দিয়ে দেয়ার মতো সহনশীল সমাজ নতুন শতাব্দিতে পা রেখেও নির্মাণ করতে পারেনি তাঁরই জন্মভূমি বাংলাদেশ। কী ভয়ানক লজ্জায় অনুজ্জ্বল বাংলাদেশের মুখ। এ বাংলাদেশের পরিবেশ এখন মৃতদের জন্যও ভয়ংকর।

শুধু তসলিমা নাসরিন, দাউদ হায়দারের মতো ব্যক্তিত্ব নন, পীর ফকির, সাধু, সন্যাসীদের মরদেহও এখন নিরাপদ নয়। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর কথিত ‘ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটি’র ব্যানারে একদল উন্মাদ রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে নুরুল হকের দরবারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করেন। গত ২৩ আগস্ট মারা যাওয়া নুরুল হকের মরদেহ কবর থেকে তুলে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোয়ালন্দ বাসস্ট্যান্ডের অদূরে পদ্মার মোড় এলাকায় নিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। ধর্মের নামে কী বর্বরতম উন্মাদনা!

নির্বাসিত কবি দাউদ হায়দার (প্রয়াত), মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত তসলিমা নাসরিনকে দেশে ফেরানোর দাবি গত কয়েক বছর ধরে ফেসবুকে কিছুটা জোরদার হয়েছে। মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসীরা এ দাবি কার কাছে জানাচ্ছেন, তা স্পষ্ট না জেনেই আমিও দাবির পক্ষে সমর্থন জানিয়েছি। এক এগারোর জরুরি অবস্থার সরকার ছিলো ‘নির্দলীয়’। ভোটের হিসাব-নিকাশ তাদের ছিলো না। ওই সরকার তসলিমা নাসরিনকে দেশে ফেরাতে পদক্ষেপ নিতে পারে, এমন আশায় বুক বেঁধে তখন পত্রিকার চিঠিপত্রের কলামে বেনামে অনেক লেখা পাঠিয়েছি। অবশ্য ওই সরকারের কর্তারাও ধর্মের বোরকা পরতে দেরি করেননি। রম্য ম্যাগাজিনে ছাপানো ব্যঙ্গচিত্রকে কেন্দ্র করে সরকার কী জঘন্য খেলাটা খেলে দৈনিক প্রথম আলোর বিরুদ্ধে। গ্রেপ্তার করা হয় ব্যঙ্গচিত্রের কার্টুনিস্ট আরিফুর রহমানকে।

যাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তসলিমা নাসরিনকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানিয়ে লিখছেন, তাঁদের বলছি, তাঁর এ দেশে আর ফেরা হয়ে উঠবে না, হয়তো মৃত্যুর পরও না। নোবেল শান্তিওয়ালা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের সরকার এর মধ্যে ‘বিশিষ্ট মুসলমানের’ রূপ ধরেছে, বাংলাদেশকে আসলে ওই পথেই টেনে নেয়া হচ্ছে। যে দেশে ‘ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটি’ মরদেহ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেয়, সেই দেশ অন্ধকারতম এক উপত্যকা।

লেখক:
Hasan Shantonu
হাসান শান্তনু
সাংবাদিক, লেখক; ঢাকা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট