বাংলার মানুষ যখন পাকিস্তানের ইয়াহিয়া, ভুট্টোর বর্বরতা ও নৃশংসতার নবতর উদাহরণ প্রত্যক্ষ করছে, পাকিস্তানী হায়েনাদের গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিশোধের তীব্র স্পৃহায় জ্বলছে তখন তারা মরণপণ লড়াইয়ে হানাদার বিতাড়নে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধে নেমেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষও শুধুমাত্র নৃশংসতার কথা শুনেই ক্ষুব্ধ হয়েছে পাকিস্তানী জান্তার উপর। তারাও বিশ্বের নব্য হিটলার ইয়াহিয়া/ভুট্টোর লড়াকু মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। কেউ ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে গান গেয়ে অর্থ সংগ্রহ করেছে, কেউ বুট পালিশ করে সেই টাকায় শরনার্থীদের মুখে আহার দিয়েছে, মারিও রয়ম্যান্সের মত কেউ শরনার্থীদের সাহায্যে চিত্রকর্ম জিম্মি করেছে, জ্যঁ কে পিআইএ এর বিমান ছিনতাই করে ফ্রান্স সরকারকে ভারতে অবস্থানরত বাঙালী শরণার্থীদের জন্য ২০ টন ঔষুধ ও ত্রাণসামগ্রী পাঠাতে বাধ্য করেছে তখন এদেশে অবস্থানরত অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক একজন উইলিয়াম আব্রাহাম সাইমন ওডারল্যান্ড অস্ত্র হাতে যুদ্ধের ময়দানে পৌঁছে গেছেন।
হল্যান্ডের রাজধানী আমস্টারডাম শহরে জন্ম নেয়া ওডারল্যান্ডের জন্ম ১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বরে। তার পিতৃভূমি অস্ট্রেলিয়া। জীবিকার তাগিদে ওডারল্যান্ড ১৭ বছর বয়সে লেখাপড়া ছেড়ে কিছুদিন জুতা পালিশের কাজ করার পর হল্যান্ডের বাটা কোম্পানিতে যোগ দেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্বালে জার্মান বাহিনী তার জন্মভূমি নেদারল্যান্ড বা হল্যান্ড আক্রমণ করলে ওডারল্যান্ড চাকরি ছেড়ে ডাচ সেনাবাহিনীতে গেরিলা কমান্ডো হিসেবে সার্জেন্ট পদে যোগ দেন ১৯৩৬ সালে।
১৯৪০ সালে জার্মান বাহিনীর বিমান হামলায় হল্যান্ডের রটারডাম শহর বিধ্বস্ত হয়ে যায়, হল্যান্ড দখল করে হিটলার। ওডারল্যান্ড বন্দি হন জার্মানদের হাতে। কিন্তু বন্দিশিবির থেকে পালিয়ে আবার যোগ দেন ডাচ-প্রতিরোধ আন্দোলনে। ডাচদের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জার্মান ভাষা রপ্ত ছিল তার। সেই সুবাদে তিনি জার্মানদের গোপন আস্তানায় প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যান। কাজ করতে শুরু করেন ডাচ আন্ডারগ্রাউন্ড রেজিসট্যান্স মুভমেন্টের গুপ্তচর হিসেবে। ১৯৪৩ সালে আবার ডাচ কমান্ডো বাহিনীতে যোগ দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করেন বীরত্বের সঙ্গে। যুদ্ধ শেষে ওডারল্যান্ড পুরনো চাকরিতে ফিরে যান।
১৯৭০ সালের শেষের দিকে ওডারল্যান্ড বাংলাদেশের ঢাকার বাটা কোম্পানীর প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে নেদারল্যান্ড থেকে পূর্ব পাকিস্তানে আসেন এবং ১৯৭১ এর ফেব্রুয়ারী মাসে দায়িত্ব পান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের। টঙ্গীর বাটা স্যু ফ্যাক্টরী তার কর্মস্থল।
১৯৭১ সালের ৫ মার্চ টঙ্গির মেঘনা টেক্সটাইল মিলের সামনে শ্রমিক-জনতার মিছিলে ইপিআর-এর সদস্যদের গুলিবর্ষণের ঘটনা, মার্চের গণ আন্দোলন, ২৫শে মার্চ কালরাত্রিতে নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, বর্বরতা ওডারল্যান্ড প্রত্যক্ষ করেন। অপারেশন সার্চলাইট এবং তৎপরবর্তী কালে পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর পৈশাচিকতা, নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও নৃশংস বর্বরতা দেখে তিনি যে শুধু মর্মাহত হন তাই নয় গণহত্যা তাকে ক্রুদ্ধ করে। ওডারল্যান্ড বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলেন।
নির্যাতিত সাধারণ মানুষ এবং আশ্রয়প্রত্যাশী মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে গোপনে তিনি বাটা ফ্যাক্টরীর দ্বার অবারিত করে দিলেন। আশ্রয়, চিকিৎসা, খাদ্য সরবরাহ তার নৈমিত্তিক কাজে পর্যবসিত হলো।
তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা তৈরি করলেন। বাটা কোম্পানীর মত একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও একজন বিদেশি নাগরিক হওয়াতে পশ্চিম পাকিস্তানে অবাধ যাতায়াতের সুযোগ ছিল তার। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বাটার পার্সোনাল ম্যানেজার কর্নেল (অব.) নেওয়াজকে কৌশলে কোম্পানীর কাজে ঢাকায় ডেকে আনলেন। অবসরপ্রাপ্ত কর্নেলকে ব্যবহার এবং নিজের যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জেনারেল টিক্কা খান, জেনারেল নিয়াজী, জেনারেল রাও ফরমান আলী, প্রমুখ, যারা মূলত পূর্ব পাকিস্তানে হামলা ও গণহত্যার প্রধান কর্তা ছিল তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরী করলেন।
নিয়াজীর ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়ার্টার ওডারল্যান্ডকে ‘সম্মানিত অতিথি’ হিসাবে সম্মানিত করা হল। এই সুযোগে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সব ধরনের ‘নিরাপত্তা ছাড়পত্র’ সংগ্রহ করে ফেললেন। ফলে সেনানিবাসে যখন তখন যত্রতত্র যাতায়াতে তার আর কোন অসুবিধা থাকল না। বরং তিনি প্রায়ই সেনানিবাসে সামরিক অফিসারদের আলোচনা সভায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়ে গেলেন।
এসময় তিনি পাকহানাদারদের গোপন সংবাদ সংগ্রহ করে এবং তা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাটার বিশ্বস্ত কর্মচারীদের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাঠাবার ব্যবস্থা করতে থাকলেন। রক্তে যার অত্যাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নেশা তার শুধু কি আশ্রয় দিয়েই তৃপ্তি হয়? এ সময় প্রত্যক্ষ যুদ্ধে জড়িত হয়ে পড়লেন ওডারল্যান্ড। মুক্তিযুদ্ধকালে বর্বর হানাদারবাহিনীর অনেক গোপন, কৌশলগত, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও যুদ্ধ পরিকল্পনার সংবাদ সগ্রহ করে মুক্তিবাহিনীদের জানাতে শুরু করলেন। ফলে ২নং সেক্টরের গেরিলারা খুব সহজেই অতর্কিত হামলায় টঙ্গী-ভৈরব সড়ক ও রেললাইনের অনেকগুলো ব্রিজ, কালভার্ট ধ্বংস করে হানাদার বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিতে সক্ষম হলো।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুধু কমান্ডো ছিলেন না তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত গেরিলা, ছিলেন একজন অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ। তাই বাটা কারখানা ও কয়েকটি গোপন আস্তানায় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়ের পাশাপাশি অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করে এবং গেরিলাদের তা ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দিয়েও সহায়তা করেছিলেন ওডারল্যান্ড।
এছাড়াও বর্হিবিশ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে জনমত গড়ে তুলতে ১৯৭১ সালে গোপনে বাংলাদেশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বর্বরতার অনেক ছবি তুলে পাঠিয়ে ছিলেন তিনি।
১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবার পর ওডারল্যান্ড ঢাকায় নিজ কর্মস্থলে যোগদান করেন এবং ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করে অবসর নিয়ে নিজদেশ অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যান।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণের কারণে বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘বীরপ্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গর্ব করে নামের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া বীর প্রতীক খেতাবটি তিনি ব্যবহার করতেন।
উইলিয়াম আব্রাহাম সাইমন ওডারল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরের একটি হাসপাতালে ২০০১ সালের ১৮ মে মৃত্যুবরণ করেন।
বিশ্ব মানবতার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ এই মানুষটি যিনি এক জীবনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিজ জন্মস্থান নেদারল্যান্ডের জন্যে হিটলার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন এবং ১৯৭১ সালে শুধুমাত্র কর্মসূত্রে পরিচিত বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির যুদ্ধে নব্য হিটলার ইয়াহিয়া বাহিনীর বিরুদ্ধেও সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, যেমন বহু দেশের বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলেন চে গুয়েভারা।
লেখক: সাগর লোহানী, সম্পাদক, বাঙালীয়ানা
অগ্নিঝরা একাত্তরের দিনগুলো, পড়ুন
ডিসেম্বর ১৯৭১
নভেম্বর ১৯৭১
অক্টোবর ১৯৭১
সেপ্টেম্বর ১৯৭১
আগস্ট ১৯৭১
জুলাই ১৯৭১
জুন ১৯৭১
মে ১৯৭১
এপ্রিল ১৯৭১
মার্চ ১৯৭১