বৈশাখের ডাক
গোলাম কিবরিয়া পিনু
বৈশাখ আমাকে ডাকে
বলছে—
আমার রোদ নাও!
তুমি স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছো কেন?
আমার ঘূর্ণিবায়ু নাও!
তুমি ম্যাদামারা হয়ে আছো কেন?
আমার মেঘের গর্জন নাও!
তুমি ক্ষোভহীন হয়ে আছো কেন?
আমি তো প্রাণীকুলের নতুন দিন নিয়ে আসি!
আমি তো উদ্ভিদকুলের নবীনতা নিয়ে আসি!
আমি তো কৃষিজীবীর বীজ বহনের স্বপ্ন নিয়ে আসি!
বৈশাখ আমাকে ডাকে
বলছে—
আমার ঊষালোক নাও!
তুমি অন্ধকূপে অন্ধ হয়ে আছো কেন?
আমার বায়ুহিল্লোল নাও!
তুমি ভগ্নচিত্ত নিয়ে অসাড় হয়ে আছো কেন?
আমার ঐতিহ্য নাও!
তুমি গৌরবহীন হয়ে আছো কেন?
আমি তো অগ্রবর্তীকাল নিয়ে আসি!
আমি তো নবীনত্ব নিয়ে আসি!
আমি তো সম্ভাবনা নিয়ে আসি!
বৈশাখ আমাকে ডাকে
বলছে—
আমার ঝুলনপূর্ণিমা নাও!
তুমি কালিঝুলিতে ঝুলে আছো কেন?
আমার ঝড়বাদলের বৃষ্টি নাও!
তুমি ধূলিধূসরিত শুষ্ক হয়ে আছো কেন?
আমার চমকানো বিদ্যুৎ নাও!
তুমি ক্লেশ ও অবসন্ন হয়ে আছো কেন?
আমি তো নিজের ধরণীতলে আসি!
আমি তো নিজের কুসুমকোরকে আসি!
আমি তো নিজের বৈভবে আসি!
বৈশাখ আমাকে ডাকে
বলছে—
আমার মেলার বাঁশী নাও!
তুমি সুরহীন হয়ে আছো কেন?
আমার উৎসবের আনন্দ নাও!
তুমি প্রফুল্লহীন হয়ে আছো কেন?
আমার ভূগোল ও ভাষা নাও!
তুমি পরিচয়ে কুণ্ঠিত হয়ে আছো কেন?
আমি তো প্রতীতি জন্মাতে আসি!
আমি তো অভ্যুদয় ঘটাতে আসি!
আমি তো ভিত্তিমূল দৃঢ় করতে আসি!

দিও
ভাস্কর চৌধুরী
কিছু দিয়ে যেও
কিছু রেখে যেও
কিছু কষ্ট ভুল করে
নিয়ে যেও না।
ওরা থাকুক
তোমার গন্ধ যেমন আছে
তোমার স্মৃতি যেমন আছে
তোমার দেয়া কথারা আছে
ওঁরাও ঘরের ভেতর থাকুক।
আমার একা বাসের
একটা বন্দোবস্ত করে যেও
যাবার আগে বাঁচার একটা
ফর্দ বানিয়ে রেখে যেও।
পাখিগুলো এসে তোমাকে খুঁজবে
ওরা তো আমার সাথে কথা বলে না।
ওরা কি তোমাকে না পেয়ে কেঁদে কেঁদে
ফিরে যাবে?
বিড়ালের কি করে যাবে?
সন্ন্যাসিনী দুপুরে এলে আমি
কি করতে পারি বলে যেও।
মায়ের মৃত্যুদিনে গরীবের হক
সামলাবে কে? বলে যেও।
তোমার শীতের কাপড় নিতে
ভুল করো না।
আর প্রথম ঈদের শাড়ি খানা
নিয়ে যেও।
কতদূর যাবে?
ফেরার ট্রেন ঠিক ফিরে আসে।
মনে রেখো।
আমাকে নয়
তোমার পাখি, বিড়াল, মায়ের মৃত্যুদিন
সন্ন্যাসিনী, পাড়ার গরিব
এদের কি হবে?
একবার ভেবে দেখো।
ফেরার ট্রেনের কথা মনে রেখো।
মনে রেখো।

প্রভু রাত যে গেল
নাসরীন জাহান
ঘুম না এলে প্রভাতের দরজা খুলে দাও,
জীবনের অমৃত পান করো,
আর প্রান্তরের ফুলের সুবাস নাও,
পাখির ডানার সঙ্গীত হও,
ফিনকি ওঠা ছায়া হও, প্রেমের
আসরে একা হয়ে যায় সবাই, তাই প্রহরকে
কাটতে চেয়ো না কিছুতেই। সময় যাপন
করতে করতে গাও, প্রভু রাত যে গেল,
ভোর আসিল জগৎ দেখাও আমারে,
প্রেমে প্রান্তর হয়ে নিজেকে বিছিয়ে
দাও দেহকাব্যে, আর এমন ফুল হয়ে ফোটো,
যেন যে আসে ঘ্রাণের সাথে জড়িয়ে থাকে সে,
যেন, মনের অমৃত খুঁজে পায়নি যে,
নিজেকে ভুলে আজীবন হেঁটে হেঁটে
নিজের দরজায় ভুল কড়া নেড়ে গেছে,
অনন্ত যৌবন যার নিজেকে খুঁজতে খুঁজতে
ভেতর বাহির হয়েছে, হতাশায় সে সমুদ্রের
মোচড় দিয়ে ওঠা জলে নিজেকে ভাসাতে গিয়ে,
অশরীরী ঘ্রাণ পায় এবং
সেই ফুলে বুঁদ হয়ে সে বলে, এইতো এসে গেছি।

সত্যের প্রপঞ্চ
কামরুল বাহার আরিফ
পৃথিবী যে গোল! এ সত্য জানতে
মানুষ কতদিনই না অপেক্ষা করেছে
মানুষেরই জন্ম কবে হয়েছিল, সে সত্য
আজও নির্দিষ্ট হয়নি। বিতর্ক আছে
ধর্মে-অধর্মে, বিজ্ঞানে অবিজ্ঞানে।
তবে যে সত্যকে সত্য বলতেই হয়—
তা হচ্ছে, মানুষের জন্মের আগেই
আবাসযোগ্য এ পৃথিবীর আবির্ভাব ঘটেছিল,
তারও বহু পরে এই মনুষ্য সৃষ্ট—ধর্ম ও বিজ্ঞান।
সে হিসেবে সব সত্য উড়িয়ে দিয়ে
যে সত্য এখনও বহাল—তা হচ্ছে,
মানুষের জন্মের পরেই সৃষ্ট হয়েছে যত রহস্য,
যত ধর্ম এমন কী পৃথিবী গোলের সত্যটাও।
মানুষের জন্ম না হলে ঈশ্বরেরও সৃষ্টি হতো না।

পয়লা বৈশাখের চিঠি
অর্ঘ্য রায় চৌধুরী
ভোরের আলোয় সাঁতার কাটছে ঝরে পড়া পাতা
দূর থেকে ডাক ভেসে আসছে
কারা যেন গান গেয়ে গেল
কোকিলের শহর ছেয়ে গেছে আলোর পোস্টারে
আজ পথে বের হবো
আজ সব ভুলে গিয়ে আরো একবার
তোমাকে বুকে জড়িয়ে ধরব
আমাদের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ
আমাদের বাঙালিয়ানার উদযাপন শুরু হবে
সীমান্ত থেকে ভেসে আসবে রজত হাতছানি
বন্ধুর বাড়ি, শান্ত দিঘির পারে বৈশাখের দুপুর
আমরা আরো একবার
ফেলে আসা দিনের মতো হেসে উঠবো একসঙ্গে।

উপলব্ধি
শামীম আজাদ
নদীর পা’য়ে পলক ফেলছি
রোদজলে হাড় মাথা দাঁত পা
জলের জানালায় কে দাঁড়িয়ে ওখানে
বুঝতে পারছি না।
ডি ভিটামিনে ভালো করে ভিজে
হাড়গুলো পাড়ে উঠলেই
পূণর্স্থাপনে আঠার বদলে
ঐ রোদ কাজে লাগবেই।
জানালার তুমি, কি করিছো বলো
জল কি এসেছো মাপিতে
তারও যে স্নায়ুতে ব্যথা ও কান্না
তাহা কি পেরেছো বুঝিতে!
প্রকৃতিরও গা মানুষের মতন
মানুষের মতই প্রকৃতি
বস্ত্র ও শাস্ত্র তুলে নিলে পাবে
সবার সমান মুরতি॥
