সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও মিলনের বার্তা নিয়ে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটিতে বর্ষবরণের বর্ণময় সাংস্কৃতিক শোভাযাত্রায় শামিল হলেন কলকাতাসহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলার অগণিত মানুষ। এদিন অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সমন্বয়ী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গৌরবোজ্জ্বল উত্তরাধিকার নিয়ে পথে নামেন শিল্পী, সাহিত্যিক, কলাকুশলী, অধ্যাপক, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, যুব, মহিলা, সমাজকর্মী, গণআন্দোলনের নেতা-কর্মীসহ সমাজের নানা অংশের মানুষ। এদিন কলকাতা মহানগরীর উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তে দু’টি পৃথক সাংস্কৃতিক পদযাত্রা ও মঙ্গল শোভাযাত্রা সংগঠিত হয়েছে। উৎসাহ, উদ্দীপনায় ও স্বতঃস্ফূর্ততায় পরিপূর্ণ এই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা দুটি রংবেরঙের মুখোশে, রঙিন নিশান, প্ল্যাকার্ড এবং সংগীতে, নৃত্যে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল।


আঁধার ক্লিন্ন সময়কে দূরে সরিয়ে ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী ও উগ্র ধর্মান্ধ অপশক্তির বিনাশ ঘটাতে প্রগতির পথিকদের আরও হৃদয়ের বন্ধনে বেঁধে বেঁধে থাকার বার্তা দিয়েছে এদিনের মঙ্গল শোভাযাত্রা। সেই সঙ্গে বাংলার চিরন্তন ঐতিহ্যের পথ বেয়ে সকল বিভেদ-দৈন্য, অন্যায় অবিচার, কুসংস্কার, হিংসা, বিদ্বেষ ঘুচিয়ে সাম্য-মৈত্রী-সম্প্রীতির বাণী ছড়িয়ে আলোর অভিযাত্রায় অগ্রগামী হবার অঙ্গীকার ধ্বনিত হয়েছে নববর্ষের সাংস্কৃতিক শোভাযাত্রায়। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার পাশাপাশি যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তির চিরায়ত বার্তাও বাঙ্ময় হয়েছে এদিনের মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে।

” আবার আসিব ফিরে
ধানসিঁড়িটির তীরে
এই বাংলায় “
অভিন্ন বঙ্গ সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান জল, জলের ধারা। নদীবিধৌত এই বঙ্গদেশে আদি অনন্তকাল ধরে ছোটো বড়ো হাজারো নদী। কোথাও পদ্মা-গঙ্গার আদিগন্ত বিস্তার, কোথাও মেঘনা-যমুনার তরঙ্গে দোলায়িত জীবন, কোথাও ইছামতী-বিদ্যাধরীর চপলতায় সিক্ত এপার ওপার, আবার কখনও বা রণক্লান্ত সরস্বতী বা বুড়িগঙ্গার শীর্ণকায় ধারা — এই নানান ব্যঞ্জনার, রূপ-রূপকের পশরা সাজিয়ে আমাদের ঘিরে রেখেছে আমাদের নদীগুলি। আমাদের অস্তিত্বে, আমাদের অনুভবে এই নদীর ছন্দময় দুলুনি, এই প্রবাহের স্নিগ্ধ স্পর্শ। উত্তর থেকে দক্ষিণ, পুব থেকে পশ্চিম, নদী ছাড়া আমাদের জীবন অচল। যে জনপদের সন্নিকটে নদীর ধারা নেই, সেও নদীকে কল্পনা করে নেয়, আবাহন করে, পারিবারিক অনুষ্ঠানে পরমাত্মীয় নদীকে নিমন্ত্রণ করে আসে নিকটবর্তী অকিঞ্চিৎকর জলাশয়ের কাছে গিয়ে। এই বঙ্গদেশের সকল ধর্মের বর্ণের মানুষের এ এক অভিন্ন, অনতিক্রম্য আবেগ। এখানেই শাশ্বত মানব ধর্মের প্রকাশ। নদীকে ঘিরে, জলকে ঘিরে বাঙালির এই চিরন্তন ভালোবাসাকে সগর্বে তুলে ধরতে, সানন্দে উদযাপন করতে ১৪৩১ সালের পয়লা বৈশাখে “মঙ্গল শোভাযাত্রা কলকাতা” পরিবারের বিশেষ কর্মসূচি ছিল —
“আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়”

ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি হৃদয়ের এই অনন্ত আকুতিকে পাথেয় করে, নানান জলজ উপকরণে সাজানো হয়েছিল এবারের শোভাযাত্রাটি। মাছ থেকে মাছরাঙা, বক থেকে শাপলা, মধুকর ডিঙা থেকে খ্যাপলা জাল, ছিপ থেকে গঙ্গাফড়িং , মৎস্যকন্যা থেকে জলদেবী, মনসামঙ্গল থেকে মীণমঙ্গল, কী ছিল না এই নদীবিধৌত বাংলার নববর্ষ উদযাপনে….

নববর্ষের শোভাযাত্রা শুরু হয় সকাল সাড়ে সাতটায় কলকাতার দক্ষিণ প্রান্তের যাদবপুর সুকান্ত সেতুর মোড় থেকে, শেষ হয় যোধপুর পার্কের সূর্য সেন ভবনে এসে। এতে অসংখ্য শিশু কিশোর, যুবক যুবতীসহ ১৯ টি সংগঠনের শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেছেন। চারটি বিদ্যালয়ের ছেলেমেয়ে, শিক্ষক শিক্ষিকা মিলিয়ে সহস্রাধিক মানুষ সঙ্গী হয়েছিলেন “মঙ্গল শোভাযাত্রা কলকাতা”-র শোভাযাত্রায়। ঢাকের তালে, ঢোলের বোলে মাতোয়ারা শোভাযাত্রায় অনেকেই আনন্দে উদ্বেল হয়ে সারা পথ নৃত্যের তালে তালে অগ্রসর হন। শোভাযাত্রার পুরোভাগে ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক পবিত্র সরকার, অধ্যাপক সিদ্ধার্থ দত্ত, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি বদিউর রহমানসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। এছাড়াও অংশ নেন বিভিন্ন লোকশিল্পী গোষ্ঠী ও নাট্যদল।
শোভাযাত্রার শেষে সূর্য সেন মঞ্চে ১৫ টি সংস্থার প্রতিনিধিরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন। সেখানে সারি – ভাটিয়ালি-ধামাইলসহ নানান সাংস্কৃতিক আঙ্গিক সমন্বিত অনুষ্ঠান দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।

“মিলনের সুরে বর্ষবরণ”
এই অপরূপ বাক্যবন্ধটিকে সামনে রেখে পয়লা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে উত্তর কলকাতায় বর্ষবরণ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ঐতিহ্যমণ্ডিত হেঁদুয়া পার্ক থেকে কলেজ স্ট্রিট পর্যন্ত এদিন বর্ণাঢ্য পদযাত্রায় অংশ নেন বহু মানুষ। নানা রঙের প্ল্যাকার্ড, পতাকা, ফেস্টুন নিয়ে হাজির ছিলেন ছাত্র-যুবা। ঢাকের তালে তালে মিলনের সুরে স্পন্দিত হয় এই শোভাযাত্রা। গোটা যাত্রাপথে রঙিন আতশবাজিতে বর্ণিল হয়ে ওঠে এই শোভাযাত্রা। এই বর্ণময় শোভাযাত্রায় বাংলার কৃষ্টি সংস্কৃতি রক্ষার পাশাপাশি সকল বিদ্বেষ-কলুষকে মুছে দিয়ে শান্তি-সম্প্রীতির চির শাশ্বত বার্তাকে ছড়িয়ে দিতে কবিতায় গানে মুখরিত হন পদযাত্রীরা।

কলেজ স্ট্রিটে সাংস্কৃতিক শোভাযাত্রা পৌঁছানোর পর বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিটে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বহু মানুষ।
সব মিলিয়ে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রায়, নানা সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বাংলা সংস্কৃতির বহু বিচিত্র ধারায় উদযাপিত হয়েছে এবারের নববর্ষ।
লেখক:

সন্দীপ দে, যুগ্ম সম্পাদক, বাঙালীয়ানা