অসাধারণ কবি, গীতিকার, পথিকৃৎপ্রতিম সম্পাদক এবং সর্বোপরি অনন্য মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব সিকান্দার আবু জাফর।
সিকান্দার আবু জাফর ১৯১৯ সালের ১৯ মার্চ সাতক্ষীরা জেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্ণ নাম সৈয়দ আল্ হাশেমী আবু জাফর মুহম্মদ বখ্ত সিকান্দার। তাঁদের আদি নিবাস ছিল পাকিস্তানের পেশোয়ারে; সেখান থেকে তাঁর পিতামহ মাওলানা সৈয়দ আলম শাহ হাশেমী ওই গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন।
আবু জাফর স্থানীয় তালা বিদে ইনস্টিটিউট থেকে প্রবেশিকা (১৯৩৬) এবং কলকাতার রিপন কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। কলকাতার মিলিটারি একাউন্টস বিভাগে (১৯৩৯) তিনি পেশাগত জীবন শুরু করেন এবং পরে সিভিল সাপ্লাই অফিসে চাকরি করেন। সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারের ‘গ্লোব নিউজ এজেন্সী’ নামক সংবাদ-সংস্থায়ও তিনি কিছুকাল কাজ করেন; এ সময় তিনি ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।
আবু জাফর ১৯৫০ সালে কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন এবং বিভিন্ন সময়ে দৈনিক নবযুগ, ইত্তেফাক, সংবাদ ও মিল্লাত পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। তিনি মাসিক সমকাল পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক (১৯৫৭-১৯৭০) ছিলেন। তাঁর জীবনের সেরা কীর্তি সমকাল পত্রিকা সম্পাদনা। এই পত্রিকার পাতায় পাতায় তাঁর রুচি ও সাহসের পরিচয় মুদ্রিত আছে। ১৯৫৮ সালে তিনি ‘সমকাল মুদ্রায়ণ’ নামে একটি ছাপাখানা ও ‘সমকাল প্রকাশনী’ নামে একটি প্রকাশনালয় স্থাপন করেন।
ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও বাঙালী সংস্কৃতিচর্চার যে ধারা গড়ে ওঠে, আবু জাফর ছিলেন তার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে তাঁর স্বাধীনতা, দেশপ্রেম ও বিপ্লবের চেতনাসম্পন্ন কবিতা বিশেষভাবে তাঁর রচিত ‘সংগ্রাম চলবেই’ এবং ‘বাংলা ছাড়ো’ কবিতা দুটি মুক্তি পাগল বাঙালীর প্রেরণার উৎস ছিল।
১৯৬৩ সালে আইয়ুবশাহীর মৌলিক গণতন্ত্রীদের দ্বারা নির্বাচনে সম্মিলিত বিরোধী জোটের প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহর পরাজয়ে হতাশ মানুষের বুকে সাহস সঞ্চালনে তিনি লিখলেন ‘সংগ্রাম চলবেই’। কবিতাটি প্রকাশ পেল ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় পাতায়। এই কবিতা ছায়ানট সম্পাদক সাংবাদিক কামাল লোহানী নিয়ে গেলেন গণসংগীত শিল্পী, সুরকার শেখ লুৎফর রহমানের কাছে সুরারোপের উদ্দেশ্যে। দুদিনের প্রচেষ্টায় এই কবিতাকে শেখ লুৎফর রহমান সংগীতে রূপ দিলেন, সৃষ্টি করলেন বাঙালীর অনুপ্রেরণার মশালসম অমর গণসংগীত ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই, আমাদের সংগ্রাম চলবেই চলবেই জনতার সংগ্রাম চলবেই’।
সংগ্রাম চলবেই
জনতার সংগ্রাম চলবেই,
আমাদের সংগ্রাম চলবেই।হতমানে অপমানে নয়, সুখ সম্মানে
বাঁচবার অধিকার কাড়তে
দাস্যের নির্মোক ছাড়তে
অগণিত মানুষের প্রাণপণ যুদ্ধ
চলবেই চলবেই,
আমাদের সংগ্রাম চলবেই।প্রতারণা প্রলোভন প্রলেপে
হ’ক না আঁধার নিশ্ছিদ্র
আমরা তো সময়ের সারথী
নিশিদিন কাটাবো বিনিদ্র।দিয়েছি তো শান্তি আরও দেবো স্বস্তি
দিয়েছি তো সম্ভ্রম আরও দেবো অস্থি
প্রয়োজন হ’লে দেবো একনদী রক্ত।
হ’ক না পথের বাধা প্রস্তর শক্ত,
অবিরাম যাত্রার চির সংঘর্ষে
একদিন সে-পাহাড় টলবেই।
চলবেই চলবেই
আমাদের সংগ্রাম চলবেইমৃত্যুর ভর্ৎসনা আমরা তো অহরহ শুনছি
আঁধার গোরের ক্ষেতে তবু তো’ ভোরের বীজ বুনছি।
আমাদের বিক্ষত চিত্তে
জীবনে জীবনে অস্তিত্বে
কালনাগ-ফণা উৎক্ষিপ্ত
বারবার হলাহল মাখছি,
তবু তো ক্লান্তিহীন যত্নে
প্রাণে পিপাসাটুকু স্বপ্নে
প্রতিটি দণ্ডে মেলে রাখছি।
আমাদের কি বা আছে
কি হবে যে অপচয়,
যার সর্বস্বের পণ
কিসে তার পরাজয় ?
বন্ধুর পথে পথে দিনান্ত যাত্রী
ভূতের বাঘের ভয়
সে তো আমাদের নয়।হতে পারি পথশ্রমে আরও বিধ্বস্ত
ধিকৃত নয় তবু চিত্ত
আমরা তো সুস্থির লক্ষ্যের যাত্রী
চলবার আবেগেই তৃপ্ত।
আমাদের পথরেখা দুস্তর দুর্গম
সাথে তবু অগণিত সঙ্গী
বেদনার কোটি কোটি অংশী
আমাদের চোখে চোখে লেলিহান অগ্নি
সকল বিরোধ-বিধ্বংসী।
এই কালো রাত্রির সুকঠিন অর্গল
কোনোদিন আমরা যে ভাঙবোই
মুক্ত প্রাণের সাড়া জানবোই,
আমাদের শপথের প্রদীপ্ত স্বাক্ষরে
নূতন সূর্যশিখা জ্বলবেই।
চলবেই চলবেই
আমাদের সংগ্রাম চলবেই।
সাম্প্রদায়িকতা, দুর্ভিক্ষ, গণতন্ত্রহীনতা ইত্যাদির বিরুদ্ধে আগাগোড়া সোচ্চার সিকান্দার আবু জাফর ছিলেন নাগরিক অধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সব সময় সম্মুখসারির যোদ্ধা। ১৯৬৯ এর উন্মাতাল সময়ে রাজপথে জনতা যখন আগ্নেয়গিরির লাভার মত ফুটছে তখন তিনি লিখলেন ‘বাংলা ছাড়ো’। অভিনেতা, আবৃত্তিকার গোলাম মুস্তাফার কন্ঠে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত হয়ে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করলো ‘বাংলা ছাড়ো’।
বাংলা ছাড়ো
রক্তচোখের আগুন মেখে ঝলসে-যাওয়া
আমার বছরগুলো
আজকে যখন হাতের মুঠোয়
কণ্ঠনালীর খুন পিয়াসী ছুরি,
কাজ কি তবে আগলে রেখে বুকের কাছে
কেউটে সাপের ঝাঁপি !
আমার হাতেই নিলাম আমার
নির্ভরতার চাবি;
তুমি আমার আকাশ থেকে
সরাও তোমার ছায়া,
তুমি বাংলা ছাড়ো।অনেক মাপের অনেক জুতোর দামে
তোমার হাতে দিয়েছি ফুল
হৃদয়-সুরভিত
সে-ফুল খুঁজে পায়নি তোমার
চিত্তরসের ছোঁয়া,
পেয়েছে শুধু কঠিন জুতোর তলা।
আজকে যখন তাদের স্মৃতি
অসম্মানের বিষে
তিক্ত প্রাণে শ্বাপদ নখের জ্বালা,
কাজ কি চোখের প্রসন্নতায়
লুকিয়ে রেখে প্রেতের অট্টহাসি !
আমার কাঁধেই নিলাম তুলে
আমার যত বোঝা;
তুমি আমার বাতাস থেকে
মোছো তোমার ধুলো,
তুমি বাংলা ছাড়ো।একাগ্রতার স্বপ্ন বিনিময়ে
মেঘ চেয়েছি ভিজিয়ে নিতে
যখন পোড়া মাটি
বারেবারেই তোমার খরা
আমার ক্ষেতে বসিয়ে গেছে ঘটি।
আমার প্রীতি তোমার প্রতারণা
যোগ-বিয়োগে মিলিয়ে নিলে
তোমার লোভের জটিল অঙ্কগুলো
আমার কেবল হাড় জুড়ালো
হতাশ্বাসের ধুলো।
আজকে যখন খুঁড়তে গিয়ে
নিজের কবরখানা
আপন খুলির কোদাল দেখি
সর্বনাশা বজ্র দিয়ে গড়া,
কাজ কি দ্বিধায় বিষণ্ণতায়
বন্দী রেখে ঘৃণার অগ্নিগিরি !
আমার বুকেই ফিরিয়ে নেব
ক্ষিপ্ত বাজের থাবা;
তুমি আমার জলস্থলের
মাদুর থেকে নামো,
তুমি বাংলা ছাড়ো।
সিকান্দার আবু জাফর গদ্য ও পদ্য রচনায় সমান দক্ষ ছিলেন; তবে তাঁর সর্বাধিক খ্যাতি কবি হিসেবে। তাঁর গল্প, উপন্যাস এবং প্রবন্ধ-নিবন্ধ, সম্পাদকীয়তে বাংলাদেশ ও তার শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তি, মানবতার জয়গান বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে। তিনি যেমন ছিলেন জাতীয়তাবাদী এবং তেমনই ছিলেন আন্তর্জাতিকতাবাদী। তাই তো সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের সপক্ষে সোচ্চার ছিল তাঁর ক্ষুরধার কলম। তাঁর সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা সমকালের সম্পাদকীয় নিবন্ধেও একজন প্রগতিশীল মানবতাবাদী লেখকের কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যায়।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হচ্ছে:
উপন্যাস – পূরবী (১৯৪১), নতুন সকাল (১৯৪৬);
ছোটগল্প – মাটি আর অশ্রু (১৯৪২);
কবিতা – প্রসন্ন শহর (১৯৬৫), তিমিরান্তিক (১৯৬৫), বৈরী বৃষ্টিতে (১৯৬৫), বৃশ্চিক-লগ্ন (১৯৭১), বাংলা ছাড়ো (১৯৭১);
নাটক – সিরাজ-উদ-দৌলা (১৯৬৫), মহাকবি আলাউল (১৯৬৬);
সঙ্গীত – মালব কৌশিক (১৯৬৬)।
তিনি ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার-এ ভূষিত হন এবং ১৯৮৪ সালে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন। ১৯৭৫ সালের ৫ আগস্ট ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়।
বাঙালীয়ানা/এসএল