প্রাদেশিক নির্বাচন কার্যালয় অপারেশন

Comments
“মেজ ভাই সাইদুল হক বাবু প্রবলভাবে পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন। বড় ভাই মোজাম্মেল হক ছিলেন গান লাইসেন্স অফিসার। মেজ ভাই তখন পাকিস্তান সেন্ট্রাল গর্ভমেন্টের ক্যামেরাম্যান। সেজ ভাই ছিলেন বিদেশে। ভগ্নিপতি একজন এসপিএকজন কর্নেল আর তিনজন ছিলেন বিমানবাহিনীর হাই র‌্যাংকের অফিসার। আমি মুক্তিযুদ্ধে গেলে বড় ভাই ও ভগ্নিপতিদের চাকরির ক্ষতি হবে- বাবা সবসময় এই ভয়টা করতেন। ফলে দেশের জন্য ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্তটা আমার জন্য ছিল আরেক যুদ্ধের মতোই। তবুও দেশই তখন আপন। পাকিস্তানীদের গণহত্যালুটপাট মেনে নিতে পারিনি। দেশের টানে তাই ভুলে গিয়েছিলাম রক্তের সম্পর্কগুলো।”

এভাবেই নিজের অন্তরের যুদ্ধের কথা বলছিলেন মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল হক নান্টু। ব্যক্তিগত রক্তঋণের ভাবনা পাশে সরিয়ে রেখে বৃহত্তর রক্তঋণ শোধ করতে যুদ্ধে যাবার পরিকল্পনা করলেন জাকির, মুল্লুকজান, বিয়াই জালাল ও মঙ্গলের সঙ্গে। জুন মাসের শেষদিকের এক সকালে না বলেই বাড়ি থেকে চলে গেলেন নরসিংদী, সেখান থেকে লঞ্চে করে কোসঘর। পরদিন সিএনবি রাস্তা আর বর্ডার পেরিয়ে পৌঁছোলেন আগরতলা। সোজা চলে গেলেন ত্রিপুরা রাজ্য সিপিএম অফিসে, সেখানে পেলেন একটা ঠিকানা, সেই ঠিকানা ধরে মেলাঘর ট্রেনিং ক্যাম্পে। সেই ক্যাম্পে চতুর্থ ব্যাচে একুশ দিন ট্রেনিং হল রফিকুল হকের।

ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রথমে বন্দুক খোলা, লাগানো আর পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন শিখবার পরে হাবিলদার আজম শেখালেন থ্রি নট থ্রি চালানো, এরপরই থার্টিসিক্স হ্যান্ড গ্রেনেড থ্রো করা। এক্সপ্লোসিভ ও হ্যান্ড গ্রেনেডের মাস্টার ট্রেনিং করালেন হাবিলদার মনির আর গেরিলা ট্রেনিং পেলেন ক্যাপ্টেন হায়দারের কাছে।

ট্রেনিং শেষে এগার নম্বর প্লাটুনে, প্লাটুন কমান্ডার সাদেক হোসেন খোকার অধীনে প্রথম পাঠানো হল বর্ডারের কাছেনয়নপুর ও মন্দবাগে। অবশ্য এ দু’জায়গায় তাদের কমান্ড করলেন তাহের চৌধুরী। কিছুদিন এ দু’জায়গায় যুদ্ধ করার পর গেরিলা অপারেশনের জন্য রফিকুলদের পাঠিয়ে দেওয়া হল ঢাকায়।

আজম খান (পপ গায়ক)সহ রফিকুল হক নান্টুরা ডেমরায় তিতাস গ্যাসের পাইপ লাইন ও পেট্রোলিয়াম অয়েল ট্যাঙ্কার উড়িয়ে দিয়ে ঢাকা শহরের কাছেই হাইড আউটে এসে পৌঁছোলেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে ‘প্রাদেশিক নির্বাচন কার্যালয়’ অবস্থিত ছিল ঢাকার শান্তিনগর এলাকার মোমেনবাগের দু’টি ভাড়া করা বাড়িতে। এর মধ্যে একটি বাড়ির মালিক ছিল, আব্দুল মোমেন খান (জিয়া মন্ত্রীসভার খাদ্যমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা ড. আব্দুল মঈন খানের বাবা)।

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যেসব জাতীয় সংসদ সদস্য ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যরা বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মুক্তাঞ্চলে চলে গেছিলেন, একাত্তরের অক্টোবর-নভেম্বরে তাদের আসন শূন্য ঘোষণা করে সেগুলোয় উপ-নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছিল কমিশনে।

দখলদার পাকিস্তানী সামরিক সরকারের সেই সাজানো অনৈতিক, অবৈধ নির্বাচন রুখতে ঢাকার প্রাদেশিক নির্বাচন কার্যালয়ে রোজাকালীন সময়ে ১ নভেম্বর, ১৯৭১, সোমবার সেই  ‘প্রাদেশিক নির্বাচন কার্যালয়’ উড়িয়ে দিতে সাদেক হোসেন খোকা’র নেতৃত্বে ঐ ভবনে অপারেশন চালায় গেরিলাদল। সেই গেরিলাদলে খোকার সাথে ছিলেন ইকবাল আহমেদ সুফি, আমসল লস্কর, হেদায়েতুল্লাহ খোকন, জিন্নাহ ও রফিকুল হক নান্টু।

1971_Election Office

বিধ্বস্ত প্রাদেশিক নির্বাচন কার্যালয়। ছবি: গেরিলা ১৯৭১

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর জোরালো উপস্থিতির মাঝে এই অপারেশন সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করেছিলেন নির্বাচন অফিসের একজন বাঙালী কর্মকর্তা, আবুল কাশেম। তিনি সাদেক হোসেন খোকাকে আত্মীয় পরিচয়ে তার অফিসে ৩ দিন রেকি করতে নিয়ে যান ।

রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে রাস্তাঘাটে জন উপস্থিতি অত্যন্ত কম ছিল ফলে প্রবল বৃষ্টি মূলত অপারেশনের সহায়ক হয়েছিল। গেরিলারা তিনজন করে দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে প্রাদেশিক নির্বাচন অফিসের দুই ভবনে বিস্ফোরক স্থাপন করেন। শুরুতেই অস্ত্র দেখিয়ে ভবনের নিরাপত্তা রক্ষীদের সবাইকে ভবন থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ স্থাপনের পর ভয়াবহ বিস্ফোরণে একটি ভবনের একাংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বিস্ফোরণের মুহূর্তে চিলেকোঠায় ঘুমন্ত এক নিরাপত্তারক্ষী নিহত হয়েছিল। এই নিরাপত্তারক্ষীর অবস্থানের খবর গেরিলারা আগে জানতে পারেননি।

অভিযান সফল করে অসমসাহসী বীর ৬ যোদ্ধা শান্তিবাগের গুলবাগস্থ ওয়াপদা অফিসের কর্মচারীদের একটি মেসে গিয়ে আত্মগোপন করেন। ওই রাতে মেসের লোকেরা তাদের জন্য রান্না করা খাবার গেরিলাদের খাওয়ান। তাদের বিছানাতেই থাকতে দেন। গেরিলাদের বাঁচাতে রাতভর পালা করে বাইরে দাঁড়িয়ে পাহারাও দিয়েছিলেন তারা। অতঃপর খুব ভোরে সেখান থেকে গেরিলারা ফিরে যান ক্যাম্প ডেমরার কাছে আমুলিয়া মেহেন্দিপুরে।

এভাবেই ১৯৭১ সালের সেই উন্মাতাল দিনে ঢাকা শহরে রচিত হয়েছিল আরও একটি দুর্ধর্ষ গেরিলা অপারেশন। এ অপারেশনের খবর ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দুনিয়ায় এবং আর একবার কাঁপন ধরিয়েছিল পাক হানাদারদের বুকে।

বাঙালীয়ানা/এসএল

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.