নবম পর্ব
। জুলফিকার নিউটন ।
এমন দেশ নেই, যে দেশে লোকসংস্কৃতি নেই। কিন্তু সে দেশের সংস্কৃতি বলতে কেবল সে দেশের লোকসংস্কৃতি বোঝায় না। তার চেয়ে উচ্চতর স্তরের সংস্কৃতিও বোঝায়। সেদিক থেকে বিচার করলে সে দেশের লোকসংস্কৃতি যদিও আর সব দেশের সঙ্গে তুলনায় সমান তার উচ্চতর সংস্কৃতি কিন্তু তুলনায় অনুচ্চ। ওসব বিশেষণ বাদ দিয়ে বলতে গেলে বলতে হয় সে দেশের সংস্কৃতি অন্যের তুলনায় অনগ্রসর বা পশ্চাৎপদ বা অবিবর্তিত বা অল্পবিবর্তিত। এমনও হতে পারে যে তুলনাই চলে না, সে দেশের সংস্কৃতি অনন্য। তাই যদি হয় তবে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিশ্বজনীন বা ইউনিভার্সাল বলে কিছু নেই। সংস্কৃতি একান্তভাবেই স্বাদেশিক। শুধু ব্রিটেনের জন্য শেকস্পিয়র, শুধু জার্মানির জন্য বেঠোভেন, শুধু রাশিয়ার জন্য টলস্টয়, শুধু ইতালির জন্য লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। আর শুধু বাংলাদেশের জন্যই রবীন্দ্রনাথ।
এ রকম একটা ধারণা রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পূর্বে আমাদের স্বদেশপ্রেমিকদের অনেকের ছিল। তাদের বক্তব্য বাংলার একাই একটি জগৎ। ‘যাহা নাই বাংলাতে তাহা নাই জগতে’। কারও কাছ থেকে কিছু নেওয়ারও নেই, কাউকে কিছু দেওয়ারও নেই। বাংলার সংস্কৃতি কখনো কারও কাছ থেকে কিছু নেওয়নি, কাউকে কিছু দেয়ওনি। যদি দিয়ে থাকে তবে বাংলাদেশই দিয়েছে। যদি দেওয়ার থাকে বাংলাই দেবে। বাংলার ভূগোল, বাংলার ইতিহাস, বাংলার অর্থনীতি, বাংলার রাজনীতি, বাংলার সমাজ, বাংলার ধর্ম, বাংলার নীতি, বাংলার রীতি সবই তার নিজস্ব। বিবর্তন তত্ত্ব যদি মানতে হয় তবে বাংলার বিবর্তনও তার স্বকীয় ধারায়। পরকীয়া প্রেম যেমন বর্জনীয় পরকীয়া সংস্কৃতিও তেমনি বর্জনীয়।
একই মনোভাব চীন দেশের স্বদেশপ্রেমিকদেরও। জাপানের স্বদেশপ্রেমিকদেরও। যারা চীন, জাপান ও বাংলাদেশের মিতালিতে বিশ্বাসী, তারা থাকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মৌল বিভেদেও বিশ্বাসী। প্রাচী হচ্ছে প্রাচী, প্রতীচী হচ্ছে প্রতীচী। সে দুইয়ের মিলন কখনো হওয়ার নয়। অবিকল কিপলিং–এর সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ, চীন ও জাপানকে একসূত্রে বেঁধেছিল বৌদ্ধধর্ম। কাকুজো ওকাকুরা বৌদ্ধ ছিলেন। অনেকে তাকে কাউন্ট বলে ভুল করেন। না, তিনি কাউন্ট ছিলেন না। ওকুমা ছিলেন কাউন্ট। উদার উপাধি বুধোর ঘাড়ে চেপেছে। ওকাকুরার রাজদত্ত কোনো উপাধি ছিল না। কিন্তু মানুষ প্রদত্ত একটি উপাধি ছিল। তাকে বলা হতো তেনশিন ওকাকুরা। তার মানে বোধ হয় শিল্পাচার্য। তিনি ছিলেন পাশ্চাত্য প্রথায় ছবি আঁকার, ঘর সাজানোর, মিনার গড়ার ঘোর বিরোধী। জাপান যে পশ্চিমের অনুকরণে পাশ্চাত্য পথে চলেছে এতে তিনি দারুণ অশান্তি বোধ করতেন। সেই অশান্তিই তার কাল হলো। তার মৃত্যুর পূর্বে লিখিত পত্রাবলী অনেক বছর বাদে আমার হাতে আসে। একজন হতাশ স্বদেশপ্রেমিকের কাতরোক্তি।
জাপান বিপথগামী হয়েছে। তার স্বধর্মকে হারিয়েছে। অতএব জীবন ব্যর্থ। জাপানি যাদের সঙ্গে আলাপ হয় তাদের মধ্যে তারই মতো হতাশ স্বদেশপ্রেমিক কবি ও চিন্তাশীলদেরও দেখি। ইসলাম যাদের ধর্ম নয় পারসিক সংস্কৃতি তাদেরও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশেছে। ‘না রবে প্রদাসগুণ না হবে রসাল। তেই রচিলাম ভাষা যানবীমিশাল।’ এই হলো অষ্টাদশ শতাব্দীর কবিশ্রেষ্ঠ ভারতচন্দ্রের কৈফিয়ত। কেবল ভাষা নয়, সাহিত্যও ছিল যাবনী–মিশাল, নইলে রসাল হতো না। মুসলমান সুলতানদের আনুকূল্য না পেলে এর বিকাশ হতো না। এর বিবর্তনে হিন্দু ও মুসলমান উভয়েরই অংশ আছে। এখন তো বেশিরভাগ বাঙালিই মুসলমান। দেশভাগের পর বেশিরভাগ বাঙালিই মুসলমান। দেশভাগের পর বেশিরভাগ বাঙালির রাষ্ট্রভাষা হয়েছে বাংলা। ধর্মে মুসলমান, সংস্কৃতিতে বাঙালি– এ যেন ধর্মে মুসলমান, সংস্কৃতিতে ইন্দোনেশীয়। ধর্মের সঙ্গে সংস্কৃতির বিরোধও নেই, অভিন্নতাও নেই, ধর্ম আর সংস্কৃতি একাকার নয়। সেই ভুলটা করছে পাকিস্তান। উর্দু কোনোকালেই ইসলামের ভাষা ছিল না। ইসলামের ভাষা আরবি। শব্দভান্ডার যবনীমিশাল, কিন্তু ব্যাকরণ একই।
ইসলামের প্রবর্তনের পূর্বেও আরব, ইরানি ও গ্রিকদের সঙ্গে বাংলার লোকের ব্যবসায়–বাণিজ্য ছিল, সন্ধিবিগ্রহ ছিল, বিভিন্ন উপলক্ষ্যে যাতায়াত ছিল। হয়তো বিয়ে– শাদিও ছিল। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের এক রানি নাকি ছিলেন গ্রিক রাজকন্যা। যে অসুরদের কাহিনি আমরা পুরাণে পড়ি তারা যদি তৎকালীন আসরিয়ান হয়ে থাকে তবে তো বিবাহাদির নজির অতি পুরাতন। আসুরিক বিবাহ কি শাস্ত্রসম্মত ছিল না? ইরানের ভাষাও ছিল আর্যভাষা। যেমন গ্রিসের ভাষা ছিল আর্যভাষা। আর্যাবর্তের সঙ্গে ভাষাগত মিলও ছিল। তাই মিল–মিশ্রণ অব্যাহত ছিল।
ভারতবর্ষের ইতিহাসে আমরা লক্ষ করছি চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে যেমন আমাদের পূর্বপুরুষদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তেমনি আরব, পারসিক, গ্রিকদের সঙ্গেও। গ্রিক বলতে যদি প্রতীচ্য বুঝি তবে প্রতীচ্যের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ ছিল। যেমন– চীন, জাপান বা প্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের ছিল প্রাচ্য ও প্রাতীচ্যের মাঝখানে অবস্থিত এক মধ্যমণি। পরবর্তীকালে সে একান্তরূপেই প্রাচ্য হয়ে পড়েছে। কিন্তু চীন বা জাপানের মতো প্রাচ্য কখনোই নয়। অষ্টাদশ শতাব্দীতেই এ ভুলটা ধরা পড়ে। স্যার উইলিয়াম জোনস প্রমুখ পণ্ডিত আবিষ্কার করেন যে, সংস্কৃত আর পারসিক আর গ্রিক আর ল্যাটিন হচ্ছে একই ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত ভাষা। এই ভাষাগোষ্ঠীর নামকরণ হয় আর্য বা এরিয়ান। একই শব্দের রূপান্তর ইরানিয়ান ও এইরিয়ান, যেটা ইংরেজদের মুখে আইরিশ। অষ্টাদশ শতাব্দীর পণ্ডিতরা একটা ভুল শোধরাতে গিয়ে আরেকটা ভুল করেন। ভাষাগোষ্ঠীকে তারা বোঝেন জাতিগোষ্ঠী। সংস্কৃতিকে ধর্ম আর ধর্মকে সংস্কৃতি বলে যে ভুলটা আমরা এখনও করছি সেই ভুলটাই তারা করেন ভাষাকে জাতি ও জাতিকে ভাষা বলে। ভাষা থেকে জাতি বা রেস বোঝা যায় না। ভাষা এক হতে পারে, রেস অনেক হতে পারে। আবার রেস এক হতে পারে। ভাষার সঙ্গে রেসকে অভিন্ন মনে করে জার্মানির নাৎসিরা আর্য মহিমায় আত্মহারা হয়। দেড় হাজার বছর ধরে জার্মানিতে বসবাস করে যারা জার্মান হয়ে গেছে সেই ইহুদিদের তারা সমূলে উচ্ছেদ বা বিনাশ করে। যেহেতু তারা আর্য নয়। পারসিরাও তো বাংলাতে দেড় হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসছে। তাদেরকেও কি সমূলে উচ্ছেদ বা বিনাশ করা হবে।
যেহেতু তারা প্রাচীন ভারতীয় আর্য বংশধর নয়? পারসিরাও গুজরাটভাষী। যেমন জার্মানির ইহুদিরা জার্মানভাষী। সারা ইতিহাস জুড়ে মানবসমষ্টির মাইগ্রেশন চলে আসছে। পাখিদের মাইগ্রেশনের মতো মানুষদেরও মাইিগ্রেশন। তরুলতারও মাইগ্রেশন। ফল–ফুলেরও মাইগ্রেশন। যেটাকে আমরা স্বদেশি, ভাবছি সেটাই বিদেশি। তামাক, আনারস, পেপে, গাঁদা, রজনিগন্ধা, চন্দ্রমল্লিকা এরাও বিদেশি। এসব খুব পুরানো নয় বলেই আমরা এদের উৎপত্তিস্থলের খবর রাখি। কিন্তু জাতিকুলের বেলায় আমরা অন্ধকারে হাতড়ে চলেছি। ভাষাকে মনে করছি জাতি। সংস্কারকে মনে করছি ধর্ম। আজকের দিনের পণ্ডিতরা স্বীকার করেন না যে আর্যভাষা যাদের ভাষা তারা সেই সুবাদে আর্য জাতি। প্রাচীন সাহিত্যে আর্য কথাটি ছিল সম্ভ্রমসূচক। জাতিবাচক নয়। ধর্মবাচক নয়। সংস্কৃতিবাচক নয়। তবে আর্য ভাষাগোষ্ঠীকে অন্য কোনো শব্দ দিয়ে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। উর্দুও আর্যভাষা। অথচ আরবি হচ্ছে সেমিটিক।
আর্যভাষীরা বাইরে থেকেই ভেতরে আসুক আর ভেতর থেকেই বাইরে যাক তারাই বাংলার একমাত্র ভাষাগোষ্ঠী ছিল না। জাতি বলে গণনা করলেও একমাত্র জাতি ছিল না। অসংখ্য জাতি ও ভাষার সহাবস্থান যে দেশে সে দেশকে কেবল আর্যদের আর সংস্কৃতভাষীদের বলে দাবি করা অন্যায়। তবে তাদেরই প্রাধান্য ছিল, সেই প্রাধান্য তারা ইসলামধর্মী আরব, তুির্ক ও মোগল বিজয়ের পূর্ব অবধি বজায় রেখেছিল।
ইউরোপীয়দের মতো এইসব আগন্তুকও ছিল তিন–ভাগে বিভক্ত শাসক, বণিক ও ধর্মপ্রচারক। বলা যেতে পারে ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও ব্রাহ্মণ। শূদ্র ওরা সঙ্গে করে আনেনি, এই দেশেই ধর্মান্তর সহযোগে সংগ্রহ করে। দেশজ মুসলমানকে বলা হয় আতরপ। আর বহিরাগত মুসলমানদের বলা হয় আশরফ। আশরফরাই মুসলিম সমাজে তথা সুলতানী বা বাদশাহী রাষ্ট্রে প্রাধান্য লাভ করেন। কতক হিন্দুকেও তারা তাদের শরিক করে নেন। এরা একালের ইংরেজি নবিশদের মতো সেকালের ফারসি নবিশ। এদের বংশধররা এখনও খান, চৌধুরী, সরকার, মজুমদার, কাজি, হালদার প্রভৃতি উপাধিধারী। কিছুদিন আগেও এরা জমিদার ছিলেন, এখনও জোতদার। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় বণিকরা এসে হাজির হন। বণিকদের পরে আসেন শাসকরা। শাসকদের পরে ধর্মপ্রচারকরা। শূদ্রদের অভাব এরা খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষাদানের দ্বারা পূরণ করেন। প্রাধান্য চলে যায় বিদেশি খ্রিষ্টানদের হাতে। দেশীয় খ্রিষ্টানরা অবহেলিত হন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে একই চক্র বারবার ঘুরে আসছে। চাকার ওপরে শাসক, বণিক ও ধর্মগুরু। চাকার নিচে শাসিত ও শোষিত জনগণ। ইংরেজ আমলে ফারসি চর্চার পরিবর্তে ইংরেজি চর্চা করে বাঙালিরা জজ, ম্যাজিস্ট্রেট, ব্যারিস্টার, অ্যাটর্নি, ডাক্তার, প্রোফেসর হন। এদের অনেকে বিলাত ফেরত। ক্রমে ক্রমে এরাও ইউরোপীয়দের শরিক হন। অবশেষে ইংরেজরা এইসব ইংরেজি নবিশের হাতেই প্রশাসন সঁপে দিয়ে বিদায় হন। ইতোমধ্যে পলিটিসিয়ান বলে একটি নতুন গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছিল। এরাই নির্বাচনসূত্রে আইনসভার সদস্য হয়ে মন্ত্রীমণ্ডলী অলংকৃত করেন। চাকার ওপরে এদেরই অধিষ্ঠান।
মধ্যযুগের মানুষের বিশ্বাস ছিল যে ধর্মই জীবনের সারবস্তু। ধর্মহীন জীবন অসার। এই বিশ্বাসের সুফল আমরা দেশে দেশে নিরীক্ষণ করছি মন্দিরে মসজিদে ক্যাথিড্রালে। ময়নামতি, পাহাড়পুরের শৈলভাস্কর্যে বা গুহাচিত্রে। ধর্মের প্রেরণা সংস্কৃতিকে অমরত্ব দিয়েছে। অমৃত দিয়েছে। কিন্তু এর একটা উলটো পিঠও আছে। চাঁদের উলটো পিঠের মতো সেটাও কুৎসিত। গ্রিক–রোমানদের দর্শন– বিজ্ঞান খ্রিষ্টীয় চার্চের অঙ্কুশের তাড়নায় প্রায় বিলুপ্ত হয়। তাদের দেবদেবীর মন্দির বিধ্বস্ত হয়। তাদের তৈরি দেবদেবীর বা মানুষের মূর্তি বনে–জঙ্গলে বা নির্জন দ্বীপে অর্ধভগ্ন অবস্থায় কোনো রকমে টিকে থাকে। খ্রিষ্টান ধর্মগুরুদের নিয়ন্ত্রণ সুদূরপ্রসারী হলেও গীতবাদ্য বা নৃত্য একেবারে নিষিদ্ধ হয় না। অন্তত লোকসংস্কৃতির আড়ালে আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হয়। কিন্তু মুসলিম ধর্মগুরুদের বিচারে ওসব সর্বতোভাবে বর্জনীয়। সেই সঙ্গে চিত্র তথা ভাস্কর্য। ললিতকলার পরিধি এমনি করে অতিমাত্রায় সংকুুচিত হয়ে যায়। খ্রিষ্টানদের তবু একটা গতি ছিল। তারা যিশু খ্রিষ্টের বা তার জননী মেরীর ছবি আঁকতে বা ভাস্কর্য গড়তে পারতেন, যতদিন না পিউরিটানদের প্রভাব ও প্রতাপ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু মুসলমানদের সেটুকু স্বাধীনতাও ছিল না। তাদের ধর্মগুরুরা গোড়া থেকেই গোঁড়া পিউরিটান। অপরপক্ষে ইসলাম প্রবর্তনের পর প্রথম কয়েক শতাব্দীতে মুসলমানদের মধ্যে যেমন জ্ঞান–বিজ্ঞান চর্চা ছিল খ্রিষ্টানদের মধ্যে তেমন নয়। গ্রিক দর্শন, গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞান, গ্রিক আয়ুর্বেদকে আরবদেশের মুসলমানরাই যত্ন করে সংরক্ষণ করেন ও ইউরোপের পশ্চিমপ্রান্তে পৌঁছে দেন। পঞ্চদশ শতাব্দীর পূর্বেও পাশ্চাত্য রেনেসাঁসের পূর্বাভাস দেখা দেয় আরব পণ্ডিতদের কল্যাণেই। পরিতাপের বিষয় প্রথম তিন শতাব্দীর সেই অপূর্ব উদারতা ধর্মান্ধদের অঙ্কুশ প্রয়োগে নির্মূল হয়। ‘যাহা নাই বাইবেলে তাহা নাই দর্শনে, তাহা নাই বিজ্ঞানে’। সাহিত্যকেও যে মোল্লারা বা পাদ্রিরা ছাড় দিলেন তা নয়। রাজারা উদার না হলে, অভিজাতরা, সুরসিক না হলে সাহিত্যের প্রাণসংশয় হতো। রেনেসাঁস এসে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। ধর্মের মুষ্টি শিথিল হয়। তাও একদিনে নয়, বিনা দ্বন্দ্বে নয়। শতখানেক বছর পরে পাদ্রিরা পালটা আন্দোলন করেন। সেটার নাম কাউন্টার রেনেসাঁস।
ইসলামী দেশগুলোতে রেনেসাঁসের সূচনা সবে শুরু হচ্ছে। কিন্তু নির্বিবাদে নয়। কাউন্টার রেনেসাঁস সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয়। ধর্মকে অভ্রান্ত বলে মেনে নিয়ে তার একটি যুক্তিবাদী ভাষ্য রচনা করলে যা হয় তা রেনেসাঁস নয়। স্বাধীনতা সেখানে গণ্ডিবদ্ধ। সীমাহীন স্বাধীনতা না থাকলে রেনেসাঁস হয় না। এটা যে শুধু ধর্মের বেলায় তা নয়, যেকোনো শাস্ত্রের বেলায়। এমনকি, সেন্ট পল লিখিত সুসমাচারের বেলায় ইউরোপের চিন্তাশীলরা এখন দোটানায় পড়েছেন। ধর্মের স্থান নিতে চাইছে সমাজতন্ত্র, প্রতিশেধক হিসেবে ধর্মকে আবার শীর্ষস্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে? কোথাও ক্যাথলিক ধর্মকে, কোথাও ইসলাম ধর্মকে? নইলে সব লাল হয়ে যাবে? মোহাম্মদপুরে এক মার্কিন ক্যাথলিক পাদ্রি আমাকে বলেন, ‘লিবারেলরাই নষ্টের গোড়া। লিবারলিজমের পরের ধাপ কমিউনিজম। ধর্মবিশ্বাস একবার যদি টলে তবে তা ঠাঁই নেয় কমিনিজমের বিশ্বাস’। ইনি হলেন ম্যাকার্থির অন্ধ সমর্থক। এমন ভাব এখন ইরানে, আফগানিস্তানে, পাকিস্তানে কাজ করছে। চিলিতে, আর্জেন্টিনায়, এলো সালভাডোরেও। ধর্মকে হটাতে গেলে কমিউনিজম। না হটালে রেনেসাঁস বিরোধিতা।
রেনেসাঁসের আদিপর্বের প্রধান পুরুষরা কারও চেয়ে কম খ্রিষ্টান ছিলেন না, ধর্মের সঙ্গে শিল্পকে ও বিজ্ঞানকে মিলিয়ে নিতেই চেয়েছিলেন। কিন্তু শিল্প ও বিজ্ঞানের গ্রিক ও রোমান আদর্শ তথা ঐতিহ্য ছিল খ্রিষ্টপর্ব। যা কিছু খ্রিষ্টপূর্ব তাই খ্রিষ্টীয় বিচারে মূল্যহীন ও হেয়। অপর পক্ষে, যা কিছু মানবিক বা হিউম্যান তাই রেনেসাঁস নায়কদের বিচারে মূল্যবান ও শ্রেয়। বিবাদটা খ্রিষ্টধর্মের সঙ্গে হিউম্যানিজমের। যিশুর আবির্ভাবের পূর্বে হোমার, ভার্জিল, সোফোক্লিস, সক্রেটিস, প্লেটো জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মানুষকে পরিপূর্ণরূপে জানতে হলে তাদের কাছে পাঠ নিতে হয়, তাদের বাদ দিয়ে কি বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে? তেমনি সেকালের শিল্পকীর্তির রসাস্বাাদন না করে কি চিত্রশালা বা ভাস্কর্যশালা চলতে পারে? জীবনের বিচিত্র প্রতিষ্ঠান কি তবে অচলায়তন হবে? সচল হবে কেবল খ্রিষ্টীয় চার্চ। চার্চ যতই দার্শনিক–বৈজ্ঞানিকদের ধরে ধরে পুড়িয়ে মারে ততই তাদের পক্ষে সমর্থক সংখ্যা বাড়ে। ফরাসি বিপ্লব কেবল রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে নয়, চার্চের বিরুদ্ধেও বিস্ফোরণ। চোট পড়ে ধর্মের উপরেও। বিপ্লবীরা সেক্যুলার সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেন। রাষ্ট্র ব্যবস্থারও। সেই স্বপ্নের কিয়দংশ ইউরোপে, আমেরিকায়ও স্বাধীন বাংলাদেশে রূপায়িত হয়েছে। পরাজিত জাপানেও ধর্মকে জীবনের কতক বিভাগ থেকে হটানো হয়েছে, কতক বিভাগ থেকে হটানো হয়নি। উচিত মনে হয়নি। ধর্ম যদি সর্বগ্রাসী না হয় তবে ধর্ম বাঁচাবে, সংস্কৃতিও বাঁচাবে, অর্থনীতিও বাঁচাবে। নয়তো মোল্লাদের কবলে পড়বে ইরান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ প্রভৃতি ইসলামী দেশ, গোঁড়া ক্যাথলিকদের খপ্পরে আরও কয়েকটি দেশ। দেশবাসীর চূড়ান্ত ক্ষতি করার পর এসব ফান্ডামেনটালিস্টরাও পরাস্ত হবেন।
(পরবর্তী পর্ব ২৭ মার্চ, ২০২৬-এ প্রকাশিতব্য)
ফিচার ফটো অলংকরণ: অভি মজুমদার
লেখক:
জুলফিকার নিউটন
লেখক, গবেষক ও অনুবাদক; ঢাকা
*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক