দশম পর্ব
। জুলফিকার নিউটন ।
স্বল্পকথায়, সুন্দর ও সামগ্রিক জীবনচেতনাই সংস্কৃতি। চলনে–বলনে, মনে–মেজাজে, কথায়–কাজে, ভাবে–ভাবনায়, আচারে–আচরণে, অনবরত সুন্দরের অনুশীলন ও অভিব্যক্তিই সংস্কৃতিবানতা। সংস্কৃতিবান ব্যক্তি অসুন্দর, অকল্যাণ এবং অপ্রেমের অরি। সুরুচি ও সৌজন্যেই তাই সংস্কৃতিবানতার প্রকাশ। সংস্কৃতিবান মানুষ কখনো জ্ঞাতসারে অন্যায় করে না, অকল্যাণকর কিছুকে প্রশ্রয় দেয় না, অপ্রীতিতে বেদনাবোধ করে এবং কুৎসিত সহ্য করে না। অন্যকথায়, যেখানে কথার শেষ সেখানেই সুরের আরম্ভ, যেখানে photog-aphy র শেষ সেখান থেকেই শিল্পের শুরু, নকশার উর্ধ্বেই সাহিত্যের স্থিতি, তেমনি যেখানে স্কুল জৈব প্রয়োজনের শেষ, সেখানে থেকেই সংস্কৃতির শুরু। সংস্কৃতিবান মানুষ জ্ঞানে–প্রজ্ঞায়, অভিজ্ঞায় ও প্রযোজনবোধে চালিত হয়ে অনবরত জীবনকে রচনা করতে থাকে এবং পরিবেশকে স্নিগ্ধ ও সুন্দর করবার প্রয়াসী হয়। এজন্যে সংস্কৃতিবান ব্যক্তিমাত্রেই কেবল নিজের প্রতিই নয়, প্রতিবেশীর প্রতিও নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য স্বীকার করে। এবং সচেতনভাবে ও সযত্নে নিজেকে সুন্দর করে সৃষ্টি করে এবং নিজের আচারে–আচরণে, মনে–মননে, কথায়–কাজে অপরের পক্ষে স্মরণীয়, বরণীয়, অনুসরণীয় এবং আকর্ষণীয় লাবণ্য ছড়িয়ে তৈরি করে প্রতিবেশীদের সুষ্ঠু জীবনের ভিত।
বীজের আত্মবিকাশের জন্যে যেমন কর্ষিত ক্ষেত্র প্রয়োজন, সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশের জন্যেও তেমনি সুকর্ষিত মনোভূমি তথা পরিদ্রুত চেতনা আবশ্যক। তাই সংস্কৃতির স্রষ্টামাত্রেই বিজ্ঞ এবং বিবেকবান, সুন্দরের ধ্যানী ও আনন্দের অন্বেষ্টা, বুদ্ধি ও বৃদ্ধির সাধক, মঙ্গল ও মমতার বাণীবাহক এবং প্রীতি ও প্রফুল্লতার উদ্ভাবক।চরিত্রবল, মুক্তবুদ্ধি এবং উদারতার ঐশ্বর্যই এমন মানুষের সম্বল ও সম্পদ। বেদনামুক্তি এবং আনন্দ–অন্বেষাই মানুষের জীবনসত্য। এক্ষেত্রে সিদ্ধির জন্যে প্রয়োজন সুন্দর ও কল্যাণের প্রতিষ্ঠা। আর এই সৌন্দর্য–অন্বেষা এবং কল্যাণকামিতাই সংস্কৃতি।
মানুষের জীবনে সম্পদ ও সমস্যা, আনন্দ ও যন্ত্রণা পাশাপাশি চলে, বলা যায় একটি অপরটির সহচর। কিন্তু এগুলো যখন আনুপাতিক ভারসাম্য হারায়, তখন সুখ কিংবা দুঃখ বাড়ে। সুখ বৃদ্ধি পেল তো ভালোই, কিন্তু সমস্যা ও যন্ত্রণার চাপে যখন জীবন–জ্বালা আত্যন্তিক হয়ে উঠে, তখনই বিচলিত–বিপর্যস্ত মানুষ স্বস্তিকামনায় সমাধান খোঁজে। এ সমাধান দিতে পারেন এবং দেনও কেবল সংস্কৃতিবান মানুষই।
মানুষমাত্রই সচেতন কিংবা অবচেতনভাবে সংস্কৃতিকামী। কিন্তু সাধনার মাত্রা ও পথ–পদ্ধতি সবার এক রকম নয়। তাই সংস্কৃতিতে আসে গৌত্রিক, আঞ্চলিক, সামাজিক, আর্থিক ও আত্মিক বৈষম্য ও বিভিন্নতা। এবং স্তরভেদে তা হয় নিন্দনীয় কিংবা বন্দনীয়, অনুকরণীয় কিংবা পরিহার্য।
আগের কথা জানিনে, কিন্তু ইতিহাসান্তর্গত যুগে দেখতে পাই বাঙালি মনোভূমি কর্ষণ করেছে সযত্নে। এবং এই কর্ষিত ভূমে মানবিক সমস্যার বীজ বপন করে সমাধানের ফল ও ফসল পেতে হয়েছে উৎসুক। এই এলাকায় বাঙালি অনন্য। এ যেন তার নিজের–এলাকা, সে এই মাটিকে ভালবেসেছে, সে এ জীবনকে সত্য বলে জেনেছে। তাই সে দেহতাত্ত্বিক, তাই সে প্রাণবাদী, তাই সে যোগী এবং অমরত্বের পিপাসু। এজন্যেই নির্বাণবাদী বুদ্ধের ধর্মগ্রহণ করেও সে কায়াসাধনায় নিষ্ঠ। তার কাছে এ মর্ত্য জীবনই সত্য, পারত্রিক জীবন মায়া। মর্ত্য জীবনের মাধুর্যে সে আকুল, তাই সে মর্ত্যে অমৃতসন্ধানী।
বাউলেরা তাই গৃহী, যোগীরা তাই অমরত্বের সাধক, বৈষ্ণব বৈরাগীরা তাই ঘর করে, আর ফকিরেরা বাঁধে ঘর। তাই বাঙালির কণ্ঠে আমরা সেদিন শুনতে পেয়েছিলাম চরম সত্য ও পরম কাম্য বাণী-’শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।
বাঙালি এই ঐতিহ্য আজো হারায়নি। আজো হাটে–ঘাটে–প্রান্তরে বাউল–কণ্ঠে সেই বাণী শুনতে পাই। মানববাদী বাউলেরা আজো উদাত্তকণ্ঠে মানুষকে মিলন ময়দানে আহ্বান জানায়, আজো তারা মানবতার শ্রেষ্ঠ সাধক ও চিন্তানায়কের কণ্ঠের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে। সাম্য, সহ অবস্থান এবং সম্প্রতির বাণী শোনায়। তারা বলে:
নানা বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ
জগৎ ভরমিয়া দেখিলাম একই মায়ের পুত।
কাজেই কাকেই বা দূরে ঠেলবি আর কাকেই বা কাছে টানবি। তোরা তো ভাই ফুল কুড়োতে কেবল ভুলই কুড়োচ্ছিস্। কৃত্রিম বাছ–বিচারের ধাঁধায় কেবল নিজেকেই ঠকাচ্ছিস্। গোত্রীয়, ধর্মীয় ও দেশীয় চেতনা বিভেদের প্রাচীরই কেবল তৈরি করছে–বিদ্বেষ ও বিবাদ সৃষ্টি করেছে, হানাহানির প্রেরণাই কেবল দিয়েছে, তাই বাউল বলেন–
‘সুন্নত দিলে হয় মুসলমান,
নারী লোকের কি হয় বিধান।
বামণ চিনি পৈতার প্রমাণ
বামণী চিনি কি ধরে ।’
একালের ইংরেজি শিক্ষিত কবি যখন বলেন;-
‘সবারে তুই বাসরে ভাল, নইলে তোর মনের কালি ঘুচবে না রে।’
কিংবা,
‘কালো আর ধলো বাহিরে কেবল
ভিতরে সবার সমান রাঙা’
অথবা,
‘গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই
নহে কিছু মহীয়ান;’
তখন তা আমাদের কাছে নতুন ঠেকে না। কেননা প্রকৃত বাঙালির অন্তরের বাণী স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চারিত হতে দেখেছি আমরা কত কত কাল আগে।
ওহাবী–ফরায়েজী আন্দোলনের পূর্বে এখানে শরীয়তী ইসলামও তেমন আমল পায়নি। এক প্রকার লৌকিক তথা দেশজ ইসলামই লোকের অবলম্বন হয়েছিল। তখন পার্থিব জীবনের স্বস্তির ও জীবিকার নিরাপত্তার জন্য কল্পিত হয়েছিলেন দেব–প্রতিম পাঁচগাজী এবং পাঁচপীর। নিবেদিত চিত্তের ভক্তি লুটেছে খানকা, অর্ঘ্য পেয়েছে দরগাহ আর শিরনী পেয়েছেন দেশের সেনানী–শাসক জাফর–ইসলাম–খান জাহান গাজীরা এবং বিদেশাগত বদর–আদম–জালাল–সুলতান প্রভৃতি সুফীরা, তার পরেও প্রয়োজন হয়েছিল সত্যপীর–খিজির–বড়খাঁ–গাজী–কালু–বনবিবি–ওলাবিবি প্রভৃতি দেবকল্প কাল্পনিক পীরের।। এঁরা বাঙালির ঐহিক জীবনের নিয়ন্তা দেবতা। জীবনবাদী বাঙালি এঁদের উপর ভরসা করেই সংসার–সমুদ্রে ভাসাত জীবন নৌকা। এখানেই শেষ নয়। চিন্তাজগতে বাঙালি চিরবিদ্রোহী। বৌদ্ধ ব্রাহ্মণ্য ও মুসলিম ধর্ম সে নিজের মতো করে গড়তে গিয়ে যুগে যুগে চিন্তাজগতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। বাহ্যত সে ভাববাদী হলেও, উপযোগ–তত্ত্বেই তার আগ্রহ ও আস্থা ও অগ্রিহ অধিক।
বৌদ্ধযুগে বৌদ্ধ বজ্রযান–সহজযান–কালচক্রযান, থেরবাদ, অবলোকিতেশ্বর ও তারা দেবতার প্রতিষ্ঠা এবং যোগতান্ত্রিক সাধনায় বিকাশ সাধন করে সে তার স্বকীয়তার, সৃষ্টিশীলতার, মনন বৈচিত্রের ও স্বাতন্ত্র্যের স্বাক্ষর রেখে গেছে।
ব্রাহ্মণ্যযুগে জীমূতবাহন, বল্লালসেন, রামনাথ, রঘুনাথ, রঘুনন্দন প্রভৃতি নব্যস্মৃতি ও নব্যন্যায় সৃষ্টি করে তাঁদের চিন্তার ঐশ্বর্যে ও প্রজ্ঞার প্রভায় জ্ঞানলোক সমৃদ্ধ ও উজ্জ্বল করেছেন। মুসলিম আমলে চৈতন্যদেবের নবপ্রেমবাদ, সত্যপীরকেন্দ্রী নবপীরবাদ, চাঁদ সদাগরের আত্মসম্মানবোধ এবং তেজস্বিতা, বেহুলার বিদ্রোহ ও কৃষ্ণসাধনা, গীতিকায় পরিব্যক্ত জীবনবাদ আমাদের সাংস্কৃতিক অনন্যতা এবং বিশিষ্ট জীবন–চেতনার সাক্ষ্য।
তারপরেও কি আমরা থেমেছি। রামমোহনের ব্রাহ্মমত, বিদ্যাসাগরের শ্রেয়োবোধ, ওহাবী–ফরায়েজী মতরাদ, রবীন্দ্রনাথের মানবতা, নজরুল ইসলামের মানববাদ কি সংস্কৃতিক্ষেত্রে আমাদের এগিয়ে দেয়নি?
মনীষা ও দর্শনের জগতে বাঙালি মীননাথ, কানপা, তিলপা, শীলভদ্র, দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান অতীশ, জীমূতবাহন, রঘুনাথ, রঘুনন্দন, রামনাথ, চৈতন্যদেব, রূপ–সনাতন, জীব–রঘুনাথাদি গোস্বামী, সৈয়দ সুলতান, আলাউল, হাজী মুহাম্মদ, আলিরজা, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস, কৃত্তিবাস–কাশীদাস–রামমোহন–বিদ্যাসাগর–মধুসূদন, তিতুমীর–শরীয়তুল্লাহ্–দুদুমিয়া, বঙ্কিম–রবীন্দ্র–প্রমথ–নজরুল নির্মাণ করেছেন বাঙালি মনীষার এবং সংস্কৃতির গৌরব মিনার। এঁদের কেউ বলেছেন ঘরের ও ঘাটের কথা, কেউ জানিয়েছেন জগৎ এবং জীবন রহস্য, কারো মুখে শুনেছি প্রেম, সাম্য ও করুণার বাণী, কারো কাছে পেয়েছি মুক্তবুদ্ধি ও উদারতার দীক্ষা, কেউবা শিখিয়েছেন ঘর বাঁধা ও ঘর রাখার কৌশল, কেউ শুনিয়েছেন ভোগের বাণী, কেউ জানিয়েছেন ত্যাগের মহিমা, আবার কেউ দেখিয়েছেন মধ্যপন্থার ঔজ্জ্বল্য। আত্মিক, আর্থিক, সামাজিক, পারমার্থিক সব মন্ত্রই আমরা নানাভাবে পেয়েছি এঁদের কাছে।
বাঙালির শক্তি হানাহানির জন্যে নয়, তার প্রয়াস ও লক্ষ্য নিজের মতো করে স্বচ্ছন্দে বেঁচে থাকার। স্বকীয় বোধ–বুদ্ধির প্রয়োগে তত্ত্ব ও তথ্যকে, প্রতিবেশ ও পরিস্থিতিকে নিজের জীবনের ও জীবিকার অনুকূল এবং উপযোগী করে গড়ে তোলার সাধনাতেই বাঙালি চিরকাল নিষ্ঠ ও নিরত। ওহাবী, ফরায়েজী এবং সশস্ত্র বিপ্লবকালে বাঙালির বল ও বীর্য, ত্যাগ ও অধ্যবসায় বাঙালির গৌরবের বিষয়।
স্বাতন্ত্র্য আসে উৎকর্ষে, অনন্যতায় ও অনুপমতায়– বৈপরীত্যে ও বিভিন্নতায় নয়। বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যও তার উৎকর্ষে, নতুনত্বে এবং অনন্যতায়। আজ বাঙালি আত্মস্থ হয়েছে। তার আত্মজিজ্ঞাসা হয়েছে প্রখর, সংহতিকামনা হয়েছে প্রবল। শিক্ষিত তরুণ বাঙালি জেগেছে, তাই সে তার ঘরের লোককে জাগাবার ব্রত গ্রহণ করেছে। বলছে– ‘বাঙালি জাগো’। জাগ্রত মানুষই সংস্কৃতি চর্চা করে। এবার স্বস্থ ও প্রকৃতিস্থ বাঙালি জাগবে এবং সংস্কৃতিক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে যাবে। জীবনে ও জগতে সে নতুনকে করবে আবাহন এবং নতুন ও ঋদ্ধ চেতনায় হবে প্রতিষ্ঠিত।
(পরবর্তী পর্ব ০৩ এপ্রিল, ২০২৬-এ প্রকাশিতব্য)
ফিচার ফটো অলংকরণ: অভি মজুমদার
লেখক:
জুলফিকার নিউটন
লেখক, গবেষক ও অনুবাদক; ঢাকা
*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক