রমজান মাস, ঈদ আগত প্রায়। ঈদের আয়োজনকে অধিকতর উৎসবমুখর করবার চেষ্টায় পাক হানাদারেরা শহরের বিভিন্ন মার্কেট বিশেষ করে বায়তুল মোকাররম, ষ্টেডিয়াম, জিন্নাহ এভিনিউ (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ) ও নিউমার্কেটে কড়া টহল ব্যবস্থা নিয়েছে। পাকিস্তানি সেনারা দুটো করে বেশ ক’টি কনভয় নিয়ে শুধুমাত্র বায়তুল মোকারমের চারদিকেই পাহারায় থাকে। জিন্নাহ এভিনিউর দিকে দুটো, একটা পশ্চিম দিকে ফরেন পোস্ট অফিসের দিকে, উত্তরে পুরানা পল্টনের দিকে দুটো এবং পূবদিকে দুটো। সব মিলে বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি সেনা এখানে অবস্থান করে এবং সন্দেহ হলেই মানুষকে তল্লাশি করে।
দেশে চলমান যুদ্ধাবস্থায় রমজানের এসময়ে অনেক সাধারণ মানুষও মার্কেটে আসে কেনা-কাটা করতে। এই অবারিত কেনা-কাটায় বিঘ্ন ঘটাতে হবে। তাই সেক্টর হেডকোয়ার্টারের নির্দেশে ঢাকার গেরিলারা হানাদারের কবল থেকে নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের মুক্ত হবার আগে এই ঈদের স্বাভাবিক উদযাপন বন্ধের আহ্বান সম্বলিত কিছু লিফলেট বিলি করে সাধারণ মানুষের মাঝে। এরই এক পর্যায়ে পাক হানাদারদের লক্ষ্য করে ঢাকা শহরে ঈদ শপিংকালে একটি অপারেশন পরিচালনার নির্দেশ আসে ঢাকার গেরিলাদের কাছে।
রাইসুল ইসলাম আসাদকে এই অভিযানের দায়িত্ব দেয়া হল। আসাদ তার সাথে অভিযানে অংশ নেয়ার জন্যে আরিফুল মওলা, জাহিদুল ইসলাম, ফিরোজ আহমেদ, সৈয়দ ইকবাল নাজমী ফেরদৌস, নজিবুল্লাহ জন, আহসান নেওয়াজ বাবুকে বেছে নিলেন। এ অভিযানে মুক্তিযোদ্ধারা বায়তুল মোকাররম মার্কেটের সামনে একটি গাড়ী বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেবার পরিকল্পনা করেন। ক্যাম্পের প্রয়োজনে বায়তুল মোকাররমের কোন একটা ইলেক্ট্রনিক্সের দোকান থেকে একটি ক্যামেরা ও টেপ রেকর্ডার জোগাড় করার নির্দেশও দেয়া হয়।
১১ নভেম্বর সকালে, আরিফ জাহিদুলকে সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধেশ্বরী লেনে পৌঁছোন। সেখানে একটি ভক্সহলভিভা গাড়ী থামিয়ে মালিককে জানান যে একটি মিশনে ব্যবহারের জন্যে এই গাড়ীটি তাদের প্রয়োজন। গাড়ীর মালিক সন্তুষ্টচিত্তে তাদের অনুরোধ রক্ষা করে স্কুলছাত্রী মেয়েকে নিয়ে গাড়ী থেকে বের হয়ে যান। আরিফ গাড়ীর মালিককে অনুরোধ করেন একটু ধীরে সুস্থে গাড়ী হাইজ্যাকের রিপোর্ট পুলিশকে জানাতে। এরপর আরিফ ও জাহিদুল গাড়ী নিয়ে বেলী রোডের নওরতন কলোনীতে তাদের হাইডআউটে নিয়ে যান। সেখানেই সঙ্গীরা গাড়ীটিতে ৯ পাউন্ড ওজনের প্লাস্টিক বিস্ফোরক লাগিয়ে অপারেশনের জন্যে তৈরী করে ফেলেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী এরপর আরিফ আর ফেরদৌস গাড়ী নিয়ে বায়তুল মোকাররমের পূর্ব দিকের পার্কিংলটে দাঁড় করালেন। ফেরদৌস ছাড়া বাকিরা গাড়ী থেকে নেমে গেলেন। আরিফ আর জাহিদুল গ্রেনেড রাখা আলাউদ্দিনের মিষ্টির বাক্স হাতে মার্কেটের ভেতরের দিকে চলে গেলেন। ফেরদৌস গাড়ীর ভেতরে বসে বিস্ফোরকের ফিউজে আগুন দিলেন এবং দ্রুত গাড়ী থেকে বের হয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে এলেন। আরিফ তার অবস্থান থেকে নজর রাখছিলেন গাড়ীর দিকে। সময়ানুসারে কোন বিস্ফোরণ ঘটল না। সকলেই কিছুটা বিস্মিত ও বিভ্রান্তিতে পড়ে গেলেন।
ফকিরেরপুলের হাইডআউটে অপেক্ষমান এ অপারেশনের সমন্বয়ক রাইসুল ইসলাম আসাদ অপারেশনের অসফলতার খবর পেয়ে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন কেননা দুষ্প্রাপ্য ৯ পাউন্ড প্লাস্টিক বিস্ফোরক রয়ে গেছে গাড়ীতে। তাই তিনি অবিলম্বে গাড়ীটি ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিলেন।
আসাদ সিদ্ধান্ত নিলেন দ্বিতীয়বার অপারেশন পরিচালনার এবং এবার তিনি নিজেই অপারেশন পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন। তিনি জানতেন যে নিজের অপারেশনে সরাসরি যুক্ত হওয়া এবং একই স্থানে, বিশেষ করে যেখানে কিছুক্ষণ আগে অপারেশন ব্যর্থ হয়েছে সেখানে একই দিনে আবার অপারেশন পরিচালনা একেবারেই গেরিলাযুদ্ধরীতি বিরুদ্ধ। তাঁর মনে আছে, একবার ব্যর্থ হলে সে বিস্ফোরকে কোনো অবস্থাতেই হাত দেওয়া যাবে না, সুবেদার কিবরিয়ার এমন সাবধান বাণী। কিন্তু আসাদের কাছে তখন বিস্ফোরক জীবনের চেয়েও অনেক মূল্যবান। আর এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন ব্যর্থ হবে তা মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি কোনভাবেই।
তাই গাড়ী ফেরত এলে আরিফকে নিয়ে আসাদ বের হয়ে প্রথমে গেলেন ৪নং নওরতন কলোনীর হাইডআউটে। সেখান থেকে আখতারী আলি জলিকে সঙ্গে নিলেন, গাড়ীতে নারী যাত্রী থাকলে পাকিস্তানিরা খুব বেশী তল্লাশি করে না, সে কারণে। এরপর পশ্চিম তেজতুরি বাজারের আরেক হাইডআউটে যেখানে ভাড়া করা বেড়ার একটি ঘরের মাচার (ফলস সিলিং) উপরে রাখা হতো গেরিলা সরঞ্জাম সেখান থেকে আরেকটি ফিউজ নিয়ে ফিরে এলেন নওরতন কলোনীতে এবং সেখানে বসে বৃষ্টিতে ড্যাম্প হয়ে যাওয়া ফিউজকে সাবধানে শুকনো করে গাড়ীর প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভে জুড়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশনে।
এবার গাড়ী চালাচ্ছেন ফিরোজ। পল্টনের দিক থেকে ফরেন পোষ্ট অফিস বিল্ডিংকে ডান পাশে রেখে বায়তুল মোকাররমের পশ্চিম পাশের রাস্তায় গেরিলারা যখন পৌঁছলেন তখন ঘড়িতে দুপুর দুটো বেজে চল্লিশ মিনিট। পুরো রাস্তাটা পার হয়ে গাড়ী জিন্নাহ এভিনিউতে বের হয়ে চলে এলো বায়তুল মোকাররমের পূর্ব পাশে। কিন্তু সুবিধাজনক স্থান না পেয়ে গাড়ী ঘুড়িয়ে এবার দক্ষিণ দিক দিয়ে জিপিওকে বাঁ হাতে রেখে আসাদ ফিরোজকে আবার বায়তুল মোকাররমের পশ্চিমের রাস্তায় নিয়ে যেতে বললেন। ফিরোজ গাড়ী নিয়ে এলেন। আসাদ গাড়ীটি নিয়ে ফ্যান্সি ষ্টোরের সামনে দাঁড়ানো একটি সামরিক জিপ ও ট্রাকের মাঝখানে পার্ক করতে বললেন। জিপটি খালি আর ট্রাকে কয়েকজন সৈন্য রয়েছে। আসাদ ফিরোজকে গাড়ী থেকে নেমে গ্যানিসের (গ্যানিস বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণে জিন্নাহ এভিনিউর একটি বিলাসবহুল দোকান) দিকে চলে যেতে বললেন। আর অন্যরা তো ইতোমধ্যেই নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে মার্কেটের বিভিন্ন জায়গায় কেউ ইলেক্টনিক্সের দোকানে কেউ মিষ্টির বাক্সে লুকোনো গ্রেনেড হাতে তৈরী হয়েই রয়েছেন।
ফিরোজ নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছনো পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন আসাদ। এবার দুটি সামরিক যানের মাঝখানে বসে ফিউজে আগুন লাগাবার মত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ শুরু করলেন। ট্রাকের সৈন্যরা গল্পে মশগুল তাই খেয়াল করল না যে তাদের ট্রাকের পাশেই একটি বেসামরিক গাড়ী এসে দাঁড়িয়েছে। আসাদ পথাচারীদের দৃষ্টি এড়িয়ে ড্যাশবোর্ডের নিজে দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে ফিউজে আগুন ধরিয়ে দিলেন। এবারের ফিউজটা আগের তুলনায় ছোট, তাই আসাদকে দ্রুত গাড়ী ত্যাগ করতে হবে। উদ্বিগ্ন আসাদ ফিউজ ঠিকমত জ্বলছে কিনা তা নিশ্চিত হতে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে দ্রুত গাড়ী থেকে বের হয়ে মার্কেটের পূর্ব ও পশ্চিমকে যুক্ত করা করিডরে পৌঁছলেন।
আর ঠিক তখনই আসাদের পেছনে বিকট আওয়াজে বিস্ফোরণ ঘটল। প্রায় একই সময়ে কাছেই পরপর দুটো গ্রেনেড বিস্ফোরণের শব্দ কানে এলো আসাদের। ঘড়িতে তখন বাজে দুপুর ৩টা।
গেরিলারা একই সময়ে পরিকল্পনা মাফিক ঐ মার্কেটের ইলেক্ট্রনিক্সের দোকান থেকে টেপ রেকর্ডার ও ক্যামেরাও হাতিয়ে নিয়েছিলেন। অতঃপর পূর্ণ সফলতার পরিতৃপ্তি নিয়ে হাইডআউটে ফিরেছিলেন গেরিলারা।
সন্ধ্যা নাগাদ বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকা থেকে খবর প্রচার হলে অপারেশনের খবর পেয়েছিল বাংলার মুক্তিকামী কোটি মানুষ। পরদিন দৈনিক ইত্তেফাকসহ কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছিল এ অপারেশনে ৬ জন নিহত ও ৫৮ জনের আহত হবার খবর।
বাঙালীয়ানা/এসএল