বিপ্লবের লাল ফুল কমরেড তাজুল । হিলাল ফয়েজী

Comments

বাংলা মায়ের একজন সন্তান তাজুল ইসলাম শহীদ হয়েছিলেন ১৯৮৪ সালের লিপইয়ারের ২৯ ফেব্রুয়ারী, আদমজী পাটকলের বিশাল শ্রমিক অঙ্গনে। ওই পাটকলটিতে তখন এরশাদ শাহির অনুচর শ্রমিক নেতা একদল দাঙ্গাবাজ পাঠিয়ে মধ্যরাতের মিছিলে হামলা চালিয়ে মাথা থেঁতলে তাজুলকে হত্যা করেছিল। (গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে ২৯ ফেব্রুয়ারী মধ্যরাতের পরে মার্চের ১ তারিখে সেখানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। – সম্পাদক) স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের গভীর থেকে তাজুল জীবনের রূপকথা কাহিনী অবহিত হয়ে মানুষ মুগ্ধ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যায়। আত্মদানের অমর অক্ষরে তাজুল তার স্বতন্ত্র, স্বকীয় মানচিত্র আঁকে ইতিহসের ইজেলে। কেমন স্বতন্ত্র, কেমন স্বকীয়? বিশেষত শ্রমিকশ্রেণীকে সংগঠিত আগুয়ান করে স্বদেশ-স্বপ্রান্তের সব প্রান্তিক গণমানুষকে নিয়ে বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে কমিউনিস্টরা মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছিল। এটি বিগত শতাব্দীর কথা। বিশেষত এই বাংলা ওই বাংলা মিলিয়ে আমরা একঝাঁক বাস শ্রমিক নেতার মুখ দেখেছিলাম, শ্রমিক অধিকার আদায়ে যারা সর্বপ্রহর নিবেদিত ছিল। তাজুল বাইরের আরোপিত শ্রমিক নেতা হয়ে আদমজীতে ঢোকেননি। পাটের আঁশ দিয়ে চট বুননের যন্ত্র চালনার একজন শ্রমিক হিসেবে কাজ নিয়েই তিনি শ্রমিক আন্দোলনে ভূমিকা নিতে চেয়েছিলেন। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সর্বোচ্চ পর্যায়ের শিক্ষার্থী হিসেবে ওই শীতলক্ষ্যা নদীপ্রান্তের আদমজী পাটকলের উঁচু পদে সমাসীন হওয়ার যোগ্যতা মেধাবী তাজুল ধারণ করেছিলেন।

আমরা পৃথিবীজুড়ে মানবমুক্তির সংগ্রামে এমন নজির আর একটিও দেখিনি। ‘গোলাপের মতো গোলাপ’ হতে চেয়েছিলেন কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সেটি কবিতার কল্পনা-চরণে। আর তাজুল বাস্তব জীবনের কঠিন প্রান্তরে সচেতনভাবেই হতে চেয়েছিলেন একজন ‘শ্রমিকের মতো শ্রমিক’ হিসেবেই। তিনি জানতেন, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জটিলতা-যন্ত্রণা-প্রতিকূলতার দংশন কেমন!

তাজুল ইসলাম অধুনা চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলাধীন মেঘনা-ধনাগোদা নদীমুখী এক ভূখণ্ডে জন্ম নিয়েছিলেন বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। দারিদ্র্য ছিল তার জন্মসঙ্গী প্রতিবন্ধক। তাই জীবনের স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগ থেকে তাজুল ছিলেন নিষ্ঠুরভাবে বঞ্চিত। কিন্তু প্রতিকূলতার হিমালয় ডিঙিয়ে তিনি আত্মদানের এভারেস্টে আরোহণ করে মানবমুক্তির চিরায়ত বীর পঙ্ক্তিতে ঠাঁই করে নিয়েছিলেন জীবন রূপকথার জন্ম দিয়েই।

অসম্ভব মেধাবী তাজুল দারিদ্র্যকে মোকাবেলা করেছেন অদম্য সাহসে। শিশুশ্রমের কঠিনকে বরণ করেছিলেন সহজেই। এরই পাশাপাশি লেখাপড়া করেছেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞায়। ফলাফল করেছেন ভালো। ঢাকা কলেজে ভর্তি হলেন ১৯৬৬ সালে। প্রথম বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক ডিঙিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র হলেন ১৯৬৮ সালে। এ সময়ে ছাত্র ইউনিয়ন সংগঠনের পতাকা উঠে গেল তার হাতে। সেই থেকে নবঅভিযাত্রা। ১৯৭১ সালে তাজুল ইসলাম পরিণত হলেন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধায়। শিক্ষাঙ্গনে ফিরে এসে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একজন হলেন তিনি। কমিউনিস্ট পার্টির সাংগঠনিক বলয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়ে এক অসাধারণ রূপান্তরের মানসপর্বে তিনি ছাত্রজীবন শেষে শ্রমিক আন্দোলনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকলেন। কাজের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিলেন শ্রমিক আন্দোলনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং প্রান্তর ঢাকার অদূরে সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী পাটকলে।

শ্রমিক বস্তিতে থাকতেন তিনি। নাসিমা খুকু নামের একজন জীবনসঙ্গী পেয়েছিলেন তিনি। সন্তানদের প্রয়োজনীয় দুধ কিনে দেওয়ার সঙ্গতি ছিল না। শিক্ষকের জীবন গ্রহণ করে নাসিমা দাঁড়ালেন তাজুলের পাশে সব কঠিনকে বরণ করেই। তাজুল জীবন বয়ানে তাই তাজুল-নাসিমা চলে আসেন সম্মানের একই বৃত্তে। আদমজীতে শ্রমিক আন্দোলনের মতলববাজ নেতারা শুদ্ধ জীবনাচারী নবশ্রমিক নেতৃত্বের এই প্রতিনিধি তাজুল ইসলামকে সহ্য করতে পারেনি। তাজুলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে আশঙ্কিত ছিল তারা। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সুযোগে তাই তাজুলকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়ে বুঝিবা স্বস্তি পেতে চাইল তারা।

তাজুল প্রয়াণ বার্ষিকীতে ‘বিপ্লবের লাল ফুল’ তাজুলকে আমরা বীর শ্রেষ্ঠের সম্মানে ভরপুর করে দিতে চাই। চাইলেই কেউ তাজুল হতে পারে না। অমন দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকে ক্ষুদিরাম- সূর্য সেন-তিতুমীরদেরই। তাজুল যেভাবে শ্রমিকশ্রেণীর গভীরে লীন হয়ে মানবমুক্তির সাধনা করেছেন, তা অতুলনীয়। শহীদ তাজুল ইসলাম, সশ্রদ্ধ অভিবাদন!

লেখক:
Hilal Fayeji
হিলাল ফয়েজী, প্রাক্তন যুব ইউনিয়ন নেতা, রম্যলেখক ও গবেষক

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.