বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে পিএইচডি বাধ্যতামূলক হবে কবে। অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন

Comments

ভারত ২০২১-২২ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে পিএইচডি ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করছে। এর আগে এটা অনানুষ্ঠানিক ছিল বিশেষ করে বিজ্ঞান অনুষদগুলোতে।

সত্যি বলতে কি বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে পিএইচডি হলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরী পাবে এরও কোন গ্যারান্টি ছিল না, কারণ তারা শুধু একটা না বরং একাধিক পোস্ট-ডক সম্পন্ন করা অনেক প্রার্থী পায় যাদের রেখে শুধু পিএইচডি করাকে তারা কেন নেবে ? আমি অনেক দিন ধরে বলে আসছি যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগের ক্ষেত্রেও এটা ভাবা এখন সময়ের দাবি।

তারপরও আমরা মাস্টার্স পাশ করা প্রার্থীকে যদি নিয়োগ দেইও সেটা করা উচিত প্রভিশনাল যেটা আমেরিকায় বলে নন-টেনুর ট্র্যাক পজিশন। অর্থাৎ চাকুরী পার্মানেন্ট না। মাস্টার্স পাশধারীকে আমরা টেম্পোরারি বেসিসে নিয়োগ দিয়ে পিএইচডি হওয়া সাপেক্ষে চাকুরী পার্মানেন্ট করতে পারি। তবে সব ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রমের ব্যবস্থা থাকতে পারে এবং থাকা উচিত। কেউ যদি মাস্টার্স করেও গবেষণায় এমন স্বাক্ষর রাখতে পারে যা অনেক পিএইচডি ধারীরও নেই সেই ক্ষেত্রে বিশেষ মূল্যায়নের স্বাপেক্ষে বিশেষ বিবেচনা করা যেতে পারে।

সমস্যা হলো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর অনেক উচ্চ পদধারী আছেন যাদের পিএইচডি নেই। তারা এই আইডিয়ার বিরোধিতা করবেই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তথা দেশের সার্বিক মঙ্গল চাইলে আমাদের নিয়োগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে হবে।

 

আমাদের নিয়োগ, মানে নিয়োগ বোর্ডের সামনে থাকে ২০-৩০ মিনিটের একটা ইন্টারভিউ। সমস্যা হলো সেই বোর্ডের সকল সদস্যের পদ-পদবী এবং ক্ষমতা সমান না। নিয়োগ বোর্ডের প্রধান থাকেন হয় ভিসি না হয় প্রো-ভিসি। এছাড়া একজন ডিন, সংশ্লিষ্ট বিভাগের চেয়ারম্যান, একজন এক্সপার্ট। যেই বোর্ডে ভিসি অথবা প্রো-ভিসি থাকে সেই বোর্ডের বাকি সদস্যরা কতটা ভোকাল থাকতে পারবে।

এছাড়া পৃথিবীর সর্বত্র শিক্ষক নিয়োগ একটি দীর্ঘ্য প্রক্রিয়া। তার জন্য থাকে সার্চ কমিটি। আর আমাদের হলো নিয়োগ বোর্ড। সেই সার্চ কমিটিই প্রাথমিক কাজটি rigorously এবং vigorously করে। কারণ এরা জানে শিক্ষক কত গুরুত্বপূর্ণ। একজন ভালো শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারলে তার কি ইমপ্যাক্ট সেটা তারা ভালো করে জানে। আরেকজন খারাপ মানুষকে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দিলে তার কি ইমপ্যাক্ট সেটাও তারা জানে। একজন খারাপ শিক্ষক পরিবেশকে দূষিত করে। বছর বছর যতজন ছাত্রকে পড়াবে গুন যতবছর চাকুরী করবে সেই গুনফল সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর ক্ষতি সে করবে। ওই সংখ্যক ছাত্রের প্রত্যেকেই প্রায় একই রকম ক্ষতি করবে। অর্থাৎ এটা একটা ক্যাসকেডিং ইফেক্ট। অথচ শিক্ষক নিয়োগে আমরা কত হেলাফেলাই না করি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে হলে মাস্টার্স এবং পিএইচডি ছাত্র সুপারভাইস করার মত যোগ্যতা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে কিভাবে। আর এই যোগ্যতার ন্যূনতম মাপকাঠি হলো পিএইচডি। সমস্যা হলো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেক হর্তাকর্তাদের পিএইচডি নেই। স্বয়ং ইউজিসির চেয়ারম্যানেরই পিএইচডি নেই। তাহলে আমরা কেমন করে আশা করব যে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে পিএইচডি ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করা হবে?

স্বয়ং ইউজিসির চেয়ারম্যানেরই পিএইচডি নেই। তাহলে আমরা কেমন করে আশা করব যে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে পিএইচডি ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করা হবে?

যখন যেই সরকার থাকে সেই সরকারপন্থী শিক্ষকরা হয়ে মাফিয়ার মত। তাদের ছাত্রছাত্রীরাই তখন শিক্ষক হয়। এটা যেন এখন অনেকটা ওপেন সিক্রেট। তাই ছাত্রছাত্রীরাও বুঝে গেছে তাদের কি করা উচিত। ওই শিক্ষকরাই হলো দেশ ও সমাজের সবচেয়ে বড় শত্রু। এদের প্রতিহত করতে না পারলে বিশ্ববিদ্যালয় তথা দেশ কখনো সামনে আগাবে না।

 

লেখক:

ড. কামরুল হাসান মামুন

 

 

অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট