“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের স্নাতক সম্মান (সমাপনী-২০১৫) পরীক্ষায় রেকর্ড সংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে” এই ধরণের শিরোনামে সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষ করে ফেইসবুকে বেশ আলোচনা হচ্ছে। বিষয়টা অনেক গভীরে ভাবার বিষয়। এর গভীরতা অনুধাবন না করে যা ইচ্ছে মন্তব্য করা ঠিক নয়। প্রথম কথা হলো কেউ লিখছে ১১২ জনের মাঝে মাত্র ৪১ জন পাশ করেছে আবার কেউ লিখছে ৯৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ৪৬ জন। মন্তব্য করতে গিয়ে অনেকেই আবার কোন একটি সাবজেক্টকেই ইঙ্গিত করছেন। কেউ কেউ আবার লিখেছেন যে, বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ৩৭ থেকে ৩৯ পেয়েছেন বলে জানা গেছে তাই ‘স্যার চাইলেই উত্তীর্ণ করে দিতে পারতেন কিন্তু তিনি তার করেননি। কথা হলো ৩৭ থেকে ৩৯ নম্বর যদি কেউ পেয়ে থাকে সেটা কিন্তু দুইজন পরীক্ষকের গড় নম্বর তাই ফাইনাল গড় নম্বর কত হবে সেটা নির্ভর করে দ্বিতীয় পরীক্ষক কত দিয়েছে তার উপর। তাই স্যার কিভাবে জানবেন কত নম্বর দিলে পাশ করে যাবেন? তাছাড়া আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, নম্বর প্রাপ্তি কোন দানের বিষয় না, এটা পরীক্ষার্থীর অর্জনের বিষয়। আমি এমন ছাত্র জানি যারা প্রথম বর্ষ থেকে চতুর্থ বর্ষের মধ্যে শেষ বর্ষেই জিপিএ সবচেয়ে বেশি পেয়েছে। অর্থাৎ পড়ালেখা করলে ভালো করা যায়। এছাড়া অনেকেই শুনেছি অনেক ভালোও করেছে।
ধরা যাক কিছু ছেলেমেয়ে উচ্চ লম্ফ শিখতে চায়। সরকার তাদের জন্য বিদেশ থেকে কোচ নিয়োগ দেয় তাদেরকে ভালো করে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য। প্রশিক্ষক কি করবে? আমাদের স্কুল জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই সেটা জানি। আমরা দেখেছি প্রশিক্ষণের সময় আমাদের ক্রীড়া শিক্ষক উচ্চ লম্ফের বারটি প্রথমে যেখানে রাখেন সেখান থেকে ধীরে ধীরে উপরে উঠান। বিদেশী কোচও সেই কাজটি করবেন এবং সারা পৃথিবীতেই এই কাজটি করা হয়। উচ্চতার বারটি আস্তে আস্তে উপরে তুলতে তুলতে এমন উচ্চতায় নেওয়া হয় যা শিক্ষার্থীদের জন্য সেই উচ্চতা অতিক্রম করা কঠিন হয়ে পরে। এই কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়াই হলো ভালো করানোর মূল মন্ত্র। লেখাপড়াটাও ঠিক তেমনি। পরীক্ষার প্রশ্ন, প্রশ্নের মান এবং উত্তরপত্র পরীক্ষণের মান মিলে শিক্ষা ক্ষেত্রে উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়। আমরা যদি প্রশ্নগুলোকে দিন দিন সহজ থেকে সহজতর করা কি ঠিক। এটা করলে যাদের জন্য সহজ করা হলো তাদের কাছে আপাত ভালো মনে হতে পারে কিন্তু এটা কি দেশের শিক্ষার মান উন্নয়নে ধনাত্বক অবদান রাখবে নাকি ঋনাত্বক অবদান রাখবে?
এই যে আমরা এসএসসি এইচএসসির প্রশ্নের মান আর উত্তরপত্র মূল্যায়নের মান দিনদিন নিচে নামিয়ে পাশের হার বাড়িয়ে আমরা দেশের কি প্রকৃত মঙ্গল সাধন করছি নাকি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলছি? এখন প্রাইভেট বা অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কি হচ্ছে সেই দিকে দৃষ্টি দিয়ে আমরা কি আমাদের মান নামিয়ে দিব? নামিয়ে দিয়ে সবাইকে খুশি করলেই কি ঠিক কাজটি করা হলো? পরীক্ষা হলো একটি ফিল্টারিং প্রসেস। যেই প্রতিষ্ঠানের ফিল্টারিং প্রসেস যত ভালো সেই প্রতিষ্ঠান সুনাম তত বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার মান নামিয়ে আনলে তার সুনাম আর অক্ষুন্ন থাকবে? আলোচ্য সাবজেক্টটি পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে এলিগেন্ট সাবজেক্ট। চতুর্থ বর্ষে আসার আগে এই সাবজেক্টটি তৃতীয় বর্ষেও পড়ানো হয়। তাছাড়া এই সাবজেক্ট বুঝতে হলে গণিতের লিনিয়ার এলজেব্রা ভালো করে বুঝতে হয়। এই দুটি সাবজেক্ট ভালো করে না পড়ে আসলে কেমন করে এই সাবজেক্টে ভালো করবে? তৃতীয় বর্ষের কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও গণিতের লিনিয়ার এলজেব্রা পড়ানোর এবং পড়ার সাথে চতুর্থ বর্ষে এসে কোয়ান্টাম মেকানিক্স কতটুকু বুঝবে এবং আনন্দ পাবে সেটা অনুধাবন করতে হবে। একটু অতীত ঘাটলে দেখা যাবে তৃতীয় বর্ষের কোয়ান্টাম মেকানিক্স কারা পড়িয়েছেন? এটা আমাদের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের জন্ম থেকেই পড়িয়ে আসছেন শুধু তত্বীয় পদার্থবিদই নন বরং তত্বীয়দের মধ্যে যারা শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ছিলেন তারাই পড়াতেন।
তৃতীয় বর্ষ বা ইন্ট্রোডাক্টরি কোয়ান্টাম মেকানিক্স পড়াতেন রফিকুল্লাহ স্যার। যার কথা আমাদের কবির স্যারের কাছে অনেক শুনেছি। আরো শুনেছি আমাদের শফী চৌধুরী স্যারের কাছে। কবির স্যার বলতেন উনি উনার জীবনে (দেশে-বিদেশে) যত শিক্ষকের ক্লাস করেছেন তার মধ্যে রফিকুল্লাহ স্যার সেরা। শফী চৌধুরী স্যারেরও একই কথা। একবার আমাদের বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র (আমাদের অনেক সিনিয়র) বামন দাস গুপ্তের সঙ্গে দেখা। উনি আমেরিকায় আছেন দীর্ঘ ৪০ বছরেরও বেশি যাবৎ। উনি যখন রফিকুল্লাহ স্যারের কথা বলছিলেন তখন দেখেছি ইমোশনে চোখ ভিজে আসছিল। উনি বলছিলেন স্যারের কথা বলতে গেলে আমি এমনই ইমোশনাল হয়ে যাই। শিক্ষকতা পেশা এমনই। কেউ কেউ এমনভাবে পড়ান যে তারা কিংবদন্তি হয়ে উঠেন। তারপর এই সাবজেক্ট পড়াতেন আমাদের সকলের প্রিয় হারুন স্যার, আমাদের কবির স্যার, আমাদের আহমেদ শফী স্যার, শমসের আলী স্যার প্রমুখ। এর আগে আমাদের বিভাগে যখন আরশাদ মোমেন ছিল সেও পড়াতো। কারণ এই সাবজেক্টটার বেসিক ফর্মালিজম দেওয়া হয় তৃতীয় বর্ষে। ওটা ঠিক না হলে ষোল আনাই মিছে। এখন দেখতে হবে সমস্যাটা হয়েছে কোথায়? সমস্যা কিন্তু অনেক জায়গায় হতে পারে।
বর্তমান স্কুল কলেজে যে শিক্ষার মান কমছে এটা কি তার প্রতিফলন? আমি যদি ৫০ জন অশিক্ষিত মানুষকে আমার ক্লাসে এনে পৃথিবীর সেরা lecture দেই তাতে কি কারো কিছু লাভ হবে? এরা বড়জোর আমার lecture কে অভিনয় ভাববে। আবার আমি যদি একজন বলদ শিক্ষক হই সেই তুলনায় ছাত্ররা অনেক ভালো এবং চরম মোটিভেটেড তাহলেও কি লাভ হবে। একটি ভালো ক্লাস হতে হলে এইদুইয়ের সমন্বয় দরকার। একটি ক্লাসের সাইজ কত হওয়া উচিত। এটা কি ক্লাসের সাইজের সমস্যা?
আমাদের অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর পড়াশুনার প্রতি আগ্রহ মরে যায় প্রথম বর্ষেই। এর নানা কারণ আছে যেমন একিউট আবাসিক সমস্যা, হলে নির্যাতন সমস্যা, আর্থিক সমস্যা ইত্যাদি। ইদানিং আবার আরেক রোগ দেখা দিয়েছে প্রথম বর্ষে একটু খারাপ করলেই ধরে নেয় তার দ্বারা আর পদার্থবিজ্ঞান হবে না। তার চেয়ে বরং বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। অনেক বাকি সময়টা কাটে ঐখানে ফোকাস রেখে। তাই কোয়ান্টাম মেকানিক্স ইলেক্ট্রোডিনামিক্স জাতীয় সাবজেক্ট ধারণ করার জন্য যেইরকম অধ্যবসায়ের দরকার সেটা থাকে না। কিন্তু এইসব সাবজেক্টতো ওহীর মাধ্যমে শেখা সম্ভব না। এখন শুধু উপস্থিতির নম্বরটা পাওয়ার জন্য শারীরিকভাবে ক্লাসে থাকলেই কি হবে? পৃথিবীর অন্য কোথাও এরকম ফল বিপর্যয় হলে এইসব বিষয় নিয়ে চুলছেড়া বিশ্লেষণ করে কোন না কোন পদক্ষেপ নেওয়া হতো। কিন্তু আমাদের সেই সময় নেই।
লেখক:
অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
