। লাবণী মণ্ডল ।
বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রামের পটভূমি বোঝার জন্য পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসকে কয়েক দশক আগে থেকে অনুসন্ধান করা জরুরি। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বিভাজনের পর ভারত ও পাকিস্তান দুটি ডমিনিয়ন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে; পরে সেগুলো স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপ নেয়। পাকিস্তান গঠিত হয় ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন দুটি অংশ—পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তান (বর্তমান পাকিস্তান) নিয়ে। জন্মলগ্ন থেকেই পূর্ব পাকিস্তান আর্থিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় বৈষম্যের শিকার হতে থাকে। যদিও জনসংখ্যার দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তান ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা দৃঢ়ভাবে কেন্দ্রীভূত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বাংলাভাষী মানুষের সংস্কৃতি ও ভাষার প্রতি অবজ্ঞা ও বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে শুরুর দিকেই। এর প্রতিবাদে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল জনগণের সংহতির প্রথম বড়ো প্রকাশ। পরবর্তীতে অর্থনীতি ও শিল্পায়নে বৈষম্যের কারণে ৬০-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে অসন্তোষ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রস্তাবিত ছয় দফা কর্মসূচি পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক সমতার দাবিকে সুস্পষ্ট রূপ দেয়।
১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়। এতে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয় এবং সামরিক হুমকি বাড়তে থাকে। অবশেষে ১৯৭১ সালের মার্চে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ঢাকা ও অন্যান্য শহরে সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। এই নৃশংসতা মুক্তির আন্দোলনকে সশস্ত্র স্বাধীনতার যুদ্ধে রূপান্তরিত করে।
সর্বোপরি, ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল ভাষা ও সংস্কৃতিগত বৈষম্য, অর্থনৈতিক শোষণ, স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে অস্বীকার এবং সামরিক দমননীতির এক জটিল সমাহার। এই পরিস্থিতিতেই জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব একত্রিত হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তি স্থাপন করেন। তাই ১৯৭১ কেবল ইতিহাস নয়, এটি মানুষের অবিচার ও শোষণের বিরুদ্ধে দৃঢ় সংগ্রামের এক অমোচনীয় দলিল।
গবেষণায় অনুভূতির প্রবাহ
১৯৭১—একটি সংখ্যা, যার ভেতর সন্নিবেশিত আছে অসংখ্য অনুচ্চারিত আর্তনাদ, অস্বীকৃত কান্না, আবার অপ্রতিরোধ্য দীপ্তিও। নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম, সংগঠিত গণহত্যা, গণধর্ষণ, নির্বিচার নির্যাতন, শরণার্থীর অমানবিক জীবনযাপন এবং পরিণতিতে বিজয়—বাংলাদেশের জন্মকাহিনি তাই বিশ্বমানবতার ইতিহাসে একই সঙ্গে ট্র্যাজেডি ও ট্রায়াম্পের প্রতীক। সময় যতই এগোয়, ততই স্পষ্ট হয়: এই স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক অর্জন নয়; এটি এক বিশাল সামাজিক–নৈতিক দায়—স্মৃতিকে ধারণ ও পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তরের দায়। অথচ পরাজিত রাষ্ট্র পাকিস্তান আজও রাষ্ট্রীয়ভাবে দুঃখপ্রকাশ করেনি; তৎকালীন কোনো সামরিক নায়ক কিংবা নীতিনির্ধারককেও সেখানে বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। আমাদের ভেতরেও শহিদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন কিংবা শহিদপরিবারের জন্য সমন্বিত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আজ অব্দি অনুপস্থিত। ফলে ইতিহাসের যে অংশ রাষ্ট্রীয় পরিসরে একটি পূর্ণাঙ্গ আর্কাইভ হওয়ার কথা ছিল, তার বড় অংশ এখনো কেবল গবেষণানির্ভর নাগরিক উদ্যোগে টিকে আছে।
এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক–গবেষক সালেক খোকনের ‘গৌরব ও বেদনার একাত্তর’ গ্রন্থটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, বইটি স্মৃতিচর্চাকে আবেগের গণ্ডি থেকে সরিয়ে প্রামাণ্যতার আলোয় নিয়ে আসার চেষ্টা করেছে। দ্বিতীয়ত, লেখক মাঠপর্যায়ে ঘুরে প্রত্যক্ষদর্শী, শহিদ–স্বজন ও মুক্তিযোদ্ধাদের মৌখিক বয়ান সংগ্রহ করেছেন—যা আমাদের মৌখিক ইতিহাসকে দলিল আকারে সংরক্ষণ করেছে। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক গণহত্যার বিচ্ছিন্ন ইতিহাস তুলে ধরে তিনি একাত্তরের বৃহত্তর প্রতিফলনে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছেন। ফলে বইটি দাঁড়িয়েছে স্মৃতি, ইতিহাস, সমাজনীতি ও ন্যায়বিচারের সন্ধিক্ষণে—এক জরুরি পাঠ্য হিসেবে।
লেখকের কাজের স্বাতন্ত্র্য হলো মাঠে গিয়ে মুখের বয়ান রেকর্ড করা, স্থানীয় নৃশংসতাকে মানচিত্রে চিহ্নিত করা এবং ঘটনাস্থলের সঙ্গে নথিপত্র, আলোকচিত্র ও সংবাদ–ক্লিপিং মিলিয়ে দেখা। এর আগে তাঁর ‘যুদ্ধদিনের গদ্য ও প্রামাণ্য’ (২০১৫) এবং ‘৭১-এর আকরগ্রন্থ’ (২০২১)-এ যে অনুসন্ধানী পদ্ধতির আভাস পাওয়া গিয়েছিল, ‘গৌরব ও বেদনার একাত্তর’-এ তা আরও সংহত ও আড়ম্বরহীনভাবে উপস্থিত হয়েছে। বইটির বড়ো শক্তি হলো—লেখক রেকর্ডকৃত কণ্ঠকে (শহিদ–স্বজন, প্রত্যক্ষদর্শী, মুক্তিযোদ্ধা) কেন্দ্র করে টেক্সট নির্মাণ করেছেন। ফলে ন্যারেটিভটি হয়ে উঠেছে ‘মানুষকেন্দ্রিক’ ও তাৎক্ষণিক। সঙ্গে রয়েছে প্রাসঙ্গিক দলিল, আলোকচিত্র ও পৃষ্ঠা–নির্দেশনা—যা পাঠককে তথ্যের ভেতর দিয়েই অনুভূতির প্রবাহ অনুভব করতে সাহায্য করে।
১৯৭১ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তেজনার শিখরে ছিল। খন্দকার মোশতাক চেয়েছিলেন পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে কনফেডারেশন গঠন, যা স্বাধীনতার দাবি দমাতে চেয়েছিল। এই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র সাধারণ মানুষের জীবনেও বিপর্যয় বয়ে এনেছিল। যে মানুষরা ইতিহাসে নথিভুক্ত হয়নি, তারাই জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়েছিল দেশের জন্য।
আবার যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাঁচতে মানুষ বাধ্য হয়েছিল শরণার্থী ক্যাম্পে যেতে। বর্ষার পানিতে ভিজে যাওয়া তাঁবু, শিশুদের কান্না, অভিভাবকদের হতাশা-সব মিলিয়ে মানবিক বিপর্যয়ের এক ভয়ঙ্কর ছবি ফুটে উঠেছিল। ইতিহাসে এদের যন্ত্রণার অনেক অংশ অদৃশ্য থেকে গেলেও, প্রত্যক্ষদর্শীদের মুখে তা জীবন্ত হয়ে ওঠে।
বইটির দুইটি স্পষ্ট স্তর আছে—(ক) গণহত্যার কেস স্টাডি: রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমি, সিলেটের কাইয়ার গুদাম, সৈয়দপুর, সিরাজগঞ্জসহ আটটি গণহত্যা এবং (খ) মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন–গদ্য: অন্তত দশজন বীর মুক্তিযোদ্ধার বয়ান; যেখানে প্রশিক্ষণ, রেশন, অপারেশন, ক্ষয়ক্ষতির কথা যেমন আছে; তেমনই আছে ভয়কে জয়ের নীরব গল্প।
এই বিন্যাসটি সচেতন। কারণ গণহত্যার বয়ান আমাদের ‘ক্ষত’কে অনুধাবনে সাহায্য করে, আর মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনের কথা সেই ক্ষতের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধের অভিঘাত শুনিয়ে যায়। লেখক শুরুতেই মনে করিয়ে দেন, ‘একেকজন মুক্তিযোদ্ধার জীবনের গদ্যই আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধের একেকটি ইতিহাস’ এবং এই নীতিই বইয়ের চালিকাশক্তি।
গণহত্যার অভিঘাত
থানাপাড়া গণহত্যা
শহরের নির্জন প্রান্তে থানাপাড়া। ভোরে ঘুম থেকে উঠে মানুষ দেখল—তাদের ঘরবাড়ি আগুনে পুড়ে ছাই, চারপাশ রক্তে রঞ্জিত। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলতেন, শহিদরা রক্ত ও মাটির সঙ্গে মিশে যেন যুদ্ধে পা বাড়িয়েছিলেন, তাদের আত্মত্যাগ মাটিকে পবিত্র করেছিল। শহিদ আবদুল ওহাবের বীরত্ব ইতিহাসে খুব বেশি জায়গা না পেলেও প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিতে তিনি অম্লান।
গোলারহাট গণহত্যা
গোলারহাটের হত্যাযজ্ঞ ছিল অচিহ্নিত ও অনিশ্চিত। কে কখন মারা যাবে—কেউ জানত না। সাধারণ মানুষের বুকের রক্ত নদীতে মিশে যেত। এখানে শহিদদের মৃত্যু কেবল হত্যাকাণ্ড নয়, মানবতার চূড়ান্ত পরীক্ষা এবং নির্দয়তার নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
জঙ্গি পাইলট ও জেড ফোর্সের রণাঙ্গন
যুদ্ধক্ষেত্রে জঙ্গি পাইলটদের আক্রমণ এবং জেড ফোর্সের সংঘর্ষে দেখা যায় সাহস, আত্মত্যাগ ও কৌশলের এক অনন্য মেলবন্ধন। আকাশ, নদী ও মাটির প্রতিটি রণাঙ্গনে মানুষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন রক্ষা করেছে। এ ঘটনাগুলো শুধু যুদ্ধের ইতিহাস নয়; এগুলো মানুষের বীরত্ব, সংগ্রাম ও অদম্য আশার প্রতীক।
রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমি
পুলিশ বাহিনী ছিল রাষ্ট্রের প্রশাসনিক শক্তির অন্যতম আধুনিক ইউনিট। পাকিস্তানি সেনারা বুঝেছিল—এই প্রশিক্ষিত বাহিনী যদি বিদ্রোহী বাঙালির পাশে দাঁড়ায়, তবে সামরিক আধিপত্যে ফাটল ধরবে। তাই সারদা পুলিশ একাডেমিতে গণহত্যা ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রকে ‘শুদ্ধ’ করার এক ভয়াল প্রয়াস। নিরস্ত্র বা অল্প অস্ত্রে সজ্জিত প্রশিক্ষণার্থীদের ওপর নির্বিচার গুলি, আটক ও নির্যাতন চালানো হয়। সালেক খোকন এখানে শুধু ঘটনাপঞ্জি দেননি; দেখিয়েছেন কীভাবে সামরিক জান্তা রাষ্ট্রযন্ত্রকে দমন করতে ভয়াবহ নির্মমতায় গিয়েছিল।
সিলেটের কাইয়ার গুদাম
‘কাইয়ার গুদাম’ বইয়ের অন্যতম ভয়াল অধ্যায়। এখানে মানুষকে ধরে এনে গুদামের মতো আটকে রাখা হতো, পরে নির্যাতন ও হত্যা করা হতো। এটি ছিল এক ধরনের ‘শিল্পায়িত’ হত্যার ইঙ্গিত। লেখক যে সাক্ষ্য উদ্ধৃত করেছেন—ভারতীয় কর্নেলের উৎসাহ, সীমান্তে অবস্থান, জুনের শুরুতে তুমুল গোলাগুলি (পৃ. ৭১)—তা শুধু স্থানিক বার্তা দেয় না, বরং মনে করিয়ে দেয় সীমান্তভূমির ভূরাজনীতি, যেখানে যুদ্ধ কখনো কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম, বসতি ও কৃষিজমিতে। ব্রিগেডিয়ার জোসি বা ক্যাপ্টেন চক্রবর্তীর নামগুলোও কেবল চরিত্র নয়, সমন্বিত যুদ্ধ–লজিস্টিক্সের এক স্মারক।
সৈয়দপুর: রেলশহরের ট্র্যাক বরাবর লাশের কিউ
সৈয়দপুরের হত্যাযজ্ঞে রেলওয়ে–শিল্পাঞ্চলের প্রেক্ষাপটকে যুক্ত করে হত্যাকারীদের গতিবিধি বোঝা যায়। ট্র্যাক বরাবর সেনা কনভয়ের চলাচল, শহরতলির পকেট তল্লাশি, সংখ্যালঘু পাড়ার টার্গেটিং—সবই ছিল হত্যাকারীদের ‘রুটিন’। সালেক খোকন দেখিয়েছেন, কীভাবে স্থানীয় দোসররা কোথাও গাইড, কোথাও ইনফর্মার হয়ে এই নরকযজ্ঞে অংশ নিয়েছিল।
সিরাজগঞ্জ: ১৮ মে’র ‘অপারেশন’
বইটির সবচেয়ে সিনেম্যাটিক বর্ণনা পাওয়া যায় সিরাজগঞ্জ অধ্যায়ে। ১৮ মে ১৯৭১, দুপুরে পাকিস্তানি সেনারা শিয়ালকোল হয়ে শহরে প্রবেশ করে। তারা মোস্তফা খন্দকার নামের এক সাইকেল মিস্ত্রিকে ধরে জিজ্ঞেস করে—‘মালাউন কাহা হ্যায়?’ (পৃ. ১২১)। হঠাৎ এক অন্ধ হিন্দু ভিখারীর আবির্ভাবে হিন্দুপাড়ার অবস্থান ফাঁস হয়ে যায়। এরপরই শুরু হয় হত্যাযজ্ঞ।
জ্ঞানদায়িনী হাইস্কুলের শিক্ষক যোগেন্দ্রনাথ বসাক, তার ভাই ননীগোপাল, ভাতিজা প্রণব—একই পরিবারের তিন প্রজন্মকে ধরে আনা হয়। সঙ্গে শুকুচরণ রবিদাস, ফণীন্দ্রনাথ দাস, প্রেমনাথ দাস ও শিবচরণ রবিদাসকেও টেনে আনে সেনারা। কোনো জিজ্ঞাসাবাদ বা বিচার ছাড়াই সবাইকে সারিবদ্ধ করে গুলি করা হয়। মুহূর্তেই নিঃশেষ হয়ে যায় কয়েকটি পরিবার, নিভে যায় একাধিক জীবনের আলো।
গুলিবিদ্ধ হয়েও ফণীন্দ্রনাথ দাস কিছু সময় বেঁচেছিলেন, কিন্তু রক্তক্ষরণে চিকিৎসা না পেয়ে রাতেই মারা যান। এই বর্ণনা পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংসতা ও মানুষের অসহায়তার এক নির্মম দলিল। সিরাজগঞ্জ গণহত্যা ছিল পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের অংশ, যার উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করা, স্থানীয় মানুষকে ভয় দেখানো এবং মুক্তিকামীদের শাস্তি দেওয়া।
কাঠামোবদ্ধ ত্রাস
থানাপাড়া নামটি উচ্চারণ করলেই চোখে ভেসে ওঠে নদীবাঁধ, বাজার, হাট, মন্দির–মসজিদের সহাবস্থান—আর সেই সহাবস্থানের বুকচেরা চিৎকার। গোলারহাটের বয়ানে যে ছবিটি আসে—‘সহজ–সরল মানুষের বুকের রক্ত নদীর জলে মিশে যাওয়া’—তা আসলে এক ধরনের পরিকল্পিত সন্ত্রাস, যার লক্ষ্য ছিল স্থানীয় জনপদকে শাস্তি দেওয়া এবং ভয় ছড়িয়ে দেওয়া। সালেক খোকন দেখান, কীভাবে প্রতিটি জনপদে সামাজিক–নৈতিক ভাঙন ঘটানো হয়েছিল, যাতে প্রতিরোধের অবকাঠামো ধসে পড়ে।
একাত্তরের অপরাধ–রাজনীতিতে স্থানীয় দোসর বা ‘কম্প্রাডর’ শ্রেণির ভূমিকা ছিল স্পষ্ট। কালিয়াকৈরের ডাকবাংলোয় পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প গড়ে ওঠে, আর স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজন—চৌধুরী তানভীর আহমেদ চৌধুরী, সিদ্দিক হোসেন, তাজু মাস্টার, তজিমুদ্দিন চেয়ারম্যান, আব্দুল হালিম মেম্বার, আব্দুল আজিজ আহমদ, আব্দুর রহমান—এই নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে ওঠেন (পৃ. ১১১)। খাদ্য সরবরাহ, পিস কমিটি গঠন, অস্ত্রধারী গ্রুপ বানানো—সবই মিলে স্থানীয় পরিসরকে দখলদারদের জন্য অনুকূল করে তোলে। খোকন এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য উন্মোচন করেন—যুদ্ধ শুধু ফ্রন্টলাইনে হয় না; অনেক সময় ‘হোমফ্রন্ট’-এর ভেতরেই নির্ধারিত হয় কোন গ্রাম টিকে থাকবে, আর কোন উঠান রক্তে ভিজবে।
শরণার্থীর ঢল
বইটির ‘শরণার্থী’ অধ্যায় পাঠককে মনে করিয়ে দেয় সেই নীরব মহাপ্লাবনের কথা, যখন প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ট্রেনিং শেষে ভারতীয় কর্নেলের উজ্জীবক সেই বাক্য—‘তোমাদের দেশ তোমাদেরই স্বাধীন করতে হবে’ (পৃ. ৭১)—বইয়ের সুর নির্ধারণ করে দেয়। হিমকুমারী, বাঁশঝাড়, নোম্যান্সল্যান্ড, আর্টিলারির শেল—এসব কেবল দৃশ্য নয়, এগুলো ইতিহাসের জিও ট্যাগ। খোকনের বয়ানে শরণার্থীদের দুর্ভোগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শরণার্থীদের এই বাস্তবতা বোঝা ছাড়া একাত্তরের নৃশংসতার পরিমাণ কখনোই অনুধাবন করা যাবে না।
মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন
রওশন জাহান সাথীর তরুণদের প্রতি আহ্বান—‘দেশকে ভালোবেসো, স্বাধীনতাবিরোধীদের চিনে রেখো… রক্তে পাওয়া এই দেশটাকে তোমাদের হাতেই দিয়ে গেলাম’ (পৃ. ৫১)—বইটির নৈতিক ভিত নির্মাণ করে। এখানে নারীর ভূমিকা কেবল ভুক্তভোগী নয়; নেতৃত্ব, ত্যাগ ও শিক্ষার প্রতীক। খোকন যে নারীদের বয়ান লিপিবদ্ধ করেছেন, তা ‘বীরাঙ্গনা’ ধারণাকে সম্মানের আসনে ফিরিয়ে আনে।
আব্দুস সামাদের ভাষ্য
ফজরের সময় পজিশনে যাওয়া, আর্টিলারি শেল মাথার ওপর দিয়ে ভারতের গ্রামে হাঁটা, বাঁশঝাড়ে লুকোনো, তারপর রেললাইনের বাঙ্কারে ফায়ার—এই সিনেমাটিক বর্ণনা (পৃ. ৭১) দেখায় গেরিলা যুদ্ধ কতটা স্থানিক ভূগোল–নির্ভর ছিল। ভয় ছিল, কিন্তু ভয় জয় করার প্রতিদিনের অনুশীলন ছিল আরও বড়। খোকন বীরত্বকে বাড়িয়ে বলেন না; তিনি ভয়কে স্বীকার করেন, অথচ লেখার গতি নিয়ে যান আত্মত্যাগের দিকে—এখানেই তাঁর ন্যারেটিভের সততা।
‘কৃষিকাজ ছাড়াও বাবার ব্যবসা ছিল। কিন্তু যা উপার্জন করতেন তা দিয়ে পরিবার চলত না। ভাতের পরিবর্তে যবের ছাতু, কালাইয়ের ছাতুও খেতে হয়েছে। ম্যাট্রিক পাশ করেছি অনেক কষ্টে। এরপরই চলে যাই ময়মনসিংহে… টাইপরাইটিং শিখে চাকরির আশা করলেও ব্যর্থ হলাম। পরে শুনি আর্মিতে লোক নিচ্ছে। ভাবলাম টাইপরাইটিং জানি, ক্ল্যারিক্যাল কাজ পাব। তাই গেলাম ময়মনসিংহ সার্কিট হাউসে। সেখানেই ফিজিক্যাল টেস্ট নিল।’ (পৃ. ১৭৭)
এই অংশ দেখায় দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ কীভাবে এক তরুণকে মুক্তিযুদ্ধের পথে ঠেলে দেয়।
হাবিবুরের জবানিতে
ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে কালিয়াকৈর হয়ে টাঙ্গাইল পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাদের ‘ফিফটি সিক্স’ বহরের পেট্রলিংয়ের তথ্য (পৃ. ১১১) শেখায়, দখলদার বাহিনীর রুটিন লজিস্টিক্স বোঝা ছিল গেরিলাদের অন্যতম কৌশল। বেস ক্যাম্প, সাপ্লাই চেইন, ট্রুপ মুভমেন্ট—সবই গেরিলা যুদ্ধের ব্যাকএন্ড কৌশলের অংশ। খোকন হাবিবুরের বয়ান থেকে এই ‘অপারেশনাল ম্যাপ’ গড়ে তোলেন।
লিয়াকত আলী খান (বীরউত্তম)
‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানেই প্রপার ডেমোক্রেসি… যোগ্যকে যোগ্য জায়গা, ধর্মান্ধতার বদলে আইনের শাসন’—লিয়াকত আলী খানের এই উচ্চারণ (পৃ. ১৭৭) বইটিকে বর্তমান রাজনীতির দরজায় এনে দাঁড় করায়। খোকন দেখান, এই চেতনা কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; এটিকে প্রতিষ্ঠানিক করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের বয়ান তাই কেবল অতীতের মূল্যবোধ নয়, ভবিষ্যতের নীতি–নৈতিকতার দিশা।
প্রামাণ্যতার সঙ্গে মানবিকতার সহাবস্থান
সালেক খোকনের ভাষাশৈলী সাংবাদিকতার সংযম ও সাহিত্যিক নীরবতার এক মিশ্রণ। তিনি অতিরিক্ত অলংকার এড়িয়ে যান, তবে চরিত্র, স্থান ও সময়কে জীবন্ত করার মতো পর্যাপ্ত বিবরণ দেন। কখনো সাক্ষাৎকারের সরাসরি উদ্ধৃতি, কখনো সংক্ষিপ্ত বর্ণনা—দুইয়ের সমন্বয়ে তিনি পাঠে ছন্দ তৈরি করেন। সবচেয়ে বড়ো কথা, তিনি প্রত্যক্ষদর্শী, শহিদ–স্বজন ও মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠকে আড়াল করেন না; বরং পাশে দাঁড়ান, যাতে পাঠক নিজেই কণ্ঠের ভেতর প্রবেশ করতে পারেন।
প্রামাণ্যতার জন্য তিনি স্থাননাম, তারিখ, ব্যক্তিনাম নথিবদ্ধ করেছেন—যা ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হয়ে থাকবে। ভূমিকায় যেমন উঠে আসে—পাকিস্তান রাষ্ট্র এখনো ক্ষমা চায়নি; সামরিক অপরাধীদের কাউকে বিচারও করা হয়নি। এই সত্য কেবল অতীতের ক্ষোভ নয়; এটি বর্তমান ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। আবার, বাংলাদেশে শহিদ–তালিকা ও শহিদ–পরিবারের পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি মডেল না গড়ে ওঠা আমাদের রিপাবলিকান নৈতিকতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। বইটি তাই গোপনে পাঠককে জিজ্ঞেস করে—‘স্মৃতির ঋণ কি শুধু ২৬ মার্চ বা ১৬ ডিসেম্বরের বক্তৃতায় শোধ হয়?’
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখনো ১৯৭১-এর হত্যাযজ্ঞকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে পূর্ণ আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে ‘গৌরব ও বেদনার একাত্তর’–এর মতো কেস স্টাডিনির্ভর বইগুলো জরুরি দালিলিক ভিত্তি তৈরি করে।
বইটির বিন্যাসেও একটি ছন্দ আছে—গণহত্যার কেস স্টাডির পর বীরত্ব–কাহিনি পাঠককে ‘শোক থেকে শক্তি’র দিকে নিয়ে যায়। আলোকচিত্রের ব্যবহার সংযত, টেক্সটভিত্তিক বইতে এগুলো শ্বাস–ফেলার অবকাশ তৈরি করে। ভাষা সহজ, কিন্তু ওজনদার। আবেগ আছে, তবে অতিরঞ্জন নেই; নাটকীয়তা নেই, আছে দৃশ্য–ব্যাকরণ। ফলে বইটি একদিকে তথ্যনির্ভর, অন্যদিকে আবেগঘন দলিল।
গৌরব ও বেদনার একাত্তর শুধু স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে না; মনে করিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধের গভীর তাৎপর্য। স্বাধীনতার লড়াই ছিল মূল্যবোধ, ন্যায় ও মানবাধিকারের সংগ্রাম। আজও এর শিক্ষা সমান প্রাসঙ্গিক—কারণ ইতিহাসকে ভুলে গেলে আমরা শুধু পরিচয় হারাই না, সংগ্রামের মূল শিক্ষাকেও অবমূল্যায়ন করি। তাই ইতিহাসকে স্মরণ করা যথেষ্ট নয়; তা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিদিনের জীবনে ন্যায়, সাহস ও মানবিকতার অনুশীলন করাও জরুরি। এখানেই বইটির প্রাসঙ্গিকতা—এটি কেবল স্মৃতিচারণ নয়, বরং সচেতন, দায়িত্বশীল ও মানবিক প্রজন্ম গঠনের প্রেরণা।
শিরোনাম: গৌরব ও বেদনার একাত্তর
লেখক: সালেক খোকন
প্রকাশক: কথাপ্রকাশ
প্রকাশকাল: ২০২৪, ১ম সংস্করণ
বাঁধাই/পৃষ্ঠা: হার্ডকভার, ২৪০
পৃষ্ঠামূল্য: ৫০০ টাকা
লেখক:
লাবণী মণ্ডল
লেখক, গ্রন্থ সমালোচক; ঢাকা
- বানানরীতি লেখকের নিজস্ব।