চলে গেলেন লেফট্যানেন্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। প্রকৃত নাম ছিল, মোঃ এরশাদ হোসেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যেয়ে পান্জাবীদের দেখে, নামটি তার impressive নয় ভেবেই, তিনি নাম বদলে ফেললেন। হয়ে গেলেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। অবৈধভাবে তার ক্ষমতারোহনের পর, মিডিয়ায় তিনি হলেন, লেজে হোমো এরশাদ…বলতে ও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, “লেজে” বা “হোমো” নামকরণের পিছনে ছিল চরম বিদ্রুপ ও খোঁচা। আজো সন্দেহ নেই, সেই কটাক্ষ ছিল তার চারিএিক অবয়বকে ঘিরে। যদিও সুবিদাবাদী চানক্যেরা তাকে ডাকতো “পল্লিবন্ধু”। আজো অজানা আমার কাছে, তিনি কতটা পল্লিবন্ধু ছিলেন।
তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসলেন, সময়কে চরম মূহুর্তে চতুরতার সাথে ব্যবহার করে ও নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়ে। সকলে মনে করে সময়কে ব্যবহার করে, চতুরতার সাথে ও নিষ্ঠুরতা দেখিয়ে তিনি ও তার পাকিস্তান প্রত্যাগত কিছু অফিসার জেনারেল মন্জুরকে হত্যা করে এবং জিয়াকে হত্যার অন্যতম কূশিলবের ট্যাগ জেনারেল মন্জুরের উপর লাগিয়ে দেয়।
আমার চোখে তার চরিত্রটি ছিল ভয়াবহ মাত্রায় কলুষতা ভরা। কিছু “ক্লু” দেই, যেমন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি আসেননি। যুদ্ধের সময় ছুটি কাটাতে তিনি রংপুর আসেন, আবার ছুটি কাটিয়ে তিনি চলে যান পাকিস্তানে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর সময়, তিনি ছিলেন ভারতে। মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে কোন অনুমতি না নিয়ে সোজা চলে এলেন ভারত থেকে বঙ্গভবনে। দেখা গেল তাঢ় বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের সাথে। যেই জিয়া ১৫ আগষ্টের পর জে. সফিউল্লাহকে সরিয়ে সেনাপ্রধান হলেন, তখন এরশাদ হলেন তার ডেপুটি। জিয়া ও এরশাদ মিলে তিন বাহিনী থেকে ধরে ধরে বিভিন্ন তৈরী ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের কোর্ট মার্শাল বসিয়ে হত্যা করলেন। জিয়ার মৃত্যুর পর সাত্তারকে বন্দুকের নলে ফেলে সরিয়ে দিলেন। খোদ খালেদা জিয়া প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, এরশাদই জিয়ার হত্যাকারী। যার কারণে খালেদা জিয়াকে একবার ৪৮ ঘন্টার জন্য কোথায় যেন তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এই হল গুণধর এরশাদ।
যাবার আগে তিনি আমাদের জন্য রেখে গেছেন অসংখ্য দিশা, বিদিশা, জিনাত, মেরির মত অনুরাগী। তিনি আরও রেখে গেছেন আমাদের জন্য রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। তিনি আমাদের জন্য রেখে গেছেন অসংখ্য মওদুদ আহমেদ। ১৯৮৮ সালে সংবিধানে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম প্রবর্তন করা হয়, আর এই বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন তৎকালীন আইন মন্ত্রী মওদুদ আহমেদ। রাষ্ট্র যে লিংগধারী সেই প্রেথথম জানলাম।
পারতঃপক্ষে আমি ধর্ম নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করি না। কারণ আমার নিজ ধর্ম “ইসলাম” নিয়ে আমার প্রবল অনুরাগ রয়েছে। আমার ধারণা ধর্ম মানুষকে বিনীত ও মানবিক হতে বলে। মানুষের কল্যাণে ধর্মের ব্যাখ্যা ও উপদেশের উপরে ও বাহিরে কিছুই নেই। বিশেষ করে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে আমাদের ইসলাম ধর্মেও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আমাদের মহানবীর মদীনা সনদেও দেখেছি, অন্য ধর্মধারীদের কিভাবে প্রটেকশান দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আমার ধারণা যে, ধর্মের উপর কথা বলার তেমন জ্ঞান নেই বিধায় কথা না বলাই শ্রেয়।
কিন্ত শৈশব থেকে মূল্যবোধের যে শিক্ষা নিয়ে বড় হয়েছি, বাস্তবতা পেয়েছি ভিন্ন। ধর্ম নিয়ে কূট কৌশলের খেলা চলতে দেখছি অবিরত৷ এই যেমন ভারতীয় উপমহাদেশ বিভাজন হল দ্বিজাতি ত্বত্ত্ব ভাবনা নিয়ে। এরপর ভাবনা বা ধর্ম নিয়ে খেলা বন্ধ হবে বলে মনে করা হলেও, ভাবনা বন্ধ হয়নি। মূলতঃ প্রতিনিয়ত দেখছি শাসক গোষ্ঠীর প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে ধর্ম। আইয়ুব খান থেকে ইয়াহিয়া খান হয়ে জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদ। সকলে যেন এক নৌকার মাঝি। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কি ধর্ম রক্ষা নিয়ে হয়েছিল? অবশ্যই না। শাসনযন্ত্র থেকে বাঙালীদের বঞ্চিত করার পাকিস্তানী ষড়যন্ত্র, হামলা, নির্বিচার গণহত্যা প্রতিরোধ করতেই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়। কি দেখলাম আমরা। তথাকথিত ইসলামী ঝান্ডাধারী রাজনৈতিক দল ক্ষমতার মোহে ধর্ম টেনে আনলো। ইসলাম গেল বলে রব তুললো। নারী ধর্ষণে মদদ দিল। সাধারণ মানুষ হত্যা করল। ১৬ ডিসেম্বর প্রমাণ হল “ইসলাম” পরাজিত হয়নি। বরং পরাজিত হয়েছে তাদের মিথ্যাকথন, পরাজিত হয়েছে তাদের নির্লজ্জ দালালী। ব্যর্থ হয়েছে ক্ষমতার মসনদে বসার তাদের অবৈধ আকাংক্ষা।
ঐ পরাজিতরা কিন্ত বসে থাকেনি। তাদের ভাবনা বাস্তবায়ন শুরু করলেন জেনারেল জিয়া, বাড়াবাড়িটা চূড়ান্ত করে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিলেন জেনারেল এরশাদ। রাষ্ট্র ধর্ম হল ইসলাম। এরপর আর এরশাদ ঐ পথে হাটলেন না। আসলে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে পরাজিতদের দোসর তথাকথিত ইসলামী ঝান্ডাধারীদের (যাদের আমি বলি ইসলাম বিকৃতকারী) পুনর্বাসন স্কিম হচ্ছে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম। সংবিধান হল কলংকিত। জনগণ হল কৌশলের মারপ্যাচে প্রতারিত। প্রকৃত মুসলমান হলে এরপর আসতো শরীয়া আইন। এরশাদ ও তার চানক্য দোসররা জানতো, এরপরের ধাপে পা দিলেই ভয়াবহ পরিণতি হবে তাদের। যে পাপ তারা করেছে, শরীয়া আইনে সকল কল্লা (মাথা) তাদের কাটা যাবে প্রথমে। সবচেয়ে পরিহাস হচ্ছে এই যে, রাষ্ট্র ধর্ম করা হল ইসলাম। আর সব আইন অদ্যাবধি বহাল থাকলো ব্রিটিশ আইন। আবার মসজিদে গিয়ে ঘোষণা দিলেন, তার রওশন স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। সবাই মুখ টিপে হাসলেন। মুসুল্লিরা মনে মনে বলছেন হচ্ছেটা কি, বলছেটা কি? এরপর বাচ্চাও আনলেন। কার আনলেন, কেউ জানলো না। তার প্রতারণার কি বিচিত্র রূপ দেখুন।
প্রয়াত সেলিম, দেলোয়ার, নুর হোসেন প্রমুখ যদিও আজ বিস্মৃত। তবুও যেন দেখি জিয়া, মন্জুর, সেলিম, দেলোয়ার, নুর হোসেন প্রমুখ বসে আছে এরশাদকে নিতে। ওরা বলছে, তুমি সিএমএইচ-এর হিমাগারের ট্রেতে কেন হে বাছা… চলে আস তোমার কর্মের হিসাব দিতে। তুমি ভেবেছিলে, তুমি অক্ষয়। তুমি ভেবেছিলে, তুমি যা করবে কেও বুঝবে না। কিন্তু তুমিও পরাজিত হয়েছ। যা জীবদ্দশায় তুমি কখনও শেখনি। তোমার রক্তে ছিল প্লেবয়, তবুও ক্ষমতার মোহে হাতে নিয়েছিলে ইসলামের ঝান্ডা। আজ তুমিই বল, প্লেবয়ের হাতে ইসলামী ঝান্ডা কি মানায়?
লেখক পরিচিতি:

মো. আনোয়ার হোসেন, বার-এট-ল, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক