গোধূলির গান
জানি না
ক্লান্তির আর্তি ছাড়া
অন্য কোনো ধ্বনি ছিল কি না
সন্ধ্যার নদীর স্বরে
কে যেন মন্ত্রের মতো
উচ্চারণ করে
কবেকার ভুলে যাওয়া নাম।
দেবতার মতো তবু
মন্ত্র ছড়ায় প্রাচীন দেবদারু গাছ!
একবার ফিরে যাই,
ফিরে আসি বধ্যভূমিতে আবার
আমার বিপন্ন সংগীত
মাড়িয়ে মাড়িয়ে
হন্তারকেরা নিরাপদে হেঁটে যায়। এবং হঠাৎ
একটি অচেনা পাখি
দ্যুলোক-ভূলোকজুড়ে
বারবার রটিয়ে দেয়
আমার নতজানু পরিণতি,
আমার অন্ধকার পরিণাম!
যদি মুখ খুলি
আমি মুখ খুললে কী বলবো বলুন,
যদি আমাকে কিছু বলতেই হয়,
তাহলে কী বলবো- ঐ দেখুন
রুপালি অলংকার পরা নিগ্রো রমণীর মতো
রাত্রির শরীর জ্বলছে
কিংবা যদি বলি: কিন্নরকণ্ঠ নদীগুলো
আজো গান গাইছে-কেউ শুনবে না
এইসব কাব্যিক কথা।যদি মুখ খুলতেই হয়
আমি বলবো: আমাদের নদীগুলোর নাব্যতা
ক্রমশ কমে যাচ্ছে, উত্তর বাংলায়
শীতের পোশাক যাওয়া দরকার;
আমেরিকা না বেজিং-সাহায্যের হাত
প্রসারিত হবে কার দিকে? সে ব্যাপারে
সুশীল সমাজ আজ কী মনে করেন?
কার কন্ঠে তুলে দেবো
কবিতার এই মণিহার?আমি জানি গুপ্তঘাতকেরা
ছড়িয়ে রয়েছে আমার শহরে।
তাদের নিধন চেয়ে
কবিতাকে অস্ত্রের মতো
ব্যবহার করতে চেয়েছি আমি বহুবার।কিন্তু কবিতা কেবল
ঘুরে বেড়ায় যেখানে রাঙা বল নিয়ে
বিকেলে খেলার মাঠে ছেলেরা জটলা পাকায়
অথবা মুখ গুঁজে পড়ে থাকে
মহিলাদের চুলের অন্ধকারে।
হন্তারকদের প্রতি
বাঘ কিংবা ভালুকের মতো নয়,
বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা হাঙরের দল নয়
না, কোনো উপমায় তাদের গ্রেপ্তার করা যাবে না
তাদের পরনে ছিল ইউনিফর্ম
বুট, সৈনিকের টুপি,
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের কথাও হয়েছিলো,
তারা ব্যবহার করেছিল
এক্কেবারে খাঁটি বাঙালির মতো
বাংলা ভাষা। অস্বীকার করার উপায় নেই ওরা মানুষের মতো
দেখতে, এবং ওরা মানুষই
ওরা বাংলা মানুষ
এর চেয়ে ভয়াবহ কোনো কথা আমি আর শুনবো না কোনোদিন।
মানুষ, নতুন শতকে
আজ আবার উদ্যত ছুরি মানুষের হাতে,
ওর পায়ের নিচে
পিষ্ট হচ্ছে নারী,
শিশুরা নিহত হচ্ছে চতুর্দিকে!কবি, তোমার বর্মগুলো বের করে নাও।
তোমার কবিতাই শ্রেষ্ঠ বর্ম আজ!মধ্যযুগের অন্ধকার ছিঁড়ে
আবার উদ্যত ছুরি
মানুষের হাতে।
আমাদের চেনা নগরগুলো থেকে
উঠছে ক্রন্দনধ্বনি
কবি, ওকে প্রতিহত করো।
কবি তুমি জানো আমাদের প্রিয় কবিতার
অমর পঙক্তিগুলো
হত্যার বিরুদ্ধে চিরকাল-চিরকাল…
কবি, ওকে প্রতিহত করো।।
তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা
ভয় নেই
আমি এমন ব্যবস্থা করবো যাতে সেনাবাহিনী
গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে
মার্চপাস্ট করে চলে যাবে
এবং স্যালুট করবে
কেবল তোমাকে প্রিয়তমা।
ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
বন-বাদাড় ডিঙ্গিয়ে
কাঁটা-তার, ব্যারিকেড পার হয়ে, অনেক রণাঙ্গনের স্মৃতি নিয়ে
আর্মার্ড-কারগুলো এসে দাঁড়াবে
ভায়োলিন বোঝাই করে
কেবল তোমার দোরগোড়ায় প্রিয়তমা।
ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো-
বি-৫২ আর মিগ-২১গুলো
মাথার ওপর গোঁ-গোঁ করবে
ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
চকোলেট, টফি আর লজেন্সগুলো
প্যারাট্রুপারদের মতো ঝরে পড়বে
কেবল তোমার উঠোনে প্রিয়তমা।
ভয় নেই…আমি এমন ব্যবস্থা করবো
একজন কবি কমান্ড করবেন বঙ্গোপসাগরের সবগুলো রণতরী
এবং আসন্ন নির্বাচনে সমরমন্ত্রীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায়
সবগুলো গণভোট পাবেন একজন প্রেমিক, প্রিয়তমা!
সংঘর্ষের সব সম্ভাবনা, ঠিক জেনো, শেষ হয়ে যাবে-
আমি এমন ব্যবস্থা করবো, একজন গায়ক
অনায়াসে বিরোধীদলের অধিনায়ক হয়ে যাবেন
সীমান্তের ট্রেঞ্চগুলোয় পাহারা দেবে সারাটা বৎসর
লাল নীল সোনালি মাছি-
ভালোবাসার চোরাচালান ছাড়া সবকিছু নিষিদ্ধ হয়ে যাবে, প্রিয়তমা।
ভয় নেই আমি এমন ব্যবস্থা করবো মুদ্রাস্ফীতি কমে গিয়ে বেড়ে যাবে
শিল্পোত্তীর্ণ কবিতার সংখ্যা প্রতিদিন
আমি এমন ব্যবস্থা করবো গণরোষের বদলে
গণচুম্বনের ভয়ে
হন্তারকের হাত থেকে পড়ে যাবে ছুরি, প্রিয়তমা।
ভয় নেই,
আমি এমন ব্যবস্থা করবো
শীতের পার্কের ওপর বসন্তের সংগোপন আক্রমণের মতো
অ্যাকর্ডিয়ান বাজাতে-বাজাতে বিপ্লবীরা দাঁড়াবে শহরে,
ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
স্টেটব্যাংকে গিয়ে
গোলাপ কিম্বা চন্দ্রমল্লিকা ভাঙালে অন্তত চার লক্ষ টাকা পাওয়া যাবে
একটি বেলফুল দিলে চারটি কার্ডিগান।
ভয় নেই, ভয় নেই
ভয় নেই,
আমি এমন ব্যবস্থা করবো
নৌ, বিমান আর পদাতিক বাহিনী
কেবল তোমাকেই চতুর্দিক থেকে ঘিরে-ঘিরে
নিশিদিন অভিবাদন করবে, প্রিয়তমা।
শহীদ কাদরী, কবি ও লেখক। জন্মগ্রহণ করেন ১৪ আগস্ট ১৯৪২ সালে। তিনি ১৯৪৭-পরবর্তীকালের বাঙালী কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য যিনি নাগরিক-জীবন-সম্পর্কিত শব্দ চয়নের মাধ্যমে বাংলা কবিতায় নাগরিকতা ও আধুনিকতাবোধের সূচনা করেছিলেন। তিনি আধুনিক নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক অভিব্যক্তির অভিজ্ঞতাকে কবিতায় রূপ দিয়েছেন। দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িকতা, বিশ্ববোধ এবং প্রকৃতি ও নগর জীবনের অভিব্যক্তি তার কবিতার ভাষা, ভঙ্গি ও বক্তব্যকে বৈশিষ্ট্যায়িত করেছে। শহর এবং তার সভ্যতার বিকারকে তিনি ব্যবহার করেছেন তাঁর কাব্যে। তাঁর কবিতায় অনুভূতির গভীরতা, চিন্তার সুক্ষ্মতা ও রূপগত পরিচর্যার পরিচয় সুস্পষ্ট।
তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ চারটি। ১৯৭৩ সালে বাংলা কবিতায় অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার অর্জন করেন। ২০১১ সালে ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক লাভ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ২৮ আগস্ট ২০১৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
