ভারতীয় উপমহাদেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ছিলেন ক্লান্তিহীন যুক্তিশীল তর্কে পারঙ্গম। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে বাঙালীর দীর্ঘ সংগ্রাম-সাধনার প্রতিটি পর্যায়ে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।

মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ
আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ১৯০০ সালের ২৭ নভেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়ার তারুটিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তর্কবাগীশের মধ্যে দেশপ্রেমের উন্মেষ ঘটে৷ ১৩ বছর বয়সে তিনি জমিদার মহাজনদের বিরুদ্ধে দুধ বিক্রেতাদের সংগঠিত করে দুধের ন্যায্যমূল্য দিতে মহাজনদের বাধ্য করেন। (১৯২০-১৯২২) সালে মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন৷ এ সময় তিনি সভা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আন্দোলনের সপক্ষে জনমত গড়ে তোলেন এবং সলঙ্গাহাটে কংগ্রেসের অফিস প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯২২ সালের ২৭ জানুয়ারি তরুণ নেতা মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশের নেতৃত্বে তৎকালীন পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার সলঙ্গা হাটে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। ঐ দিন প্রায় ১২০০ প্রতিবাদী মানুষ ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারায়। আহত হয় ৪০০০-এরও বেশি। নিহতদের লাশের সাথে সংজ্ঞাহীন আহতদের উঠিয়ে নিয়ে ব্রিটিশ পুলিশ সিরাজগঞ্জের রহমতগঞ্জে গণকবর দেয়। রক্তাক্ত সলঙ্গা তদানিন্তন পাবনা জেলার একটি ব্যবসায়িক জনপদ। সপ্তাহে ২ দিন হাট বসতো। ১৯২২ সালে ২৭ জানুয়ারি শুক্রবার ছিল বড় হাটবার। মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশের নেতৃত্বে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের কর্মীরা হাটে নামে বিলেতি পণ্য ক্রয় বিক্রয় বন্ধ করতে। আর এই স্বদেশী আন্দোলনের কর্মীদের রুখতে ছুটে আসে তদানিন্তন পাবনা জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আর. এন. দাস, জেলা পুলিশ সুপার ও সিরাজগঞ্জ মহকুমা প্রসাশক এস. কে. সিংহসহ ৪০ জন সশস্ত্র লাল পাগড়ীওয়ালা পুলিশের একটি দল। সলঙ্গার গো-হাটায় ছিল বিপ্লবী স্বদেশী কর্মীদের অফিস। পুলিশ এসে তার ব্যাটিলিয়ন নিয়ে কংগ্রেস অফিস ঘেরাও করে গ্রেফতার করে নেতৃত্বদানকারী আব্দুর রশীদকে। সঙ্গে সঙ্গে জনতার মধ্য থেকে ম্যাজিষ্ট্রেট, পুলিশ সুপার ও মহুকুমা অফিসারকে ঘিরে জনতা তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে উদ্ধারের জন্য মিছিল বের করে। জনতার ঢল ও আক্রোশ দেখে ম্যাজিষ্ট্রেট জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে গুলি চালাতে নির্দেশ দেয়। শুরু হয়ে বুলেট-বৃষ্টি। ৪০টি রাইফেলের মধ্যে মাত্র একটি রাইফেল থেকে কোনো গুলি বের হয়নি। ঐ রাইফেলটি ছিল একজন ব্রাহ্মণ পুলিশের। এই পৈশাচিক হত্যাকান্ডে হতাহতের সরকারি সংখ্যা ৪৫০০ দেখানো হলেও স্থানীয়দের মতে সংখ্যাটা ১০০০০-এরও অধিক। ব্রিটিশবিরোধী ঐতিহাসিক ‘সলঙ্গা আন্দোলন’ ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘রক্তসিঁড়ি’ হিসেবে পরিচিত৷
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ায় মাওলানা আবদুর রশীদকে কারাদন্ড ভোগ করতে হয়। ফলে তার এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা হয়নি৷ পরবর্তীকালে তিনি যুক্ত প্রদেশের বেরেলি ইশতুল উলুম মাদ্রাসা, সাহারানপুর মাদ্রাসা, দেওবন্দ মাদ্রাসা ও লাহোরের এশাতুল ইসলাম কলেজে পড়েন এবং তর্কশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করে তর্কবাগীশ উপাধিতে ভূষিত হন৷
১৯৩৩ সালে রাজশাহীর চাঁটকৈড়ে নিখিলবঙ্গ রায়ত খাতক সম্মেলন আহ্বান করে ঋণ সালিশী বোর্ড আইন প্রণয়নের প্রস্তাব রাখেন তিনি৷ মওলানা তর্কবাগীশ ১৯৩৬ সালে মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং ১৯৩৭ সালে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে নাটোরে কৃষক সম্মেলন আহ্বান করেন৷ তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একজন ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন৷ ১৯৩৮ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে তিনি বাংলা, আসাম ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিক কাজে আত্মনিয়োগ করেন৷ ১৯৪৬ সালে তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন ৷ তিনি অবিভক্ত বাংলার এম.এল.এ হিসেবে তৎকালীন ব্যবস্থাপক পরিষদে পতিতাবৃত্তি নিরোধ, বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা ও বিনা ক্ষতি পূরণে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের প্রস্তাব উত্থাপন করেন ৷
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারী ঢাকার রাজপথ যখন ছাত্রদের বুকের রক্তে রঞ্জিত, তখন লেজিসলেটিভ অ্যাসেমব্লিতে প্রতিবাদে গর্জে উঠেন মওলানা তর্কবাগীশ। তিনি বলেন, “আমাদের বক্ষের মানিক ছাত্রদের রক্তে রাজপথ লাল হয়ে গেছে, এই অবস্থায় অ্যাসেমব্লি চলতে পারে না। আগে প্রতিকার চাই”। সেদিন রাতেই তিনি পদত্যাগ করলেন মুসলিম লীগ থেকে। যে দলের সরকার বাংলাভাষার দাবী ভূলুণ্ঠিত করেছে, “যারা বাঙালীর বুকে গুলি চালিয়েছে, তাদের সঙ্গে তর্কবাগীশ থাকতে পারে না”।

মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, শেখ মুজিবর রহমান ও মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ।
১৯৫৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং ঐ বছর ১ জুন তিনি মুক্তিলাভ করেন। এরপর তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এবং ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ ও ১৯৫৬ সালে যথাক্রমে মারি ও লাহোরে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলায় বক্তৃতা প্রদান করে তিনি বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। তিনি ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন।
শেখ মুজিবর রহমান স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে নতুন আন্দোলনের রূপরেখা হিসেবে “৬ দফা” উত্থাপন করলেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকেই এর বিরোধীতা করেন। ১৯৬৬ সালের ১৩ মার্চের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকেই মতবিরোধের এক পর্যায়ে দলের সভাপতি মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ তার অনুসারীদের নিয়ে বৈঠকস্থল ত্যাগ করেন। ১৮ ও ১৯ মার্চ ইডেন হোটেলে দলের বিশেষ কাউন্সিলেও তিনি অনুপস্থিত থাকায় সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম সভাপতিত্ব করেন। ১৯ তারিখের কাউন্সিলেই ১৪৪৩ জন কাউন্সিলর শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দিন আহমদকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করেন।
মওলানা তর্কবাগীশ ছয়দফার বিরোধীতা করে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (পিডিএম)-পন্থি আওয়ামী লীগের পূর্ব পাকিস্তান শাখার এডহক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনের পর তিনি মূল আওয়ামী লীগে প্রত্যাবর্তন করেন।
১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি পাবনা-২ আসন থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে তিনি মুজিবনগরে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কাজ করেন। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ অধিবেশনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে খন্দকার মোশতাক ক্ষমতা দখল করলে ১৬ আগষ্ট মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ খন্দকার মোশতাক সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে বিবৃতি দেন।
১৯৭৬ সালের অক্টোবর মাসে তিনি গণ আজাদী লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং এ দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৩ সালের ৩০ জানুয়ারী তাঁর সভাপতিত্বে ১৫টি রাজনৈতিক দলের এক যৌথসভায় ১৫ দলীয় জোট গঠিত হয়। জোটের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে তিনি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিশিষ্ট ভূমিকা রাখেন।
মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আপোসহীন মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট ঢাকার পিজি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। ২০০০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে।
বাঙালীয়ানা/এজে/এসএল