সাতই মার্চের ভাষণ: একটি ভাষাতাত্বিক বিশ্লেষণ

Comments

।। আনিস আহমেদ ।।

আজ যারা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাতই মার্চের ভাষণ অবজ্ঞা করতে উদগ্রীব তারা জানেন না অথবা জানতে চান না যে সাতই মার্চের ভাষণ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন পূর্বাভাস। দূর্ভাগ্যবশত, কেবলমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় অথবা সুনির্দিষ্ট ভাবে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে খাটো করার জন্য যারা সাতই মার্চকে ভুলিয়ে দিতে চায় তারা ইতিহাসের সঙ্গে প্রতারণা করতে চায়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাতই মার্চের সেই বজ্রকন্ঠ উচ্চারণের রাজনৈতিক তাৎপর্য বহুল আলোচিত। বস্তুত আজও যাঁরা স্বাধীনতার ঘোষক সম্পর্কে কুটতর্কে লিপ্ত হন, তাঁদের জন্যে বোধ করি সাতই মার্চের ভাষণই যথেষ্ট যেখানে বঙ্গবন্ধু গোটা দেশ কাঁপিয়ে সেই চূড়ান্ত ঘোষণাটি দিয়েছিলেন, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। এই চূড়ান্ত উচ্চারণের মাধ্যমেই, যেমনটি কবি নির্মলেন্দু  গুণ যথার্থই বলেছেন, “স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের হলো”। তবে ৭ই মার্চের ভাষণের যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষাাত্বিক দিক রয়েছে সেটি উপলব্ধি করলে  রাজনৈতিক কূটতর্ককে পরিহার করা সম্ভব কারণ ভাষাতাত্বিক দিক দিয়েও ৭ই মার্চের ভাষণ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার কৌশলগত ঘোষণা।

ঐতিহাসিক সেই ভাষণের শ্রুতিলিখন পাঠ করুন:
মহাকাব্য: ৭ মার্চ ১৯৭১

৭ই মার্চের ভাষণে সবটকু অংশই যে পূর্ব পরিকল্পিত ছিল তা নয়। তবে ভাষণের একটি খসড়া যে ৭ই মার্চ দুপুরের মধ্যেই চূড়ান্ত করা হয় সে কথা বঙ্গবন্ধুর জেষ্ঠ্য জামাতা ড. ওয়াজেদ মিয়ার বইয়ে আরও অনেক দূর্লভ তথ্যের পাশাপাশি পরিস্কার ভাবেই লেখা আছে। কিন্তু ঐ ভাষণকে পুরোপুরি একটি লিখিত ভাষণ বলা যাবে না, যদি ও ভাষণের একটি ইংরেজি ভাষ্য এবং কিছু লিখিত অনুলিপি আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। ড. কামাল হোসেন এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন যে শেষ মুহুর্তে পাকিস্তানিরা যদি কোন আক্রমণ চালাতো সেই পরিস্থিতিতে যাতে এর লিখিত অনুলিপি বিদেশি সাংবাদিকদের দেওয়া যায়, তার একটা প্রস্তুতির নির্দেশনা এসছিলো বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে। কিন্তু সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। বঙ্গবন্ধু  যে ভাষণটি তদানীন্তন রমনা রেইসকোর্স ময়দানে দেন, সেটির মূল বিষয়গুলো লিখিত থাকলেও, বেশির ভাগ অংশই ছিল স্বতস্ফুর্ত এবং অলিখিত। আর জনসাধারণের মনে দাগ কেটেছিল সেই সব স্বতঃস্ফুর্ত কথা যেখানে তিনি চলে এসেছিলেন জনগণের একেবারে কাছে ।

ভাষণের কাঠামো বিশ্লেষণের আগে এটা বোধ হয় মনে রাখা প্রয়োজন যে পয়লা মার্চ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ইয়াহিয়া খান একতরফা ভাবে অনির্দিষ্ট কালের জন্যে মূলতবি করে দেওয়ার প্রতিবাদে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, বাঙালি জাতীয়তাবোধের উন্মেষের পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ ছিল তাঁর নিজের জন্যেই এক বড় চ্যালেঞ্জ। পরবর্তী কর্মসূচি যে কঠিন এবং তা থেকে যে প্রত্যাবর্তনের কোন সুযোগ নেই সে কথা তাঁর জানা ছিলো।

অতএব জনগণের সামনে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা যেমন তাঁর লক্ষ্য ছিল, তেমনি লক্ষ্য ছিল সেই কর্মসূচির চূড়ান্ত উদ্দেশ্যও তুলে ধরা। এই দ্বিবিধ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তাঁর সাতই মার্চের ভাষণ। বিশেষত এই ভাষণে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করছেন, কী করছেন না সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক অত্যন্ত গুরুভারও তাঁর প্রশস্ত কাঁধে পড়েছিলো। বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে সন্ধিক্ষণে দেওয়া এই ভাষণ একদিকে যেমন ইতিহাসেরই ফল, অন্যদিকে তেমনি ইতিহাস নির্মাণেরই উপাদান, সেটা আমাদের মনে রাখা দরকার।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুরু হয়, তাঁর সেই বিখ্যাত সম্বোধন, “ভাইয়েরা আমার” দিয়ে। এই সম্বোধনে একুশ শতকের রাজনৈতিক বিশুদ্ধতা যে ছিলো না সেটা বলাই বাহুল্য কারণ উপস্থিত নারীদের তিনি বাহ্যত  সম্বোধন করেননি এবং ঐ সম্বোধনের মধ্যে শাহরিক পরিশীলন ও ছিল না। তবে বঙ্গবন্ধুর ঐ সম্বোধনের মধ্যে যেমন ছিল এক ধরনের সামূহিকতা (inclusiveness) তেমনি ছিল আন্তরিকতাও। যেন অপার এক স্নেহ নিয়ে এই বিশাল হৃদয় মানুষটি, গোটা বাঙালি জাতিকে “ভাইয়েরা আমার” বলে সম্বোধন করছেন। এক ধরনের নিবীড় আত্মীয়তার অধিকার নিয়েই তিনি সম্পর্কবাচক শব্দটিকে সামনে এনেছেন এবং সর্বনাম ব্যবহার করেছেন শেষে।

এই যুগান্তকারী সম্বোধণের পর, তিনি কোন পরিপ্রেক্ষিতে এই ভাষণ দিচ্ছেন তার  একটি যৌক্তিক বিশ্লেষণ তুলে ধরছেন। প্রথম দিকে তিনি সমসাময়িক সঙ্কটের কথা উল্লেখ করেন এবং কিছু পরে সেই ঐতিহাসিক পটভূমি ও তুলে ধরেন যার কারণে বাংলাদেশের মানুষ মুক্তি চাইছে। এই পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু ছয়বার বাংলা শব্দটি ব্যবহার করেন দেশ অর্থে (যেমন বাংলার মানুষ) আর একবার ব্যবহার করেছেন বাংলাদেশ শব্দটি। আসলে সে সময়ে বাংলা ও বাংলাদেশ শব্দ দুটি অভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হতো বলে বঙ্গবন্ধু ভাষার সাবলীলতা ও ছন্দ রক্ষা  করার জন্যই বাংলা কথাটি বহুবার ব্যবহার করেছেন। “এ দেশের মানুষ” কথাটিও তিনি ব্যবহার করেছিলেন সম্ভবত অখন্ড পাকিস্তান অর্থে যেমন তেমনি বাংলাদেশ অর্থেও। বস্তুত শেখ মুজিব তাঁর এই ভাষণে বহু দ্বিবিধ অর্থ সূচক বাক্য ও শব্দ ব্যবহার করেছেন এবং তাতে এই ভাষণদানে তাঁরা রাজনৈতিক কৌশলের পরিপক্কতার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি নির্বাচনে জয়লাভের পর জাতীয় পরিষদে বসে দেশের জন্য কাজ করার লক্ষ্য বর্ণনা করতে গিয়ে এ দেশ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেন, যার দ্বৈত অর্থ হতে পারে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির কথা তিনি সে সময় পরিস্কার করে বলেন। পাকিস্তানি শাসকদের সঙ্গে সংগ্রাম ও সংঘাতের একটি কালানুক্রমিক বিবরণও দিয়ে যান ভাষণের এই পর্যায়ে, কিছু সন–তারিখও উল্লেখ করেন। কিন্তু ইতিহাসের চেয়ে সমসাময়িকতাই তখন বঙ্গবন্ধুর জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয়, দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণের জন্যে এবং সেই সঙ্গে এই কথাটিও দ্ব্যর্থহীন ভাবে বোঝানোর জন্য যে কেন তিনি এই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন।

তাঁর ভাষণের একটি উল্লেখযোগ্য বাক্য হচ্ছে, “আমি শুধু বাংলার নয় পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসেবে তাকে (ইয়াহিয়া খানকে) অনুরোধ করলাম ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা”। ভাষণের এই অংশে তিনি তাঁর দুঃখ ও ক্ষোভের কথা হৃদয়স্পর্শী ভাবে বলেছেন সেটি আমরা শ্রোতা হিসেবে সকলেই জানি। খানিকটা ব্যঙ্গাত্মকভাবে তিনি যখন বলেন, “তিনি আমার কথা রাখলেন না, (বিরতি) …. তিনি রাখলেন (বিরতি)… ভূট্টোসাহেবের কথা”, তখন সেই বিরতিতে এক ধরনের অনবদ্য নাটকীয় সাসেপন্স সৃষ্টি হয়েছিলো। শেখ মুজিব এ ধরনের সাসপেন্স সৃষ্টিতে দক্ষ ছিলেন। শ্রোতাদের প্রত্যাশা সৃষ্টি করে, তিনি সেই প্রত্যাশিত বাক্যটি তূণের শেষ তীর হিসেবে ছুঁড়তেন, যেন সপ্তদশ শতকের ইংরেজ কবি জন ডান এর বহুল আলোচিত মেটাফিজিকাল উইট এর মতোই তিনি  প্রস্তুত করে নিতেন তাঁর শ্রোতাদের, সেই কাঙ্খিত বাক্যটি বলার জন্য, যা শুনতে প্রতীক্ষিত ছিলো তাঁর লক্ষ লক্ষ শ্রোতা। একই ধরনের ঝোঁক (Stress) এর সঙ্গে অল্প পরে আরেকটি বাক্য ও বলেছিলেন, “ইয়াহিয়া খান, প্রেসিডেন্ট হিসেবে এসেম্বলি ডেকেছিলেন। আমি বললাম আমি যাবো। ভুট্টো সাহেব বললেন তিনি যাবেন না”। লক্ষ্য করার বিষয় যে বঙ্গবন্ধু এই বাক্যে এবং এর আগে যে বাক্যটি উল্লেখ করেছিলাম সেই বাক্যেও বৈপরীত্য ও বিরোধীতাকে তীব্র করে তুলছেন খুব ছোট ছোট বাক্য প্রয়োগ করে। যৌগিক বাক্য যে তিনি ব্যবহার করেননি, তার বোধ করি একাধিক কারণ ছিলো। প্রথমত ভাষণটির মূল তাঁর জানা থাকলেও, তিনি যে মূলত স্বতস্ফূর্ত ভাবে কথা বলছিলেন, তাঁর ভাষণে সেই কথ্য ভাবটি রক্ষিত হয়েছে, তাঁর এই সরল বাক্য ব্যবহারের কারণে। কিন্তু তার চেয়েও লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে এই সব ছোট ছোট বাক্য নিক্ষেপ করার কৌশলটা। ঈর্ষণীয় রকমের এক কৌশল তিনি প্রয়োগ করেছেন, দুটি ছোট বাক্যের মাঝে বিরতি দিয়ে এবং বিরতি শেষে কখনও শ্লেষ, কখনও ক্ষোভের প্রকাশ ঘটিয়েছেন এক ধরনের ঝোঁক বা স্ট্রেস দিয়ে। তাঁর ভাষণের বাণীবদ্ধ অংশটির ধ্বণিতত্বগত বিশ্লেষণে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। আগের ঐ বাক্যটির পরই বঙ্গবন্ধু আবার চলমান ঘটনার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন। এই বর্ণনা তাঁর লক্ষ লক্ষ শ্রোতাকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করাচ্ছে, তাঁর অবস্থান বোঝার দিকে। কয়েক মিনিট পরই তিনি তাঁর নিরাপোষ সংগ্রামের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, “২৫ তারিখে এসেম্বলি কল করেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। ঐ শহীদের রক্তের উপর পাড়া দিয়ে মুজিবুর রহমান আরটিসিতে যোগদান করতে পারে না”। লক্ষ্য করুন এই বাক্যেও না শব্দটির উপর বিশেষ ঝোঁক, বঙ্গবন্ধুর নিরাপোষ অবস্থান তুলে ধরে। কিন্তু তখনও তিনি দক্ষ রাজনীতিকের মতো কৌশলগত কারণে আলোচনায় যোগ দেয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেননি। সেই দরজা খোলা রেখে তিনি কতগুলো শর্ত দিচ্ছেন পাকিস্তান সরকারকে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে যে এই সব কঠোর শর্তারোপের পর, তিনি যখন বলেন, “তারপর বিবেচনা করে দেখবো, আমরা এসেম্বলিতে বসতে পারবো কি পারবো না। এর পূর্বে এসেম্বলিতে বসতে আমরা পারি না।” শেখ মুজিবের ভাষণের এটি একটি উল্লেখযোগ্য দিক। প্রত্যাখ্যান এবং আপোষের ক্ষীণ একটা সম্ভাবনার মধ্যে একজন বিচক্ষণ রাজনীতিকের মতো বঙ্গবন্ধু একটা ভারসাম্য রক্ষা করছেন। একদিকে তিনি নিরাপোষ থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, অপর দিকে আপোষের মূলোটা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু নিরাপোষ থাকার ব্যাপারে তাঁর প্রত্যয় দৃঢ়, আপোষ আলোচনার ব্যাপারে তাঁর কোন প্রতিশ্রুতি নেই, এক্ষেত্রে শর্ত সাপেক্ষ প্রতিশ্রুতি ও নেই।

ভাষণের এই জায়গাটি বিশ্লেষণ করলে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক  প্রজ্ঞার প্রশংসা করতে হয়। তিনি যে মূলত একটি আপোষহীন সংগ্রামের দিকে দ্রুত এগুচ্ছেন সে কথা বুঝতে যাতে জনগণের অসুবিধে না হয়, সেদিকে তিনি তাঁর ভাষণের প্রতিটি লাইনে, প্রতিটি বাক্যে খেয়াল রেখেছেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক ভাবে তিনি তাঁর প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করার জন্যে একই সঙ্গে গাজর ও লাঠি ব্যবহার করেছেন। সাধারণত শাসক গোষ্ঠী এ ধরনের কৌশল অবলম্বন করে থাকে রাজনৈতিক আন্দোলন দমন করার জন্য, কিন্তু শেখ মুজিব এই কৌশলটা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। আলোচনায় শর্ত দেবার মূহুর্তের মধ্যেই দ্রুত তিনি তাঁর অসহযোগ আন্দোলনের পুর্ণাঙ্গ রূপরেখা বর্ণনা করেন। এই সর্বাত্মক অসহযোগ ঘোষণার সময় বঙ্গবন্ধু বাস্তব বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে ছোট ছোট শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করেছেন, বিশেষ বিশেষ শব্দের ওপর ঝোঁক দিয়েছেন এবারও:

“রিকশা, ঘোড়াগাড়ি চলবে, রেল চলবে, লঞ্চ চলবে —- শুধু সেক্রেটেরিয়াট, সুপ্রিম কোর্ট, হাই কোর্ট, জজ কোর্ট, সেমি গভর্ণমেন্ট দপ্তরগুলো, ওয়াপদা কোন কিছু চলবে না”।  এ ধরনের বাক্য ও শব্দ ব্যবহারে জনগণ হর্ষধ্বণির মাধ্যমে তাঁকে সমর্থন জানানোর অবকাশ ও পেয়েছে। তিনি আন্দোলনের ডাক দেওয়ার পরই হিন্দু মুসলমান, বাঙালি–অবাঙালির মধ্যে যাতে কোন বিভেদ না ঘটানো হয় সে ব্যাপারে ও সতর্ক করে দেন।

তাঁর চূড়ান্ত বাক্য নিয়ে আলোচনার আগে, আরেকটি কথা এখানে উল্লেখ করার  প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি যে ভাষাগত বিশুদ্ধতা রক্ষা করার কোন আরোপিত চেষ্টা এই ভাষণে ছিলো না। একদিকে বঙ্গবন্ধু যেমন আসুন বসুন, বিচার করুন জাতীয় প্রমিত ক্রিয়াপদ ব্যবহার করেছেন, তেমনি নির্দ্বিধায় বলেছেন, “দাবায়ে রাখতে পারবা না, মনে রাখবা ……. ভাষার মধ্যে এই প্রমিত বাংলার প্রয়োগ এবং আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ, তাঁর ভাষণকে দিয়েছে এক ধরনের স্বতস্ফুর্ততা এবং গতিশীলতা। সেদিন রমনা রেসকোর্সের মাঠে যে লক্ষ লোকের ঢল নেমেছিলো তার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থেকে শুরু করে সর্বস্তরের লোক ছিলেন। ব্যাকরণের দিক থেকে একটি বাক্যে তিনি ভুল করেছিলেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে, সেটি শুদ্ধ করেছেন। বাক্যটি ছিল, “তোমাদের উপর/ কাছে আমার অনুরোধ রইলো”। আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তিনি তাঁর এই ভাষণে ইংরেজিতে বেশ কিছু রাজনৈতিক পরিভাষা প্রয়োগ করেছিলেন। সেটিও ভাষণের স্বতঃস্ফুতর্তা বৃদ্ধি করেছে।

তারপরই আসে বঙ্গবন্ধুর সেই চূড়ান্ত ঘোষণা, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম  স্বাধীনতার সংগ্রাম”। মুক্তি ও স্বাধীনতা শব্দ দুটিকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু আবার বিচক্ষণতার সঙ্গে এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করেছেন। দুটি শব্দ পরস্পরের কাছাকাছি হলেও, বাঙালির মননে এ দুটি শব্দের কেবল মাত্রাগত নয়, প্রকৃতিগত পার্থক্য ও রয়েছে। মুক্তি শব্দটি সে সময়ে emancipation বলে অনুদিত হচ্ছিল বাংলাদেশের পত্র পত্রিকায় কারণ freedom শব্দটি ব্যবহার করলে আইনগত প্রশ্ন উঠতে পারতো এবং পাকিস্তান সরকার সহজেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনতে পারতো। বাংলায় তেমনি মুক্তি শব্দের প্রায়োগিক মূল্যমান স্বাধীনতা শব্দের মূল্যমানের চেয়ে সামান্য লঘু। একটি অভিন্ন রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে থেকেও মানুষ মুক্তি চাইতে পারে। এই মুক্তির একটি রূপরেখা বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণের প্রথম দিকেই উল্লেখ করেন, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির কথা। আরও একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে তখনকার বিশ্বে যে সমাজতান্ত্রিক প্রভাব ছিল, তার প্রেক্ষাপটে মুক্তি শব্দের প্রয়োগ ছিল, স্বাধীনতা শব্দের প্রয়োগের চেয়ে কিছুটা লঘু। বঙ্গবন্ধু তাই তাঁর ভাষণের বহু জায়গায় এই মুক্তি শব্দটি ব্যবহার করেছেন নানাবিধ অর্থে, মূলত বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে কিন্তু স্বাধীনতা শব্দটি ব্যবহার করেছেন কেবল একবার। তিনি জানতেন যে ঐ সব অর্থে মুক্তি শব্দটি প্রয়োগ করা হলে পাকিস্তানি শাসকদের আপত্তি থাকলেও, অন্তত বাঙালিদের দেশদ্রোহী হবার অপরাধের জন্য তারা কোন বৈধ যুক্তি খুঁজে পাবে না। কিন্তু শেষের লাইন, ঐ আবার কবি জন ডান এর মতোই বঙ্গবন্ধু একটি মেটাফিজিকাল কনসিট এর আশ্রয় নিলেন। তিনি মুক্তি ও স্বাধীনতার  মধ্যে একটি সমীকরণ সাধন করে, স্বাধীনতাকামি বাঙালিদের প্রতীকি ভাবে বুঝিয়ে দিলেন যে তিনি আসলে পুরো ভাষণেই স্বাধীনতার কথাই বলেছেন অথচ তাঁর প্রতিপক্ষের কাছে এর সহজ ব্যাখ্যা হতে পারতো যে যখন তিনি স্বাধীনতা বলছেন, তখন তিনি কেবল মুক্তির কথাই বলছেন, সেখানে রাষ্ট্রিক সার্বভৌমত্বের  ওপর কোন আঘাত হানা হচ্ছে না। বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা  ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন , তাঁর এই শেষের বাক্যে, এর কোন ব্যাখ্যায় তিনি যাননি। কবিতার মতোই বলা যায় তিনি এই শব্দের ব্যাখ্যা ছেড়ে দিয়েছেন তার শ্রোতাদের হাতে, জনগণের হাতে। শ্রোতারাও বুঝতে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি যে বঙ্গবন্ধু প্রকারান্তরে স্বাধীনতাই ঘোষণা করেছেন। এই শেষ বাক্যে আবারও তাঁর বাচনভঙ্গির একটি দিকের পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করি। তিনি আবার, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম” এটুকু বলে একটি ছোট্ট বিরতি দেন। ঐ বিরতিটিই ছিল একটি আশ্বান্বিত সাসপেন্স। মাথার ওপর তখন উড়ছে টিক্কা খানের সামরিক হেলিকপ্টার, তেমনি উত্তজনাময় মূহুর্তে আবার তিনি তাঁর তূণ থেকে ছুড়লেন শেষ বাক্যবাণ,“এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। এই অসাধারণ উচ্চারণ কোন আবেগ আপ্লুত তাৎক্ষণিক উক্তি নয়। এই বাক্যটি শোনার জন্যে জনসাধারণের যেমন প্রতীক্ষা ছিল দীর্ঘ, ভাষণ যিনি দিচ্ছিলেন সেই মুজিবের প্রস্তুতি ও ছিল পরিকল্পিত।

বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের আরও কিছু ভাষাতাত্বিক দিক রয়েছে, যা গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণের  অপেক্ষা রাখে এবং এই নিবন্ধের সংক্ষিপ্ত কলেবরে সেটি পূর্ণাঙ্গ ভাবে লেখার অবকাশও কম। কিন্তু উপসংহারে এ কথা বলাই বাহুল্য যে বিশ্বের নের্তৃবৃন্দের প্রদত্ত বিখ্যাত ভাষণগুলোর মধ্যে এই সাতই মার্চের ভাষণটি আপন মহিমায় স্থান লাভ করে নিয়েছে। এতো সংক্ষেপে, স্বল্প সময়ে এতো সব গুরুত্বপূর্ণ কথা, আবেগ ও যুক্তির সমপরিমাণ প্রয়োগ কেবল তাঁর মতো বড় মাপের স্বাধীনতাকামী নেতার পক্ষেই সম্ভব ছিল। আসলে সাতই মার্চের ভাষণ ছিল যেন এক গদ্য কবিতা।

লেখক:
Anis Ahmed
আনিস আহমেদ
শিক্ষক, নিবন্ধকার ও বেতার সাংবাদিক; ওয়াশিংটন ডিসি

** প্রবন্ধটি ৭ মার্চ, ২০২৫-এ নিউইয়র্কে বাঙালীয়ানা ফাউন্ডেশন ইউএসএ ইনকর্পোরেটেড আয়োজিত ‘বাংলার ঐতিহাসিক মহাকাব্য’ অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ হিসেবে উপস্থাপিত।

ঐতিহাসিক সেই ভাষণের শ্রুতিলিখন পাঠ করুন:
মহাকাব্য: ৭ মার্চ ১৯৭১

উত্তাল মার্চের আর সব দিনগুলো:
পড়ুন –

১ মার্চ ১৯৭১
২ মার্চ ১৯৭১
৩ মার্চ ১৯৭১ 
৪ মার্চ, ১৯৭১
৫ মার্চ, ১৯৭১

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট