হাঙ্গার গেইমস ও দিনগুলো

Comments

। ইকরাম কবীর ।

হাঙ্গার গেইমস

মোজাম্মেল তার ছেঁড়া জুতার ফিতা শক্ত করে বাঁধতে বাঁধতে পাশে বসা লোকটাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে– ‘তুমি কী এই খেলা প্রথমবার খেলতে এসেছো?’

ছোট্ট খাঁচার মতো ঘরটায় ঘাম আর হতাশার গন্ধ। একটা চাপা আতঙ্কও ভেসে বেড়াচ্ছে। তাদের চারপাশে অন্য প্রতিযোগীরা নীরবে বসে আছে। তাদের চেহারায় ভয় আর দৃঢ়তার ছাপ ফুটে উঠেছে।

লোকটা উত্তর দেয় না, তবে অন্য আরেক প্রতিযোগী মোজাম্মেলকে জিজ্ঞেস করলো– ‘তোমার কী এই প্রথমবার?’ লোকটার কণ্ঠ মোটা আর কর্কশ কিন্তু কিন্তু তাতে সহানুভূতির ছোঁয়া আছে।’

মোজাম্মেল মাথা নেড়ে বলে– ‘হ্যাঁ, আমার মেয়ের জন্য এসেছি। তিন দিন ধরে সে কিছু খায়নি।’

লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার চোখের দুঃখ আর হতাশা মোজাম্মেল ভালো করেই চেনে। তার নিজের চেহারার অবস্থাও সেই রকম তা সে জানে। সে বলে– ‘আমাদের সংসারে আমার বৌও আছে… কিন্তু এতই অসুস্থ যে কোনো কাজ করতে পারে না। আমারও কোনো কাজ নেই। এই খেলা আজ আমাকে জিততেই হবে; মেয়ের জন্যে খাবার নিয়ে যেতে হবে।’

লাউডস্পিকারে শব্দ ভেসে আসে– ‘খেলোয়াড়রা, মঞ্চে চলে এসো!’

মোজাম্মেল উঠে দাঁড়ায়; তার পা কাঁপছে। সে লোকটার দিকে তাকিয়ে বলে– ‘শুভ হোক তোমার খেলা।’

তারা ঘর থেকে বেরিয়ে মঞ্চের দিকে যায়।

মঞ্চটা এক ভয়ংকর গোলকধাঁধা, ফাঁদ আর প্রতিবন্ধকতায় ভরা। তৈরি হয়েছে ওনাদের বিনোদনের জন্য যেখানে মোজাম্মেলরা নিজেদের বাঁচানোর জন্য লড়ে। চারদিকে সুন্দর পোশাক পরা দর্শকের করতালি উপচে উঠছে; তাদের হাসির ধ্বনি দশদিকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

‘হাঙ্গার গেইমসে স্বাগতম, ’উপস্থাপকের কণ্ঠ বেজে ওঠে। ‘মনে রেখো, এই খেলায় কেবল একজনই বাঁচবে। খেলা শুরু হোক!’

একটা বাঁশি বেজে উঠলে মঞ্চের চারপাশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মোজাম্মেল সামনে দৌড় দেয়; প্রথম ফাঁদটা সে এড়িয়ে যেতে পারে— একটা ইলেক্ট্রিফাইড নেট। তার পাশের একজন নেটে আটকা পড়ে মারা যায়। দর্শকদের উল্লাসে মানুষটার চিৎকার চাপা পড়ে যায়।

মোজাম্মেল একটা সরু পথে ঢোকে; বুক ধক-ধক করে। নিজেকে বলে– ‘আগে বাড়ো, আগে বাড়ো; নিজেকে বাঁচাও।’ মেয়ের ক্ষুধার্ত চেহারার তাকে সাহস দেয়।

একটা শরীরকে সে সামনে দেখতে পায়। সেই গুমোট ঘরের মোটা ও কর্কশ গলায় কথা বলা লোকটা।

‘দাঁড়া শালা, হারামজাদা; তোর আগে আমি যাবো,’ মোজাম্মেল হুঙ্কার ছাড়ে। কিন্তু বোঝে গায়ে জোর নেই। হয়তো ওকে হারাতে পারবে না।

লোকটি চকিতে ঘুরে দাঁড়ায়, তার চোখেও রাগ। ‘চু…মারানির পোলা; তুই পিছে থাক; আগে বাড়লে মেরে ফেলবো।’

মোজাম্মেলের মনে যেন অন্য এক চিন্তা আসে। বলে– ‘এসো আমরা একসাথে কাজ করি!’

‘এখানে একসাথে কিছু নেই– হয় তুই, না হয় আমি।’ বলেই লোকটা মোজাম্মেলের দিকে একটা ধাবা দেয়, হাতে একটা ভাঙা ধাতব টুকরা।

মোজাম্মেল কোনও রকমে এড়িয়ে যায়। বলে– ‘একটু বোঝো; আমরা একজন আরেকজনকে খুন না করি; রক্তারক্তি না করি।’

‘না; তোমাকে আমি মারবোই; না হলে আমি বাঁচবো না। লোকটা কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলে।

মোজাম্মেলও মুষ্টি আঁটে। সেও কাঁদছে। ‘তাহলে ইশ্বর আমাদের দুজনকেই ক্ষমা করুন।’

দুজনেই শেষবারের মত হুংকার ছাড়ে; দুজনেই একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দুজনই কাঁদে কিন্তু ক্ষুধায় দুজনই উন্মত্ত।

দিনগুলো

তারেক ঘড়ির দিকে তাকায়। হাতের কলমটা টেবিলের উপর বাড়ি দিয়ে অস্থির ভাবে ঠুকঠুক শব্দ করে। পাশে বসে থাকা সহকর্মী নাসের কয়েকবার চেয়ে দেখে।

তারেক নিজের মনে বলে– ‘আর এক ঘণ্টা, তারপরই বেরিয়ে যাব।’

নাসের এবার হাসিমুখে কথা বলে তারেকের সাথে– ‘প্রতিদিনের মতো আজও আবার সময় গুনছ?’

তারেক একটু হেসে বলে– ‘হুম; ঠুক-ঠুক করলেই দিনটা তাড়াতাড়ি পার হয়ে যায়।’

দুজনেই হাসে। তারেক আবার কাজে মন দেয়, তবে মনের ভেতরে তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নামার জন্যে অপেক্ষার ঢেউ আছলে পড়তে থাকে। ঠিক ছটায়, তারেক তার জিনিসপত্র, ল্যাপটপ গুছিয়ে নেয়, একটা পরিচিত স্বস্তির ঢেউ তাকে উচ্ছ্বসিত করে। অফিসের চাপ, ক্লান্তি, সব ছাপিয়ে সে যেন নিঃশ্বাস নিতে পারে। নাসেরকে খোদা হাফেজ বলে সে বেরিয়ে যায়।

আপিসের বাইরে এসে সে একটু দাঁড়িয়ে থাকে, নিঃশ্বাস নেয়, বাইরের বাতাস অনুভব করে। ‘আহ, আজকের মতো মুক্তি পাওয়া গেল,’ সে ভাবে। প্রতিটা দিন শেষ হলে সে এমন করেই সে ছোট্ট বিজয় অনুভব করে, মুক্তির স্বাদ পায়।

এভাবেই দিন কাটে। অনেক দিন পেরিয়ে যায়। বছর যায়। তারেক শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে দিনগুলো যেন চোখের পলকে চলে যাচ্ছে।

তবে আজ, বাইরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, তারেক একটু থেমে যায়– শেষ বিকেলের আলো ফুরিয়ে যাওয়া দেখে।

নাসের কাছে এগিয়ে আসে। বলে– ‘আজ যে বেশ দেরি করছো, তারেক; তুমি তো এমন করো না; কী হয়েছে আজ?’

তারেক তার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলে– ‘নাসের, আমি ভাবছি… আচ্ছা, আমরা কী শুধু সময় কাটাচ্ছি? আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে…।’

নাসের কাঁধ ঝাঁকিয়ে উত্তর দেয়– ‘আমারও মাঝে মাঝে মনে হয়, তবে একটু পরই আমি তা ভুলে যাই; জীবনটা আসলে একটা স্লো-মোশনের চেক, আমরা একটু একটু করে ক্যাশ করি। আর কি আছে, বলো?’

নাসের আবার আপিসের ভেতর ঢুকে চলে যায়; তার কথাগুলো ইথারে ভেসে তারেকের মনটাকে পেঁচিয়ে রাখে। বাড়ি ফিরে তারেক একা বসে থাকে, তার দিনগুলোর কথা মনে করে– এই একই বিল্ডিং, এই শত শত, হাজার হাজার দিন, অপেক্ষায় কাটানো অসংখ্য সন্ধ্যা।

অনেকক্ষণ বসে থেকে সে বাথরুমে যায়; আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে ভাবে– পাঁচ হাজার দিন কাজ করেছে সে এই আপিসে, কিন্তু একটা দিনও তার আলাদা করে মনে পড়ছে না– ডায়রিতে লিখে রাখার মতো কোনো দিন নেই।

ঘড়ির কাঁটা দেখে রাতের খাবার খায়, দাঁত ব্রাশ করে, টেলিভিশনের সামনে শুয়ে থাকে, খবর দেখতে দেখতে সে হিসেব করে কতো বছর ধরে সে খবর দেখছে, টক-শো দেখছে; মনে করতে পারে না। ঘড়ি দেখে সে ঘুমিয়ে পড়ে।

পরদিন সকালে আবার আপিসে যায়; পাশে নাসের, চারিদিকে অন্যান্য সবাই।

আপিসের ফ্লোরে কিছু একটা হচ্ছে, চলছে। সময় পার হচ্ছে। কম্পিউটার স্ক্রিনের আলো, কী-বোর্ডের টক-টকানি; কথোপকথনের আওয়াজ– সব মিলে একটা ওম-ম-ম একাকী নীরবতা। তারেক চোখ বন্ধ করে মনের চোখে দেখতে চায় তার চলে যাওয়া সময়– সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, দিন, মাস, বছর। আলাদা করে কিছু মনে করতে পারে না।

ছোটোবেলায় বাবার পড়ার টেবিলে সে একটা বালি-ঘড়ি দেখেছিল; সেই ঘড়ির কথা মনে পড়ে, নিজের হাতের ঘড়ির দিকে তাকায়, ঘড়িটা চলছে, কিন্তু নিজের জীবনের সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, দিন, মাস, বছর সে মনে করতে পারে না।তবে বোঝে সে টিকে আছে।

লেখক:
Ekram Kabir
ইকরাম কবীর
গল্পকার, লেখক; ঢাকা

ফিচার ফটোতে ব্যবহৃত ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট