।। বিভু রঞ্জন সরকার ।।
দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত খবর ( ৭ আগস্ট) : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলেছেন, ‘শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন নিয়ে সরকার কোনো রকম বিব্রত নয়। –এতো দুর্বল নার্ভের হলে কীভাবে চলবে? শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তো তেমন কোনো মারাত্মক আন্দোলন হয়নি। ওরা তো আন্দোলন শুরুই করতে পারেনি। রোদে পুড়বে, বৃষ্টিতে ভিজবে তাহলেই না আন্দোলন জমবে! ওদের শরীরই তো ঘামেনি। –আন্দোলনে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। যারা এ আন্দোলনে ভয় পেয়েছেন, বিচলিত হয়েছেন তারা দুর্বলচিত্তের লোক। এ ধরনের লোকদের আমার সঙ্গে না থাকাই ভালো’।
খবরটি কয়েকবার পড়লাম। এবং রীতিমতো ভয় পেলাম। বিচলিত হলাম। সত্যি, আমি হয়তো দুর্বলচিত্তের লোক! একবার মনে হয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এমন কথা বলতে পারেন না। আবার মনে হয় সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মালিকানাধীন পত্রিকায় যে খবর ছাপা হয়েছে তা কি ভুল বা বিভ্রান্তিকর হতে পারে?
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে প্রধানমন্ত্রী এতোটা হালকাভাবে দেখেছেন! আমার তো ধারণা ছিল, প্রধানমন্ত্রী বাচ্চাদের আন্দোলনটা ইতিবাচকভাবে দেখেছেন এবং সবাকেই বলবেন সাবধান হওয়ার জন্য। সবকিছু নষ্টদের দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেবেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই অনেক শক্ত মনের মানুষ। তার কাছে নানা খবর আছে। আছে দেশ শাসনের অভিজ্ঞতা। বিএনপি-জামায়াতের মতো দুষ্ট রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মোকাবেলার সাহস ও দৃঢ়তাও তার আছে। অনেক সংকট তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গেই উতরে এসেছেন। তার প্রতি সাধারণ মানুষের আশা-ভরসার অন্ত নেই। কিন্তু এবারের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে মামুলি ঘটনা বা উস্কানির ফল হিসেবে কেন যেন মেনে নিতে পারছি না। দুর্বলচিত্তের লোক বলেই বোধহয় বিচলিত বোধ করে শিক্ষার্থীদের ঘরে-ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানিয়েছি তৃতীয় দিনেই। আমার মতো অনেককেই উদ্বিগ্ন হতে দেখেছি, দুর্ভাবনা করতে দেখেছি। প্রধানমন্ত্রী দুর্বলচিত্তের লোকদের তার সঙ্গে না থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কারা থাকবে তাহলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে? শাহজাহান খানের মতো বুকের পাটাওয়ালা দুর্বৃত্তরা? শিশুদের তরুণদের আবেগের প্রতি ভালোবাসা আছে যাদের তারা সব বাতিল?
ভীষণ অসহায় বোধ করছি। বিষণ্ণবোধ করছি। এতোদিন ভেবেছি, ভয় কি, শেষ ভরসার জায়গা তো আছেই। শেখ হাসিনার বুক জুড়ে যে স্নেহ-ভালোবাসা তা-ই বাঙালি জাতিকে দুর্যোগ-দুর্বিপাক থেকে রক্ষা করবে।
আজ আমার বিশ্বাস একটু হলেও টলে গেল।
ইত্তেফাকের ভূমিকা নিয়েও আমার মনে প্রশ্ন : না বুঝে কি এই খবর তারা ছেপেছে।
সত্তর দশকের শেষ দিকে সিপিবি শহীদ মিনারে একটি সমাবেশের আয়োজন করেছিল আফগানিস্তানের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সমর্থনে। সেই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন ইত্তেফাকের আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। আমরা তার উপস্থিতিতে বিস্মিত হয়েছিলাম। পরদিন ওই সমাবেশের যে খবর ছাপা হয় ইত্তেফাকে সেটা দেখে আমাদের বিস্ময় কেটেছিল। সিপিবি বাংলাদেশে আফগান স্টাইল বিপ্লব করবে – এমন শিরোনামে খবর ছেপে ইত্তেফাক তার দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছিল। ওই খবর ছাপানোর পেছনে তাদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল।
প্রধানমন্ত্রীর যে বক্তব্য আজ ইত্তেফাক ছেপেছে তা কি উদ্দেশ্যহীন?
ড. কামাল হোসেন তৎপর হওয়া, বার্নিকাটের নৈশভোজ, ড. ইউনুসের মুখ খোলা – কোনো কিছু কি ইঙ্গিত করে না?
ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পায়। আমি এমনিতেই ভীতু মানুষ, কেন যেন বুক দুরুদুরু করছে!
আমার ভয় অমূলক হোক।
যতোক্ষণ শ্বাস, ততোক্ষণ আশ। হাল ছেড়ো না বন্ধু কেউ —
লেখক পরিচিতি:

বিভু রঞ্জন সরকার: সাংবাদিক, কলাম লেখক
