।। বাঙালীয়ানা কলকাতা ডেস্ক ।।
ইদানীং কয়েক বছর ধরে কলেজে ছাত্রভর্তি পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ ছাত্র এবং অভিভাবকদের পক্ষে এক বিষম বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ভর্তি ঘিরে তোলাবাজি, সিন্ডিকেট, ইউনিয়নের মাফিয়াচক্র ইত্যাদি নানা বিজাতীয় শব্দের আধিপত্যে নাকাল হচ্ছেন ছাত্র ও অভিভাবকেরা, তার ছবি উঠে এসেছে মূলধারার সংবাদেও। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নানা কলেজে বিক্ষোভ নজরেও পড়ছে, হয়েছে কিছু কেন্দ্রীয় মিছিলও। কিন্তু তাতে সরকারের ‘দেখিয়াও দেখিব না, শুনিয়াও শুনিব না’ হাবভাবের কোন বদল ঘটেনি। বজায় থেকেছে শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারি দখলদারির মানসিকতাই।
এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই রুখে দাঁড়িয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, সরকার, শাসক, এবং মূলধারার সংবাদ মাধ্যমের চক্ষুশূল হয়ে।
যাদবপুর সরকারি এবং বেসরকারি সব নিরিখ অনুযায়ী দেশের সেরা পাঁচটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি। এবছর যাদবপুর ইউনিভার্সিটির কলা বিভাগের আন্ডার গ্র্যাজুয়েট কোর্সের (বি এ) অ্যাডমিশন নিয়ে কিছু সমস্যা সৃষ্টি করা হয়েছে যা অভূতপূর্ব। যাদবপুরে কলা বিভাগে চিরাচরিত ভাবেই কিছু বিষয়ে পরীক্ষার মাধ্যমে ছাত্র ভর্তি করা হয়। ইংরাজি, তুলনামূলক সাহিত্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বাংলা ইত্যাদি বিভাগে যে ধরণের পাঠক্রম এখানে পড়ান হয় তার গুণগত মান বজায় রাখতে এমসিকিউ বা অবজেক্টিভ ধাঁচের প্রশ্নের বদলে এই প্রবেশিকা পরীক্ষা ছাত্রদের সমালোচনা ধর্মী নিজস্ব পাঠ ও মত প্রকাশের উপর জোর দেয়। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সাফল্যের সাথে এই ব্যবস্থা চালু আছে। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুনামের সাথে কাজ করে চলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। বিদেশ থেকে কলা বিভাগে কিছু সেমেস্টার পড়তে আসেন ছাত্ররা। এবছর রাজ্য সরকার হঠাত্ এ কথা জানিয়ে দেন যে বিভিন্ন বোর্ডের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাকেই সর্বোচ্চ মানদন্ড মেনে নিয়ে তার ভিত্তিতে ছাত্র ভর্তি করতে হবে। ঘটনাচক্রে যাদবপুর একটি হোম ইউনিভার্সিটি যা স্বশাসনের আওতাভুক্ত। সুতরাং নিয়মানুযায়ী তার অন্তর্গত কোনো বিভাগ চাইলে নিজেদের মতো করে ভর্তির মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনোরকম তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই সন্দেহ করা হয় এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে এবং সরাসরি নির্দেশ দেওয়া হয় ছাত্র ভর্তির প্রক্রিয়া শুধুমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক ও সমতুল পরীক্ষার নম্বরের বেসিসেই হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধিকারের উপর সরাসরি সরকারি ডিক্রি জারি স্বভাবতই যাদবপুরে বিপুল ক্ষোভ তৈরি করে। কলা, বিজ্ঞান ও ইঞ্জিনীয়ারিং -এর ছাত্র-ছাত্রীরা এই অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে। পাশে থাকেন শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীরাও। সর্বোচ্চ নিয়ামক কমিটি ই.সি.তে ২৭শে জুন সিদ্ধান্ত হয় যাদবপুরের ভর্তি প্রক্রিয়া যেরকম ছিলো সেরকমই থাকবে। তারপর শুরু হয় নানা খেলা । প্রথমে জানানো হয় যাদবপুরের কোনো শিক্ষক এই অ্যাডমিশনের সাথে যুক্ত থাকতে পারবেন না। পরীক্ষার প্রশ্ন ও খাতা দেখা অন্য কোনো বডির মাধ্যমে করতে হবে। শিক্ষক সমিতি এবং ছাত্ররা এই অবমাননাকর প্রস্তাবের তুমুল বিরোধিতা করে, সরব হন শঙ্খ ঘোষ, নবনীতা দেবসেন, সুকান্ত চৌধুরী সহ প্রাক্তন অধ্যাপক ও প্রাক্তন ছাত্ররাও। স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী আসরে নেমে পরীক্ষার বিরোধিতা করেন। অরবিন্দ ভবনের সামনে শুরু হয় ছাত্রদের অবস্থান। ৩রা জুলাই ই.সি. মিটিং ডেকে আবার জানানো হয় যে অ্যাডমিশন টেস্ট হচ্ছে না। উপাচার্য, যিনি নিজস্ব ক্ষমতাবলে এই জট কাটাতে পারতেন, তিনি স্বাধিকার বিরোধী অবস্থান নেন। এই ন্যাক্কারজনক টালবাহানাতে বর্তমান শিক্ষাবর্ষের ছাত্রদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করতে যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীরা যাদবপুরের স্বাধিকার রক্ষা, চিরাচরিত ভর্তি প্রক্রিয়া অক্ষুন্ন রাখা ও সরকারী হস্তক্ষেপ বন্ধ করার দাবী নিয়ে অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। শিক্ষক সমিতি এই দাবীর পাশে দাঁড়ায়, বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা লিখিত ভাবে জানান যে তারা এই চাপিয়ে দেওয়া ভর্তি প্রক্রিয়ায় কোন অংশ নেবেন না।
চারদিন ধরে অনশনের ফলে অসুস্থ হয়ে পড়েন কলাবিভাগ ছাত্র সংসদের নেত্রীরা এবং আরো কজন ছাত্র। এমতাবস্থায় আচার্য রাজ্যপাল আবার ইসি মিটিং ডাকার নির্দেশ দেন এবং সেই অনুযায়ী প্রক্রিয়া চালু করতে বলেন উপাচার্যকে। ১০ জুলাই যখন ইসি র মিটিং চলছে তখন চত্বর সরগরম। ছাত্রছাত্রীদের বিরাট ভিড়, প্রাক্তনীরাও এসেছেন , শিক্ষক, কর্মীদেরও আনাগোনা অরবিন্দ ভবনের চারপাশেই। এক তরুণ এবং এক তরুণী উত্তেজিতভাবে আলোচনা করছে প্রশাসনের উদ্দেশ্য কি, তাই নিয়ে। একটা টুকরো কথা কানে এলো, “গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র তোর বিরুদ্ধে …”। যারা অনশনে যোগ দেয়নি তারাও পালা করে রাত জাগছে বন্ধুদের সাথ দেওয়ার জন্য। গিটার, ডুবকি আছে, গান বাজনা, পোস্টার লেখা চলছে। আছে বেশ কিছু হবু ছাত্র ও অভিভাবক। এমনই এক কিশোর জানাল তুলনামূলক সাহিত্য পড়তে চায় সে। প্রবেশিকার জন্য তৈরি হচ্ছে। প্রশ্নের উত্তরে জানাল, ‘পরীক্ষা দিতে চাই বলে আন্দোলন করতে হবে এটা কিন্তু ভাবিনি!’
এর মধ্যে উদ্বিগ্ন মুখে ঘুরছেন এক মধ্য পঞ্চাশের দম্পতি। তাদের একমাত্র সন্তান অনশনে সামিল। সেই ছেলে যে খুব জোরদার রাজনীতি করে এমন নয়। কিন্তু “দেখিয়া শুনিয়া খেপিয়া গিয়াছে”, তাই অনশনে সেও সামিল। ছেলের অনশনে বসাকে সমর্থন করছেন, কিন্তু বাপমায়ের উদ্বেগও আছে। সদ্য কৈশোর পেরনো ছেলের বোধ হয় আশঙ্কা, বন্ধুরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা করবে। তাই সে ওদের সাথে ঝগড়া করে গিয়েছে ইতিমধ্যে, বলেছে বাবা-মা যেন তার জন্য চিন্তা না করে এবং এখনই বাড়ি চলে যায়। অতএব, তাঁদের উদ্বিগ্ন পায়চারি, ছেলের নজর এড়িয়ে।
এটাই যাদবপুর। এখান থেকে পাস করা ছাত্ররা চাকরির উপযুক্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রশ্ন করার উপযুক্ত হওয়াকে গুরুত্ব দেয়। এখানে ছাত্র, অভিভাবক, শিক্ষক, কর্মী একই মিছিলে পা মেলায়। এখানে নাছোড় তারুণ্য এখনো প্রশাসনের চোখে চোখ রেখে কথা বলে। রাত নটা গড়াল। অবশেষে ইসি সিদ্ধান্ত জানাল, বজায় থাকছে প্রবেশিকা, যথারীতি ৫০-৫০ ভিত্তিতে উচ্চমাধ্যমিক বোর্ড ও প্রবেশিকার প্রাপ্ত নম্বর অনুযায়ী ছাত্রভর্তি হবে। বাইরের কোন এজেন্সি নয়, যাদবপুরের শিক্ষকেরাই পরীক্ষার দায়িত্বে থাকবেন।
আবারও প্রমাণ করল যাদবপুর, নীতির পক্ষে দাঁড়িয়ে স্থিরপ্রতিজ্ঞ আন্দোলন, ছিনিয়ে আনে জয়। রাত দশটায় বিজয় মিছিল যখন ক্যাম্পাস পরিক্রমা করছে, তখন ক্লান্ত মুখগুলো উদ্ভাসিত। স্লোগান আর হাততালিতে মুখরিত মিছিল।



