।।লুৎফুল হোসেন।।

মৃত্যুর মিছিল কতোটা দীর্ঘ হলে তা পৌঁছুতে পারে কর্তৃপক্ষের মানবিক অনুভূতির সীমানায় ! এদেশের পথে পথে প্রতিদিন মানুষকে প্রাণ দিতে হচ্ছে। আজ দুপুরে রেডিসন হোটেলের বিপরীত পাশে রাস্তায় নয়, ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাণ দিতে হলো ঘাতক বাসে পিষ্ট হয়ে। ছুটির পরে রমিজউদ্দিন কলেজ এর ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তার পাশে ফুটপাথে জড়ো হচ্ছিলো যার যার গন্তব্যের যানবাহনের সন্ধানে। নিয়ন্ত্রণ হারানো জাবাল-ই-নূর পরিবহনের দ্রুতগামী বাসটি নৃশংস ভাবে অপেক্ষমাণ মানুষের উপর চড়াও হয়ে ঘটনাস্থলে প্রাণ কেড়ে নিয়েছে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর দুজন ছাত্র-ছাত্রীর। আরো অন্তত দশ জন গুরুতর আহত। একই দিনে সিলেটের সুনামগঞ্জে এক দ্রুতগামী ট্রাক দুটি ব্যাটারি চালিত বাহনকে ধাক্কা দিয়ে নদীতে ফেলে এবং এক ফোরস্ট্রোককে চাপা দিয়ে প্রাণ কেড়ে নিয়েছে চার জনের। গুরুতর আহত আরো বেশ কয়েক জনকে উদ্ধার করে স্থানীয়রা সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেছে চিকিৎসার জন্য। উভয় ঘটনায় বিক্ষুদ্ধ জনতা ঘাতক বাস ও ট্রাক আটক করেছে, চালক পলাতক।

রমিজউদ্দিন কলেজ এর ছাত্র-ছাত্রী নিহতের ঘটনায় প্রতিক্রিয়ায় বক্তব্য দিতে গিয়ে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় ভারতের মহারাষ্ট্রের বাস খাদে পড়ে অনেক মানুষের মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে সড়ক পথে হত্যাকাণ্ডকে কি প্রকান্তরে জায়েজ করবার অভিপ্রায় দেখালেন ! তাঁর এমন বক্তব্য কি এরকম নির্মম ঘটনার বিপরীতে আদৌ গ্রহণযোগ্য ! বাস খাদে পড়ে মানুষের মৃত্যু আর এভাবে নিরীহ মানুষের উপর বেপরোয়া গাড়ি তুলে দিয়ে মানুষ হত্যা কি কখনো এক হতে পারে ! কিন্তু দিনের পর দিন ঠিক এমন মানসিকতাই দেখিয়ে আসছে আমাদের দেশের নীতি নির্ধারক এবং আইন প্রয়োগকারীরা। আমরা নিয়মিতই দেখছি পথে পথে মানুষ খুন হচ্ছে ঘাতক বাহনের নৃশংসতায়। তারপর হয়তো গাড়ি আটক হয় (সব সময় তাও নয়), কিন্তু বিচার হয়না। সময়ের স্রোতে এরকম অগুন্তি মৃত্যুতে হারিয়ে যায় অসংখ্য মানুষ। একই ভাবে পুনঃ পুনঃ এমনতরো অনভিপ্রেত হত্যাকাণ্ড তবু ঘটতেই থাকে। ঘরে যার খাবার ঢাকা থাকে, পরিবার ও নিকট জন অপেক্ষায় থাকে, তার ঘরে ফিরে যাবার; সে ফিরে যায় বীভৎস লাশ হয়ে।

দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। পৃথিবীর সব দেশেই কম বেশি ঘটে। কিন্তু আমাদের দেশে ঠিক যেভাবে প্রতিদিন পথে প্রাণ দিতে হয়, তা কখনোই স্রেফ দুর্ঘটনায় মৃত্যু নয়, স্পষ্ট হত্যাকাণ্ড। এসব হত্যাকাণ্ডে কারো সাজা হয়না। কোনো জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয় না ঘাতক বাহন কে, তার চালককে, মালিককে, পথের নিয়ম নীতি প্রণেতা ও তা কার্যকর করবার কর্তৃপক্ষকে।

ছোটবেলার একটা কথা খুব মনে পড়ছে। শৈশবে স্কুলের আঙিনায় মাঝে মাঝে ছাত্রদের দিয়ে আগাছা পরিষ্কার অভিযান পরিচালনা করতেন আমাদের স্কুলশিক্ষকরা। আগাছা বলতে কিছু দীর্ঘদেহী বুনো ঘাস, আপনা আপনি গজিয়ে ওঠা কচু গাছ, মাঝে দু একটা কাঁটা ও ফুল সহ জংলি গাছ। একটা করে কাস্তে বা দামিলতো আমাদের কারো ভাগে, বাকিরা ছোট লাঠি হাতে সহকারী। যারা ওই দা-কাস্তে ভাগে পেতোনা তাদের মন খারাপ হতো। এমনই এক পরিচ্ছন্নতা অভিযানের দিনে মন খারাপের দলের ডানপিটে কেউ পিছন থেকে বলে উঠেছিলো; ভালো করে কাট, এক কোপে কাট, এরকম কচু গাছ কাটতে কাটতে একদিন মানুষ কাটতে শিখে যাবি। বিস্ময়ে থমকে গিয়েছিলাম। সত্যিই কী!

হ্যা, ছোট্ট ছোট্ট অপরাধ করতে করতেই তো একজন ক্রমে বড়সড় অপরাধ করবার উন্মত্ততায় পৌঁছে যায়। এটা খুবই সত্যি কথা। এক দিনেই কেউ দাগী অপরাধীহয় না। তার উপর অপরাধ করে সাজা না পাওয়ার বাস্তবতা যদি বিদ্যমান থাকে তো অপরাধ এবং অপরাধীর জন্য সেটা স্পষ্টতই একটা জোরালো আশকারা।অপরাধীরা তখন বিপুল বিক্রমে আরো ভয়াবহ রকমের অপরাধ সংঘটনের জন্য লায়েক ও শক্তিমান হয়ে উঠতে থাকে।

আমাদের এদেশে পথে পথে নিত্য দিন যতো অঘটন, দুর্ঘটনা বা অপরাধ ঘটে। সেসবের বিচারহীনতা এবং জবাবদিহিতার অভাব নিত্যই এসব অপরাধসংঘটনকারীদের লাগামহীন ভাবে ইন্ধন জুগিয়ে যাচ্ছে। আমরা কদাচই এর গভীর নেতিবাচকতাটুকু উপলব্ধি করে উঠতে পারি। যা যতোটুকু কেউ কেউ পারে তারাহয় সরাসরি ঘটনার শিকার, ভুক্তভোগী, নয় সেই ভুক্তভোগীর নিকট ও পরিবার পরিজন।

প্রতিদিন সব নিউজ চ্যানেল এবং দৈনিকের খবরের একটা বড় অংশ অপমৃত্যুর সংবাদ। তার ভিতরে সিংহভাগই দেশ জুড়ে ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনা। সাম্প্রতিকতথ্য অনুযায়ী রোজ অন্তত ১২ (বারো) জন মানুষ এদেশে সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে প্রাণ দেয়। আহত এবং পঙ্গুত্ব বরণ করার সংখ্যাটিও প্রায় সমান এবং এ বারোজনের হিসাবের বাইরে।

পরিবহন খাতে অপরাধ ও অপরাধীর জন্য এমনই এক ইন্ধন যোগানো পরিবেশ বিদ্যমান যে, সোজা কথায় একে অপরাধবান্ধব পরিবেশই বলা যায়। দেশে ৩৫ লক্ষগাড়ি, ১৯ লক্ষ চালক এবং প্রতিদিন দুর্ঘটনায় অন্তত ১২ জনের প্রাণহানি। এই তিনটা তথ্য পরিবহন খাতের অরাজক অবস্থার চিত্রটা স্পষ্ট করেই তুলে ধরে। তবেএখানেই শেষ নয়। সময়ে সময়ে এর সাথে আরো অনেক রকমের ভয়াবহ দিকও বিকট ভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে পরিবহন খাতে আরো যে অপরাধটি সবচেয়ে ভয়াবহ ভাবে ঘটে যাচ্ছিলো, তা হলো বাস কর্মচারীদের সংঘবদ্ধ ধর্ষণ। পর পর বেশ কিছুদিনএরকম খবর গোটা দেশের মানুষকে চমকে দিয়েছে, ভীত করেছে। বিবেকবান পুরুষরা নিজের ভিতরে কুঁকড়ে গিয়েছেন পুরুষ জন্মের নিয়তির জন্যে। তবে এতোকিছুর পরও কতোটা হতবিহ্বল মানুষ আসলে হয়েছে, তা বলা মুশকিল। কেননা নিত্য দিন হতাহতের খবরের সাথে পরিবহন সেবা খাতে অপরাধের তালিকায়গণধর্ষনের মতো সংবাদ যুক্ত হবার পরও গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্র এক প্রকার বিকারহীন অভিব্যক্তিই বজায় রেখেছে। অন্তত এসবের বিপরীতে প্রতিকার ওপ্রতিরোধের অপ্রতুল উদ্যোগ ইতিবাচক কিছুই জানান দেয় না।

এমন অরাজক ব্যবস্থাপনার কারণে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তুঘলকি আচরণে অনেক সময় দুর্ঘটনাগ্রস্তের সাহায্যে এগিয়ে আসতেও মানুষ ভয় পায়। আবার কখনো প্রত্যক্ষদর্শীরা সংখ্যায় বেশি হলে ভাঙচুর ও পথ অবরোধ করে বিরাজমান অব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করে। আন্তনগর পরিবহনগুলোএক রকম দাপটের সাথে পথে চলে তাদের শ্রমিক ইউনিয়ন এবং মালিকদের অর্থ-বিত্ত ও সামাজিক সংযোগের জোরে। তার উপর রাজধানী সহ অন্যান্য বড়শহরের ভিতরে নিত্যদিনের দুর্ভোগের বিপরীতে সরকারী মালিকানাধীন পাবলিক ট্রান্সপোর্টের দৈন্য দশা এবং দুর্ঘটনায় রোজ রোজ জান-মালের ক্ষয় ক্ষতিরবিপ্রতীপ অবস্থায় বিরাজ করে ভিকটিমের সুবিচার ও প্রতিকার পাওয়ার …

 

লেখক পরিচিতি:

Lutful Hossainলুৎফুল হোসেন, ব্যবসায়ী, কবি ও লেখক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট