দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশের মম্বন্তর, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে সোচ্চার কলম ধরেছিলেন যে কিশোর তার নাম সুকান্ত ভট্টাচার্য। পরাধীন দেশের মানুষের দুঃখ, দুর্দশা, বঞ্চনা, বেদনা আর শোষণ মুক্ত স্বাধীন সমাজের স্বপ্ন, শোষিত মানুষের জীবন এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য সংগ্রাম ছিল তাঁর কবিতার মূল উপজীব্য।
১৫ আগস্ট, ১৯২৬ এ মাতামহের ৪৩, মহিম হালদার স্ট্রীট, কলকাতার বাড়ীতে জন্ম নেয়া কবির পৈতৃক নিবাস ছিল ফরিদপুর জেলার (বর্তমানে গোপালগঞ্জ জেলা) কোটালীপাড়া থানার উনশিয়া গ্রামে। তাঁর বাবা ছিলেন কলকাতার পুস্তক ব্যবসায়ী নিবারন ভট্টাচার্য আর মা সুনীতি দেবী। সুকান্ত ছেলেবেলায় মাতৃহারা হলেও তাঁর সেই মাতৃস্নেহাভাব কিয়দংশ পূরণ করেছিলেন সরলা বসু। কবি সরলা বসু ছিলেন সুকান্তের বাল্যবন্ধু কবি অরুনাচল বসুর মা। সুকান্ত সমগ্রতে লেখা সুকান্তের চিঠিগুলোর বেশিরভাগই অরুনাচল বসুকে লেখা।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের বাল্যশিক্ষা শুরু হয় কলকাতার কমলা বিদ্যামন্দিরে। পরে তিনি বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাইস্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে অকৃতকার্য হন। এ সময় ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত হওয়ায় তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে। প্রবেশিকা পরীক্ষার আগেই শোষিত মানুষের মুক্তির আকাংখায় তিনি যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন সাম্যবাদী রাজনীতিতে। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ১৯৪৪ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন।
মার্কসবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী এবং প্রগতিশীল চেতনার অধিকারী এই তরুণ কবি ১৯৪৪ সালেই ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পীসঙ্ঘের পক্ষে প্রকাশিত ‘আকাল’ নামের একটি সংকলনগ্রন্থ সম্পাদনা করেন।

১৯৪১ সালে থেকে সুকান্ত কলকাতা রেডিওর গল্পদাদুর আসরে প্রথম দিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা আবৃত্তি শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর সেই আসরেই নিজের লেখা কবিতা পাঠে কবিগুরুকে শ্রদ্ধা জানান। গল্পদাদুর আসরের জন্য সেই বয়সের সুকান্তের লেখা গান সুর করে গেয়েছিলেন সেকালের অন্যতম জনপ্রিয় গায়ক পঙ্কজ মল্লিক। সুকান্ত কবি হিসেবে বেশী পরিচিত হলেও সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রেও তাঁর ছিলো অবাধ বিচরণ। সুকান্ত ঐ বয়সেই আরও লিখেছিলেন গান, গল্প, নাটক এবং প্রবন্ধ। ‘ছন্দ ও আবৃত্তি’ প্রবন্ধটি ছন্দ বিষয়ে তাঁর তাত্বিক দক্ষতার প্রকাশ।
সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা দৈনিক স্বাধীনতা-র (১৯৪৫) ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনা করতেন। মার্কসবাদী চেতনায় আস্থাশীল কবি হিসেবে সুকান্ত কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরী করে নিয়েছিলেন। তাঁর রচনাবলীর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ছাড়পত্র (১৯৪৭), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠেকড়া (১৯৫১), অভিযান (১৯৫৩), ঘুম নেই (১৯৫৪), হরতাল (১৯৬২), গীতিগুচ্ছ (১৯৬৫), ইত্যাদি। দুই বাংলা থেকে সুকান্ত সমগ্র নামে তাঁর রচনাবলী প্রকাশিত হয়।
সুকান্তের কবিতা পাঠককে সাহসী করে, উদ্দীপ্ত করে। তার বক্তব্যপ্রধান সাম্যবাদী রচনা মানুষকে জীবনের সন্ধান দেয়। স্বল্প সময়ের জীবনে, বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, জীবনানন্দ দাশের মত ডাকসাইটে কবিদের ভিড়ে হারিয়ে যাননি তিনি। নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন বাংলা সাহিত্যে। সুকান্ত বয়সের সীমা অতিক্রম করেছেন তার পরিণত ভাবনায়।
তরুণ সুকান্ত রসবোধ ছিলেন অফুরান। তাঁর রসবোধের পরিচয় তার লেখা চিঠিপত্রে বেশী পাওয়া যায়। কখনও চিঠির শুরুতে তিনি লিখছেন, ‘দারোয়ানজীকে ধন্যবাদ-ধন্যবাদ পোস্ট অফিসের কর্তৃপক্ষ আর পিওনকে।’ আবার বন্ধু অরুণকে সম্বোধন করছেন ‘পরম হাস্যাস্পদ অরুণ’ বলে। বন্ধুর চিঠির জবাব না পেয়ে প্রতি-উত্তরে লিখছেন, ‘সবুরে মেওয়াফল-দাতাসু, অরুণ, তোর কাছ থেকে চিঠির প্রত্যাশা করা আমার উচিত হয়নি, সে জন্যে ক্ষমা চাইছি। বিশেষত তোর যখন রয়েছে অজস্র অবসর—সেই সময়টা নিছক বাজে খরচ করতে বলা কি আমার উচিত?’
সুকান্তের পিতা নিবারণ ভট্টাচার্য সংসারধর্ম ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়েছিলেন। এ খবর পেয়ে মর্মাহত সুকান্ত পিতাকে চিঠি লিখলেন যা ছিল কটাক্ষ আর বিদ্রূপ বাণে বিদ্ধ। সুকান্ত লিখছেন : ‘পরমারাধ্য বাবাজী, আপনার আকস্মিক অধঃপতনে আমি বড়ই মর্মাহত হইলাম। ইতোমধ্যে শ্রবণ করিয়াছিলাম আপনি সন্ন্যাস অবলম্বন করিয়াছেন,…এমতাবস্থায় ইহাই অনুমিত হইতেছে যে কাহারও সুমন্ত্রণায় আপনি এই পথবর্তী হইয়াছেন। …এ ক্ষেত্রে আমার নিবেদন এই যে, অচিরে এই সৎসঙ্গ পরিত্যাগপূর্বক আপনার এই অস্বাভাবিকতা বর্জন করিয়া স্বীয় কর্তব্যকরণে প্রবৃত্ত হউন। আপনার পিতাঠাকুরের নির্দেশমত আপনার কলিকাতায় আসিয়া থাকাই আমার অভিপ্রায়। এ স্থানেও সৎসঙ্গের অনটন হইবে না, উপরন্তু আমার মতো অসতের সহিত দুই-চারিটা কথোপকথনের সুবিধাও মিলিবে।’
সচরাচর কবিদের লেখা চিঠি হয়ে ওঠে চিঠির চেয়ে বেশি কিছু। সাহিত্যের অনন্য উপাদান। কবি সুকান্তের প্রায় অর্ধশত এমনই চিঠি পাওয়া যায়। তিনি বন্ধু, পিতা ও স্বজনদের চিঠি লিখেছেন। তবে সুকান্ত বেশির ভাগ চিঠি পড়ে বোঝা যায় যে সমাজমনস্কতা ও পরিবর্তন চিন্তনের পাশাপাশি সুকান্ত বিপুল আনন্দ নিয়ে চিঠি লিখতেন। সুকান্তের প্রথম দিককার চিঠিগুলো ‘অর্থহীন অথচ বেশ ভারী শব্দ বানানোর খেলা’ হলেও পরবর্তী চিঠিগুলোতে তাঁর দর্শন, বোধ, উপলব্ধি ও প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। চিঠিগুলো কবির মনোজগতের বিভিন্ন অলিন্দে প্রবেশ করিয়ে দেয় এ যুগের পাঠককে।
বিপ্লবী ও স্বাধীনতার আপোসহীন সংগ্রামী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন কমিউনিষ্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী। পার্টি ও সংগঠনের কাজে অস্বাভাবিক পরিশ্রমের ফলে নিজের শরীরের উপর যে অত্যাচার সুকান্ত ভট্টাচার্য করেছিলেন তার অনিবার্য পরিণতিতে শরীরে প্রথম ম্যালেরিয়া আক্রমণ করল আর তার পরে পরেই দুরারোগ্য ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়ে কবি কিশোর সুকান্ত ১৯৪৭ সালের ১৩ মে মাত্র ২১ বছর বয়সে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
লেখক:

সাগর লোহানী
সম্পাদক, বাঙালীয়ানা