৮ সেপ্টেম্বর কলকাতা সাক্ষী হলো এক অনন্য সংগীত সন্ধ্যার। কলকাতার রোটারি সদনে অনুষ্ঠিত হল ‘হাম কিসিসে কম নহিন’, এমন এক মিউজিক ফেস্টিভাল যেখানে অংশ নিচ্ছেন এমন শিল্পীরা যাদের শারীরিক বা মানসিক দিক থেকে নানা বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে, অর্থাৎ চলতি কথায় যারা কোন না কোন প্রতিবন্ধকতার শিকার।
পূর্ব এবং উত্তর ভারতে এই প্রথম এমন কোন সংগীত উৎসব হল। কলকাতা সঙ্গীতের শহর, যেখানে ডোভার লেনে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সম্মেলন থেকে জ্যাজ ফেস্টিভাল, সুফি ও লোকসঙ্গীতের পর্ব, সরকারি সংগীত মেলা এমন কত উৎসবই না দেখি শুনি সারা বছর ভর। কিন্তু এমন অভিনব ফেস্টিভাল এর আগে এ শহর দেখেনি যেখানে শিল্পীরা কেউ বা হুইলচেয়ারে, কেউ কথা বলে ইশারায় বা সাইন ল্যাংগুয়েজে, কারও চোখে কালো চশমা, কারও বা বুদ্ধির বিকাশ নিয়ে সমস্যা, কারও রয়েছে অটিজম। অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সেরিব্রাল পলসি (আই আই সি পি)। অনুষ্ঠানের সূচনায় সংগঠনের গভর্নিং বডির সদস্য জিজা ঘোষ বলেন ‘আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে আমরা যারা লড়াই করি তাঁদের জন্য একটা মঞ্চ হোক যেখানে আমরা আমাদের গুণগুলো তুলে ধরতে পারি, সবাইকে আনন্দ দিতে পারি। টিভিতে অনেক সময়েই দেখা যায় প্রতিবন্ধী শিল্পীরা অডিশনে কোয়ালিফাই করার পর কোন কারণ না দেখিয়ে তাঁদের বাদ দেওয়া হয়। এখানে সব ধরণের শিল্পীদের আমরা এনেছি, তাঁদের প্রতিবন্ধকতা যাই থাকুক না কেন; বয়সের কোন সীমাও ছিল না, ৬ বছর থেকে ৪০ বছর বয়সী শিল্পীরা অংশ নিয়েছেন, কেউ বা কন্ঠ সংগীত কেউ বা যন্ত্রসংগীত পরিবেশন করেন। আমরা ভাবিনি এত সাড়া পাব, ১০০র ওপর শিল্পী অডিশনে অংশ নেন, আজ অনুষ্ঠানে ১৭ জন শিল্পী আপনাদের সামনে সংগীত পরিবেশন করবেন’।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেছেন পন্ডিত বিক্রম ঘোষ। আই আই সি পি র ছাত্ররা পরিবেশন করেছেন সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে জাতীয় সংগীত। তারপরেই মঞ্চে ঝড় তুলল ‘মনবিকাশ কেন্দ্রের’ ব্যান্ড ‘তালতরংগ’। তবলা, মৃদঙ্গ, বাংলা ঢোল, মাদল, ধামসা, প্রেমজুড়ি, ড্রামসেট, করতাল সব নিয়ে গোটা হল মাতিয়ে দিল যে শিল্পীরা তারা মানসিক প্রতিবন্ধকতার শিকার একথা অবিশ্বাস্য। আরও নানা চমক ছিল ৬ বছরের তৃপ্তি জটিল নিউরোলজিকাল অসুস্থতার শিকার, তার রাগপ্রধান গান এবং তানকারি অবাক করেছে সবাইকে। অভিপ্সিতার ‘হায় রে ম্যায় তেরে কুরবান’ গানে দেখিয়েছে তার গলার দাপট। মমতা শর্মা, শুধু দৃষ্টিহীনতা নয়, একই সঙ্গে লড়ছে কঠিন গরিবির সঙ্গে, খড়্গপুরে রেললাইনের পাশে ঝুপড়িতে একা থাকে এই তরুণী, গান গেয়েই তাঁর জীবিকা অর্জন। না বললেই নয় ছোট্ট দশ বছরের দেবর্ণা চ্যাটারজির কথা, বাংলা ঢাকের তালে সে দোলা দিয়েছে সবার প্রাণে, শারদীয় উৎসবের আমেজে। দরাজ গলায় নিজস্ব গায়কী এবং ভাবসমৃদ্ধ রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন অভ্রদীপ। আই আই সি পি ব্যান্ড বাংলা ও আসামকে মিলিয়েছে সলিল চৌধুরী আর ভূপেন হাজরিকার মেডলিতে। এছাড়া ছিল মেন্ট এড ও প্রহরের ব্যান্ড।
সব মিলিয়ে আমরা ডুব দিলাম গানের ঝর্না ধারায়, ঋদ্ধ হলাম এই অনুভূতিতে যে ইচ্ছে আর সমান সুযোগ থাকলে কোন বাধাই বাধা নয়, প্রতিবন্ধকতার সব দেয়াল আসলে ভঙ্গুর।
বাঙালীয়ানা/এসসি/জেএইচ