সাংবাদিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?

Comments
মোজাম্মেল হোসেন

একটি বাড়িতে উদ্বিগ্ন ডাকাডাকি, ভয়মিশ্রিত উত্তেজনার পর বন্ধ ঘরের দরোজা ভেঙে দেখা গেল মেয়েটির নিথর দেহ গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে। এমন ডজন খানেক ঘটনার হদিস মিলতেই পারে গত এক-দেড় দশকের খবরের কাগজের পাতা উল্টালে। মেয়েরা সাধারণত আবেগতাড়িত বয়সের কিশোরী বা অল্পদিনের বধু। হত্যা না আত্মহত্যা এ প্রশ্নও কিছুদিন ঝুলে থাকে । কোনো মামলা শেষ হয়, কোনো মামলা এক সময় হারিয়ে যায়।

সদ্য ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী এমন দুর্ঘটনার মেয়েটিও কলেজছাত্রী, বয়স ২১। গত ২৬ এপ্রিল গুলশানের ঘটনাটির শুরু থেকে এর খবর সংগ্রহ, লেখা ও প্রকাশ করা নিয়ে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমগুলো পড়েছে নতুন ধরনের এক সংকটে যে-রকম আগে দেখা যায়নি। খবরের বিশ্বাসযোগ্যতা, নিরপেক্ষতা, কোনো-না-কোনো পত্রিকার পক্ষপাতিত্ব ইত্যাদি নিয়ে পাঠকদের কম-বেশি অভিযোগ সব সময় আছে। কিন্তু এবার মাত্রাটা ভিন্ন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকরা প্রচণ্ড সমালোচনায় রীতিমতো আক্রান্ত। সাংবাদিকরা অনেকটা সমবেতভাবে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে। বলা যায়, সংবাদমাধ্যমের প্রতি সংবাদের ভোক্তা জনসাধারণের আস্থায় বড় রকমের চিড় ধরার সংকট দেখা দিয়েছে।

ঘটনার একদিন পরে এই পরিস্থিতির উপর আলোকপাত করে আমি ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে সাংবাদিকদের নিজস্ব সমস্যার স্বরূপ তুলে ধরার চেষ্টা করি। সেটা উদ্ধৃত করে পরবর্তী প্রবণতা দেখে আরও কিছুটা সংযোজন করে এই নিবন্ধ। ‘সংবাদমাধ্যম: ব্ল্যাকআউট ও ভাসুরের নাম’ শিরোনাম দেওয়া ফেসবুক পোস্টটি নিম্নরূপ:

খবরের কাগজে যাঁরা কাজ করেছেন তাঁরা ইংরেজিতে ব্ল্যাকআউট (Blackout) শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। শব্দটি ভিন্ন ভিন্ন অর্থে নিষ্প্রদীপ, জ্ঞান হারানো অবস্থা ইত্যাদি বোঝায়, তবে সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে সেটা ‘নিউজ ব্ল্যাকআউট’ অর্থাৎ কোনো খবর সম্পূর্ণ গোপন করা, না ছাপানো, প্রকাশ না করা। এ-রকম করতে হয় বাইরের চাপে (external pressure, এটাও সংবাদশাস্ত্রের পরিভাষা) তথা সামরিক বা স্বৈরাচারী সরকারের নির্দেশে, মাফিয়ার ভয়ে ইত্যাদি কারণে। এগুলো সম্পাদক বা সাংবাদিকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, বাধ্য হয়ে। ভেতরের চাপও (internal pressure) আছে। মালিক বা সম্পাদকের অপছন্দের বা স্বার্থহানিকর, তাদের ব্যবসায়িক বা পারিবারিক  কোনো কেলেঙ্কারির খবর অনেক সময় একেবারে চেপে যাওয়া হয়। সে-রকম ঘটনার সংবাদমূল্য থাকলে এবং মানুষের তা জানার আগ্রহ থাকলে তা ব্ল্যাকআউট করার ফলে সংশ্লিষ্ট খবরের কাগজ বা সংবাদমাধ্যম খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখন (২৭ এপ্রিল থেকে) এমন অবস্থা হয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন চারটি মিডিয়ার– সংবাদপত্র ‘কালের কন্ঠ’, ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’, অনলাইন পোর্টাল ‘বাংলানিউজ২৪.কম’ ও টিভি চ্যানেল ‘নিউজ টুয়েন্টিফোর’। দেশের বৃহত্তম এই শিল্প গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরের একটি ফৌজদারি মামলার আসামি হওয়ার ঘটনার খবর এক অক্ষরও তারা প্রকাশ করতে পারছে না। মামলাটি হয়েছে এক কলেজছাত্রীকে প্রতারণা করে তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার অভিযোগে। বসবাসের ফ্ল্যাটে  মেয়েটির মৃতদেহ গলায় ওড়না পেঁচানো ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া  গেলেও এটা আত্মহত্যা না হত্যা তা এখনও তদন্তনাধীন। এই আলোড়ন তোলা ক্রাইম নিউজটি প্রকাশ না করায় মিডিয়া চারটিকে নিশ্চিতই ভাবমূর্তি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছু ক্ষতি মেনে নিতে হবে। ইতিমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক গালমন্দ ও ট্রলের শিকার তারা হয়েছে। ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে যেহেতু পাঠকদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, লাইক-কমেন্টের বাণিজ্যিক মূল্যও আছে  সেহেতু এই ক্ষতি এখন ছাপানো সংবাদপত্র যুগের চেয়ে বেশি।

খবর যদি সত্য হয়, তথ্যভিত্তিক হয়, আবার মালিক বা মালিকরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে মালিকপক্ষের অপছন্দনীয় হলেও তাদের আত্মপক্ষসমর্থনমূলক বক্তব্যসহ বস্তুনিষ্ঠভাবে খবরটি প্রকাশ করার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতে সম্পাদকদের সচেষ্ট হওয়া উচিত।

এই ঘটনাটির খবর পরিবেশনে বসুন্ধরার চারটি ছাড়া প্রথম দিন অন্য বড় বড় মিডিয়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার মুখে পড়েছে। কারণ ওই মিডিয়াগুলির কোনো-কোনোটি খবরে বসুন্ধরার এমডির নাম উল্লেখ করেনি। হতভাগিনী মেয়েটির ছবিসহ সম্পূর্ণ পারিবারিক পরিচয় অত্যন্ত গর্হিত অনৈতিকভাবে প্রকাশ করলেও আসামির নাম ও পরিচয় শুধু ‘একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ বলে এড়িয়ে গেছে। শিল্প প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নাম উহ্য রাখা হয়েছে। আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় পুলিশ যখন আদালত থেকে সায়েম সোবহান আনভীরের  দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আদেশ বের করলো তখনই ওই মিডিয়াগুলোর কোনো-কোনোটিতে নাম প্রকাশ শুরু হয়, তার আগে নয়। আমাদের দেশে বড় বিজ্ঞাপনদাতাদের বিব্রত না করার জন্য সপ্রণোদিত হয়ে খবর প্রকাশে বিরত থাকা বা খণ্ডিত খবর প্রকাশের প্রবণতা বাড়ছে। এদিক থেকে তো সরকারই উদার। প্রতিনিয়ত সরকারি বিজ্ঞাপন নিয়েও মিডিয়া সরকারের সমালোচনা করতে পারছে। বিজ্ঞাপন না পেলে প্রতিবাদও করতে পারছে। এই অধিকারটি বেসরকারি বিজ্ঞাপনদাতার বেলায় খাটানো যাচ্ছে না।

এ তো গেল খবর ব্ল্যাকআউটের কথা। কিন্তু বিস্তারিত খবর পরিবেশন করেও খবরের প্রধান চরিত্রের নামটি কেবল উহ্য রাখার এক বিচিত্র নমুনা দেখলাম ভালো কাটতি আছে এমন মূলধারার একটি দৈনিকে। ঘটনার তৃতীয় দিন পর্যন্ত খবর ছাপিয়ে তারা বসুন্ধরার এমডির নামোল্লেখ করেনি। ‘একটি শিল্পগ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ ছাড়া সুপরিসর খবরে তাদের বারবার লিখতে হয়েছে ‘আসামি’ এবং একবার লিখেছে ‘বয়ফ্রেন্ড’! বেচারা প্রতিবেদক তথ্যের জন্য পুলিশ ছাড়াও হতভাগিনী মেয়েটির  বোনকে ফোন করে দুলাভাইর সঙ্গে, এমনকি ফ্ল্যাটবাড়িটির দারোয়ানের সঙ্গে কথা বললেও কেবল কথা বলার চেষ্টা করেনি ‘আসামি’র সঙ্গে।

সংবাদপত্রের ওপর চাপের কথা জানি, কিন্তু সংবাদপত্রের যে ‘ভাসুর’ থাকে, যার নাম নেওয়া যায় না, সেটা এমনভাবে আর দেখিনি।

এই পর্যন্ত ছিল আমার ফেসবুক স্টেটাস। পরদিন থেকেই বিস্ময়, বেদনা ও আতঙ্কের সঙ্গে দেখলাম মাঝারি স্তরের গোটা চারেক দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টাল মোসারাত জাহান মুনিয়া নামের নিহত অথবা আত্মঘাতিনী ২১ বছর বয়সী মেয়েটির শবদেহ ছিঁড়েখুড়ে খাচ্ছে। সে কত খারাপ মেয়ে ছিল এবং এক বীর মুক্তিযোদ্ধা পিতার সন্তান তার পরিবারের লোকেরাও কত খারাপ তার তথ্যভিত্তিহীন কেচ্ছাকাহিনী খবরের নামে পরিবেশন করে চরিত্রহনন করা হচ্ছে। সংবেদহীন কুরুচিপূর্ণ শিরোনামগুলো এরকম: ‘পোশাকের মতো প্রেমিক বদলাতেন মুনিয়া’, ‘বোনের লোভে লোভী মুনিয়া’, ‘ক্লাস নাইনেই দুই বাচ্চার বাবাকে গোপনে বিয়ে করেছিল মুনিয়া’ ইত্যাদি। বিভিন্ন কাগজে ছাপা হলেও খবরগুলো একই। তাতে স্পষ্ট যে প্রতিবেদকদের রচিত না হয়ে কোনো এক জায়গা থেকে সরবরাহকৃত। এখানে বিস্ময়কর হলো, বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়াগুলি নয়, এই আবর্জনাগুলি প্রকাশ পেল অন্য মিডিয়ায়। বসুন্ধরার মিডিয়াগুলির বস্তুত অপরাধ নেই, যেহেতু সব খবর সব মিডিয়ায় না আসাই স্বাভাবিক।

উদ্দেশ্যমূলক সংবাদ উৎপাদনের হলুদ সাংবাদিকতা নতুন নয়। তা মাঝে-মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো পত্রিকা করে এবং পাঠকের চোখে এক সময় ধরাও পড়ে। কিন্তু এবারেরটি প্রায় মহামারির মতো, অনেকগুলো পত্রিকা একই রোগে আক্রান্ত দেখা যাচ্ছে। পত্রিকা দেশের যে-কোনো প্রান্ত থকে বের হোক আর যত নগন্য সার্কুলেশনই থাকুক, এখন অনলাইনে তা ছড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে পৃথিবীর সর্বত্র। প্রতিক্রিয়ায় একযোগে সব সাংবাদিকের বদনাম হয়ে যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের উপর অনাস্থা প্রকাশ পাচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনাগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যাচ্ছে প্রধানত দুটি ধারা। একদল ঢালাওভাবে সাংবাদিকদের মালিক ও ধনী অপরাধীদের দালাল, পা-চাটা কুকুর, উচ্ছিষ্টভোগী প্রভৃতি যা-নয়-তাই বলে গালি দিচ্ছে। আরেকদল বলছেন, কর্পোরেট পুঁজি সংবাদমাধ্যমের বিনিয়োগে আসায় সাংবাদিকতার স্বাধীনতা মালিকের পদতলে বিনষ্ট হয়েছে, আগে এমন ছিল না।

এই দুটো দৃষ্টিভঙ্গীই অন্যায্য ও খণ্ডিত। সাধারণ চাকরিজীবী সাংবাদিকরা কোনো অর্থেই দালালি ও হলুদ সাংবাদিকতার জন্য দায়ী নয়। বরং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত হাজার হাজার তরুণ-তরুণী জীবনের অনেক লোভনীয় হাতছানি এড়িয়ে এক ধরণের জনহিতৈষণার আবেগ থেকে এই পেশায় এসে অল্প বেতনে ঝুকিপূর্ণ কষ্টকর কাজ করে চলেছেন। তাঁদের এই কাজ খবর জানিয়ে, জনমত গঠনে সহায়তা করে জনগণের অধিকার রক্ষায় বিরাট ভূমিকা পালন করছে। ব্যক্তিগতভাবে কোনো সাংবাদিক দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারেন। সেটা দেখার দায়িত্ব তার নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের। দুঃখজনকভাবে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া সাংবাদিকের সংখ্যা এখন আগের চেয়ে বেশি।

দ্বিতীয়ত, সংবাদমাধমে কর্পোরেট হাউজগুলোর বিনিয়োগ খারাপ না মনে করে বরং স্বাগত জানানো উচিত। মোটা পুঁজি ছাড়া এ যুগে সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করা যায় না। রাজনৈতিক আন্দোলনের সমর্থকদের চেষ্টায় মওলানা আকরম খাঁ অথবা মওলানা ভাসানীর পত্রিকা বের করা বা আদালতের বারান্দায় গিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পকেটের টাকা চেয়ে এনে প্রকাশক মানিক মিঞার হাতে দেওয়া– সেই দিন অনেক আগেই বাসি হয়েছে। সংবাদমাধ্যম ব্যবসায়িক ভিত্তিতেই চলতে হবে। কর্পোরেট সংবাদমাধ্যম বরং শিল্প খাত হবে এবং সাংবাদিকদের ভালো বেতন হবে।

আমরা কর্পোরেট পুঁজি বলছি বা সংবাদমাধ্যমের কর্পোরেটাইজেশন হয়েছে বলে টক-শোতে পাণ্ডিত্য জাহির করছি কিন্তু দেশে শিল্প-বাণিজ্যিক যে পারিবারিক গ্গ্রুপগুলো নিজেদের কর্পোরেট বলছে তারা কর্পোরেট আচরণ– তথা আর্থিক স্বচ্ছতা, কর্মশৃঙ্খলা, ব্যবস্থাপকদের কর্মস্বাধীনতা, নিয়মিত বেতনভাতা, লভ্যাংশ বিতরণ, জবাবদিহি, পুরস্কার ইত্যাদি অনুসরণ করছে না। কর্পোরেট এখানে অবিকশিত ও বহুলাংশে বিকৃত। এই গ্রুপগুলোর চেয়ারম্যান বা এমডিকে কর্পোরেট ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে সামন্ত জমিদারের মতো আচরণ করতে দেখা যায়। সাংবাদিকদের বেতন বাকি ফেলে, বিনা ক্ষতিপূরণে ছাঁটাই করেও তারা কর্পোরেট।

এই মালিকদের চাপ সাংবাদিকরা কিভাবে প্রতিহত করবেন? কিভাবে লড়বেন?

বেতন-ভাতা ও রুটি-রুজির বিষয়ে লড়বে ইউনিয়ন। এখন সে গুড়ে বালি। বহুকাল হলো এ ময়দানে সাংবাদিকদের ঐক্য নাই। ইউনিয়ন রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-জামাত লাইনে বিভক্ত। সাংবাদিক স্বার্থ শিকায় থাক, নেতাদের কাছে দলীয় এজেণ্ডা বড়। ফলে সাংবাদিক সমাজ দুর্বল হয়ে পড়েছে।

সংবাদমাধ্যমের পেশাদারিত্ব ও নীতি-নৈতিকতার লড়াই মূলত সংবাদকর্মীদের নয়, সম্পাদকদের দায়িত্ব। সংবাদে প্রকাশিত প্রতিটি শব্দ ও ছবির চূড়ান্ত দায়-দায়িত্ব সম্পাদকের। মালিকের চাপে কখনো অপসাংবাদিকতা করলেও তার দায়িত্ব মালিক নেবেন না। সেটা সম্পাদকের ঘাড়ে পড়বে। সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ধারণাটির অর্থ হলো সংবাদমাধ্যমে কি প্রকাশিত হবে বা হবে না সে-বিষয়ে মালিকের হস্তক্ষেপ ও খবরদারি ছাড়া স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারা। এই স্বাধীনতা ছাড়া প্রকৃত সংবাদমাধ্যম হয় না। ইউরোপ-আমেরিকায় এবং ভারতেও বহুলাংশে এ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত।

বলা যত সহজ, কাজ ততটাই কঠিন। সম্পাদক কিভাবে মালিকের চাপ ঠেকাবেন? মালিক তো নিয়োগ ও বরখাস্তেরও মালিক। বলা হয়, এ-পরিস্থিতিতে সম্পাদকের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা হচ্ছে পদত্যাগ করা। হ্যাঁ, তাই। মুনিয়ার অপমৃত্যুতে বসুন্ধরার এমডি মামলার আসামি হওয়ায় যে ক্লেদাক্ত পরিস্থিতিতে আমাদের মিডিয়া যাচ্ছে তাতে কুৎসিত চাপের সম্মুখিন একজন সম্পাদকও যদি পদত্যাগ করতেন, আমরা তাঁর জয়ধ্বনি দিতাম। সম্পাদকদের সম্মিলিতভাবে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ও মিডিয়ার মর্যাদা রক্ষার পথ খোঁজা উচিত। কথিত কর্পোরেটাইজেশনের শুরুতে মোটা বেতনের কতক সম্পাদককে দেখা গেছে আত্মমর্যাদা খুইয়ে স্বেচ্ছায় বশংবদ আচরণ করতে। যেমন মালিক অফিসে এলে সিনিয়র সাংবাদিকদের নিয়ে ফুলের তোড়া হাতে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে এবং সেই ‘ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর’ ছবি পত্রিকায় ছাপতে। একজন সম্পাদক মালিককে জন্মদিনের শুভেচ্ছা অবশ্যই জানাবেন, সৌজন্য ও আন্তরিকতার কারণে বাড়িতে ফুল-মিষ্টি-উপহার নিয়ে যেতেই পারেন যা আমাদের সংস্কৃতি; কিন্তু তা খবর নয়। ফেসবুকে অতিরিক্ত স্তাবকতাপূর্ণ প্রশংসা লিখে ছবিসহ পোস্ট দেওয়া শোভন নয়। মালিক ও সম্পাদকের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ মিডিয়ার জন্য স্বাস্থ্যকর হবে।

বনভূমির প্রান্তে সমুদ্রের নির্জন বালিয়াড়িতে অস্পষ্ট সন্ধ্যালোকে বঙ্কিমচন্দ্রের নায়ক নবকুমার যে রহস্যময় অপূর্ব রমনীমূর্তির কণ্ঠে ‘পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?’ শুনে বাকরুদ্ধ হয়েছিলেন সেটা রোমান্টিক না কৌতুক বা শ্লেষপূর্ণ বাক্য তা নিয়ে কথা চলতেই পারে, তবে বহুল উদ্ধৃত এই সুভাষিত সাহিত্যিক উক্তি বুঝি বার বার জীবনের সামনে এসে দাঁড়াতেই থাকবে।।

লেখক:
Muzzammil Husain Monju
মোজাম্মেল হোসেন, সাংবাদিক

*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.