তাবৎ দুনিয়ার লাখো-কোটি মানুষ একটা বিশাল সময় জুড়ে যার সৌন্দর্যের নেশায় বুঁদ হয়ে ছিলেন, যার সৌন্দর্যে ভর দিয়ে চল্লিশের দশক থেকে ষাটের দশক পর্যন্ত নয় শুধু, অদ্যবধি তার সৌন্দর্যের ব্যখ্যা-বিশ্লেষন এর ফুলঝুড়ি ছোটে উত্তর থেকে দক্ষিন মেরু, তার নাম মেরিলিন মনরো। তার মৃত্যু নিয়ে হয়েছে নানান জল্পনা কল্পনা। মেরিলিন মনরো কী আত্মহত্যা করেছেন? নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে? নাকি স্বাভাবিক মৃত্যু? মৃত্যু নিয়ে এই রহস্যটা রয়ে গেছে অনিন্দ্য সৌন্দর্য্যের সাক্ষী হিসেবেই!
Marilyn Monroe

মেরিলিন মনরো’র বিখ্যাত ছবি (ছবি-ইন্টারনেট)

কিংবদন্তী এ আমেরিকান মডেল, অভিনেত্রী এবং সংগীত শিল্পীর জন্ম ১ জুন ১৯২৬ সালে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায়। নিষ্ঠুর সভ্যতা সেই সময়ের ছোট্ট এই শিশুকে পিতৃপরিচয় দিতে পারেনি। তাই জন্মসনদে পদবি পাল্টে তাঁর নাম হয়ে যায় নরমা জেন বেকার। মনরোর মা গ্ল্যাডির প্রথম স্বামীর পদবি ওটা। তিনি মেয়ের নামের সঙ্গে সেটাই জুড়ে দেন। ওই নামে দীক্ষিতও হন মনরো। তবে মায়ের আদর বেশি দিন কপালে জোটেনি মনরো’র। কারণ, মনরো যখন নেহায়েতই শিশু, তখনই তাঁর মা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। মায়ের আর্থিক ও মানসিক এই অসংগতির কারণে মনরো’কে আশ্রয় নিতে হয় এতিমখানায়। ১১ বছর বয়স পর্যন্ত এভাবেই কাটে। এরপর তাঁর জীবনে কিছু সময়ের জন্য পরিবারের স্নেহ মেলে। মায়ের বান্ধবী গ্রেস গডার্ড তাঁকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। কিন্তু সেই সুখও বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৪১ সালে গ্রেসের স্বামী ডক গডার্ড ইস্ট কোস্টে বদলি হলে দারিদ্র্যের কারণে তাঁরা মনরো’কে আর তাঁদের সঙ্গে রাখতে পারেননি। পালক বাবা-মা মনরো’কে আবার এতিমখানাতেই ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। মনরো’র বয়স তখন ১৬। এতিমখানার জীবন এড়ানোর জন্য তাঁর সামনে একটিই পথ খোলা ছিল। তা হলো বিয়ের পিঁড়িতে বসা এবং শেষ পর্যন্ত মনরো তা-ই করলেন। প্রতিবেশী ব্যবসায়ী জিমি ডগার্থির সঙ্গে মালাবদল করেন। বিয়ের পর জিমি ব্যবসায়িক কাজে দীর্ঘ সময়ের জন্য জাহাজে করে চলে যান সাগরে।

Marilyn Monroe with Elvis Presley

বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী এলভিস প্রিসলির সাথে মেরিলিন মনরো। (ছবি-ইন্টারনেট)

বেঁচে থাকার সংগ্রামে মনোযোগী মনরো তখন কাজ নেন একটি সমরাস্ত্র কারখানায়। সেখানেই তিনি সুন্দরের সন্ধানী এক ফটোগ্রাফারের নজরে পড়ে যান। সেই ফটোগ্রাফারের মাধ্যমেই মডেলিংয়ে নাম লেখান মেরিলিন মনরো। এরপর ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে তাঁর জীবন। মডেল হওয়ার সুবাদে বহু ম্যাগাজিনের কভারে উঠে আসেন তিনি। একপর্যায়ে হলিউডের বিখ্যাত নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি ফক্সের জন্য স্ক্রিন টেস্ট দেন মনরো। প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা বুঝতে পারেন, মনরো অসামান্য সুন্দরী। সঙ্গে রয়েছে অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও ক্ষমতা। একই সময়ে মেরিলিন মনরো’র সঙ্গে তাঁর স্বামীর সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয় এবং ১৯৪৬ সালে তাঁদের ছাড়াছাড়িও হয়ে যায়। ওই বছরই মনরো তাঁর প্রথম ছবিতে সাইন করেন এবং নরমা জেন বেকার পাল্টে হয়ে যান মেরিলিন মনরো। নামের সঙ্গে পরিবর্তন আসে চেহারায়। স্বর্ণকেশী হিসেবে মনরো আবির্ভূত হন সবার সামনে।

Moonro with her Husband Arthur Miller

মেরিলিন মনরো তার স্বামী আর্থার মিলারের সাথে। (ছবি-ইন্টারনেট)

তবে ১৯৫০ সালের আগে মনরো তেমন একটা নজর কাড়তে পারেননি। ১৯৫৩ সালে নায়াগ্রা ছবি দিয়ে স্বপ্নপূরণ হয় তাঁর। এই ছবি তাঁকে রাতারাতি তারকাখ্যাতি এনে দেয়। এরপর একে একে রিলিজ হয় জেন্টেলম্যান প্রেফার ব্লন্ডস, হাউ টু ম্যারি আ মিলিওনিয়ার, দেয়ার’জ নো বিজনেস লাইক শো বিজনেস, ‘দি সেভেন ইয়ার ইচ’ ও ‘বাস স্টপ’ এর মতো সফল সিনেমা। অবশ্য এসব সিনেমাই তাঁর ক্যারিয়ারে জুড়ে দেয় যৌন আবেদনময়ী তারকার তকমা। চলনে-বলনে তিনি কেড়ে নিতে থাকেন হাজারো তরুণ হৃদয়ের ঘুম। তাঁর রূপের ঝলকে আবিষ্ট হয়ে পড়েন অনেক রথী-মহারথীও। এই তালিকায় আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি এবং তাঁর ছোট ভাই অ্যাটর্নি জেনারেল রবার্ট এফ কেনেডির (ববি কেনেডি) নামও ছিল।

১৯৪৭ সালের ঘটনা। ফক্স স্টুডিওর সাথে চুক্তিবদ্ধ হন মনরো। ফলে তাকে দেখা যায় দুটি চরিত্রে যদিও তা খুবই অল্প সময়ের জন্য। এরপর চুক্তি নবায়ন করা হয়নি আর। পরবর্তীতে কলম্বিয়া পিকচারসের সাথে কাজ করেন। কিন্তু তারাও খুব বেশি আগ্রহ দেখায়নি। তাই ফিরে আসেন তিনি মডেলিং জগতে। হঠাৎ ভাগ্যে পরিবর্তন আসে মনরোর। ১৯৫০ সালে ‘অল অ্যাবাউট ইভ’  চলচ্চিত্রের জন্য তিনি ফক্স স্টুডিও থেকে পুনরায় ডাক পান। তারপরের গল্প এক উজ্জ্বল ইতিহাস। কোটি মানুষের স্বপ্নের নায়িকা হয়ে ওঠেন তিনি। ফক্স স্টুডিওর সাথে আরও সাত বছরের চুক্তিতে আবদ্ধ হন।

১৯৫৫ সালে মুক্তি পায় তার ‘সেভেন ইয়ার ইছ’ চলচ্চিত্রটি। বেশ সুনাম কুড়ায় এটি। ১৯৫৭ সালে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডে যান তিনি অভিনয় করতে। কিন্তু এর মধ্যেই কিছুটা অধঃপতনেরও শুরু হয়। বিভিন্ন পরিচালক, প্রযোজকদের থেকে অভিযোগ আসতে শুরু করে, সেটে দেরী করে পৌঁছানোর জন্য।

১৯৬২ সালের ৫ আগস্ট তার গৃহভৃত্য ইউনিস মুরারি সারাদিন তার বাসায় ছিলেন। মুরারি রাত ৩ টায় জেগে উঠে মনরো’র বেড রুমের দরজার নিচ দিয়ে আলো দেখতে পান। দরজা বন্ধ অবস্থায় কয়েকবার চেষ্টা করেও মুরারি তার কোনো সাড়া পাচ্ছিলেন না। মুরারি তখন মনরো’র সাইকিয়াট্রিস্ট ড. রাফ গ্রেজনকে কল করেন। খুব কম সময়ের মধ্যেই তিনি এসে বেডরুমের জানালা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে মনরো’কে তার বিছানায় মৃত অবস্থায় পান। মনরো’র পিজিশিয়ান ড. হায়ম্যান এংগেলবার্গ  রাত ৩.৫০ মিনিটে পৌঁছে তাকে মৃত ঘোষনা করেন। এরপর তারা লস এঞ্জেলেস পুলিশকে অবহিত করেন। নগ্ন দেহের মনরোর হাতটি তখন বিছানায় রাখা টেলিফোনের ওপর। ধারণা করা হয়, অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ সেবন করে আত্মহত্যা করেছেন মনরো। অনেকেরই ধারণা, ব্যক্তিগত জীবনের নানা টানাপোড়েনই মনরো’কে এ পথে ঠেলে দিয়েছিল। সব মিলিয়ে তাঁর মানসিক অবস্থাটা মোটেই ভালো ছিল না।

Murrary Housekeeper

মনরো’র গৃহভৃত্য ইউনিস মুরারি (ছবি-ইন্টারনেট)

পরবর্তীতে পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে জানা যায়, তার বিছানার পাশে সকল ঔষধের কৌটা খালি অবস্থায় পাওয়া যায়, যেগুলি তার রক্তে অতিরিক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।

যদিও অনেকে মেরিলিন মনরো’কে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার বিষয়টিকেও উড়িয়ে দেন নি। নানা ঘটনা ও রহস্য বিষয়টিকে জোর ভিত্তি দিচ্ছে। ময়নাতদন্তের মূল রিপোর্ট, মূল পুলিশ রিপোর্ট, কথিত আত্মহত্যার নোটসহ আরও একাধিক প্রমাণ কেন হারিয়ে যাবে? এসব ঘটনা কি মনরোর মৃত্যুকে আরও রহস্যাবৃত করে তোলে না? উপরন্তু মনরোর লাশ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলে প্রথম উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহনীর এক সদস্য আত্মহত্যার বিষয়টিকে নাকচ করে দিয়েছিলেন। তা ছাড়া মনরোর স্বামী দাবিদার রবার্ট স্ল্যাটজার ২০ বছর পর এক টিভি শোতে অভিযোগের তির ছোড়েন ববি কেনেডির দিকে। তাঁর দাবি, কেনেডি পরিবারের এ সদস্যই মনরোকে হত্যা করেছেন অথবা হত্যার সময় উপস্থিত ছিলেন। কারও কারও অভিযোগ, খোদ প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিই মনরোর মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত। এমনকি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএও জড়িত। মনরো শেষবারের মতো জনসমক্ষে গান গেয়েছিলেন ১৯৬২ সালের ১৯ মে প্রেসিডেন্ট কেনেডির জন্মদিনে। ঘনিষ্ঠতার সুবাদে প্রেসিডেন্টের অনেক গোপন খবরই জানতেন মনরো। এ কারণেই প্রাণ দিতে হয় তাঁকে। তবে মেরিলিন মনরো যেভাবেই মারা যান না কেন, জীবনের সোনালি সময়ে তাঁর এমন মৃত্যু কেউই কামনা করেননি।

Monroe Death news

মনরো’র আত্মহত্যার খবর আসে তৎকালীন পত্রিকায়। (ছবি-ইন্টারনেট)

মৃত্যুর ৫৬ বছর পরে এসেও লাখো মানুষ তাদের হৃদয়ের রানীকে স্মরণ করেন অকৃত্রিম ভালোবাসায়। এই ভালোবাসাটুকু যে নিখাদ, অমূল্য, সেটা হয়ত ওপর থেকেই টের পাচ্ছেন প্রিয় মেরিলিন মনরো। সৌন্দর্য্যের অনিন্দ্য রূপ ভুবনমোহিনী হাসি, ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে থাকুন যুগ হতে যুগান্তর।

মেরিলিন মনরো, আপনার সৌন্দর্য্যের মৃত্যু নেই।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.